ইতিহাস

বিমল রায়

ভারতীয় সিনেমা জগতের অন্যতম খ্যাতনামা পরিচালক ও প্রযোজক ছিলেন বিমল রায় (Bimal Roy)। বাস্তববাদী সিনেমা  তৈরি করার জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

১৯০৯ সালের ১২ জুলাই ঢাকার সূত্রাপুরে এক জমিদার পরিবারে বিমল রায়ের জন্ম হয়৷ তাঁর শৈশব স্মৃতি খুব একটা সুখকর ছিল না।  বাবার মৃত্যু হলে এস্টেট ম্যানেজার বিমল রায়ের পরিবারকে এস্টেট থেকে নির্বাসিত করলে তাঁরা সপরিবারে কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করেন।

বিমল রায়ের প্রাথমিক কর্মজীবন শুরু হয়েছিল নীতিন বোসের হাত ধরে নিউ থিয়েটার্সে  সহকারি ক্যামেরাম্যান হিসেবে। এই সময় তিনি দেবদাস (১৯৩৫ সাল) চলচ্চিত্রের জন্য পি.সি বড়ুয়ার সহকারি পরিচালক ও ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করেন৷ তিনি সম্পূর্ণ পরিচালক হিসেবে কাজে নামার আগে প্রায় দশটি ছবিতে ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ছিল ‘উদয়ের পথে'(১৯৪৪)। এই ছবির বিষয়বস্তু ছিল শ্রেণীবৈষম্য। বস্তুত এই সিনেমাটি বাঙালি দর্শকের কাছে ভীষণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল৷  আলোকচিত্র, চিত্রনাট্য, অভিনয় সবকিছু মিলিয়ে বক্সঅফিসে নতুন রেকর্ড গড়েছিল এই ছবি।

চল্লিশের দশকের শেষের দিকে যে কয়েকজন বাঙালি পরিচালক বোম্বেতে স্থানান্তরিত হন তাঁদের মধ্যে বিমল রায় ছিলেন অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং দেশভাগ বাংলা সিনেমার উপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল।  ১৯৫২-৫৩ সালে বিমল রায়ের পরিচালনায় প্রকাশ পায় ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিটি।  সর্বকালের সেরা দশটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের মধ্যে এই চলচ্চিত্রটিকে ধরা হয়৷ এই সিনেমাটি ভারতের বাইরেও প্রশংসা অর্জন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, চেক প্রজাতন্ত্র, কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং মেলবোর্ন-এ এই ছবিটি পুরস্কৃত হয়।

বিমল রায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পরিনীতা’, ‘দেবদাস’, ‘সুজাতা’, ‘মধুমতি’, ‘বিরাজ বৌ’- র গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন৷  সিনেমা জগতের তাঁর খ্যাতি সারাদেশ জুড়ে তো ছিলই, বিদেশেও তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। কেবল শহর নয়, শহরতলী এবং গ্রামের মানুষদের কাছেও তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্র  প্রশংসিত হয়েছিল। ১৯৪০-এর দশকে বিমল রায়ের হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্রে স্বর্ণযুগের সূচনা ঘটেছিল। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি দর্শকদের অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা রাখত।  তাঁর তৈরি ‘দো বিঘা জমিন’ কিংবা ‘সুজাতা’ সমাজের বাস্তবতাকে নিপুণভাবে তুলে ধরে ছিল৷ দো বিঘা জমিন- শ্রেণি এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের সঙ্গে মোকাবিলার কথা যেমন বলেছে তেমনি তাঁর ‘বন্দিনী’ বর্ণভিত্তিক নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছে।  “সুজাতা’ তে দেখানো হয়   একটি নিম্নবর্গের মেয়ে যখন উচ্চবর্ণের পরিবারে বিয়ে হয়ে যায় তখন সে ‘বেটি’ নয় ”বেটি য্যয়সি” হয়ে থাকে।

সমাজেরবোধের আলোয় তৈরী করা তাঁর সিনেমাগুলি আজকের বর্তমান সমাজেও গুরুত্ব হারায়নি । বিমল রায় কে “সাইলেন্ট মাস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিনেমা” বলা হত।   খুব কম সময়ের মধ্যেই বিমল রায় সিনেমা জগতে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন।  যদিও তাঁর ছায়াছবিগুলি পুরোপুরি  বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি তবুও বিমল রায় যে একজন সফল পরিচালক ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই৷ চলচ্চিত্র নির্মান করতে গিয়ে তিনি অর্থ ও লাভের বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। তাঁর ছেলে জয় রায় ২০০৭ সালে বিমল রায়কে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরী করেন। সিনেমা জগত থেকে বিমল রায় যতটা সম্মান ভালোবাসা পেয়েছেন সিনেমার প্রতি তিনি নিজেকে তাঁর থেকেও বেশী উৎসর্গ করেছিলেন৷
‘অমৃতকুম্ভ’ এবং ‘দ্য মহাভারত’ নিয়ে দুটি সিনেমা তিনি করতে চেয়েছিলেন কিন্তু শেষ অবধি তাঁর এই ইচ্ছে অধরাই থেকে যায়।

তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পায় তাঁর তৈরি সিনেমা ‘দো বিঘা জমিন’ এবং ওই একই সালে ‘দো বিঘা জমিন’ সিনেমার জন্য তিনি সেরা পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডে পুরস্কৃত হন। ১৯৫৪ সালে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডের পক্ষ থেকে ‘পরিণীতা’ সিনেমার জন্য তিনি সেরা পরিচালকের খেতাব পান।  ১৯৫৫ সালে ‘বিরাজ বৌ’, ১৯৫৮ সালে ‘মধুমন্তি’, ১৯৫৯ সালে ‘সুজাতা’, ১৯৬০ সালে ‘পারক’ এবং ১৯৬৩ সালে ‘বন্দিনী’ সিনেমার জন্য তিনি  সেরা পরিচালক হিসেবে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ‘দো বিঘা জমিন’ ‘বিরাজ বৌ’ এবং ‘সুজাতা’ সিনেমার জন্য তিনি All India Certificate of Merit for Best Feature Film এর পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে পুরস্কৃত হয়েছিলেন৷ 

১৯৬৬ সালের ৮ জানুয়ারি মাত্র ৫৫ বছর বয়েসে বিমল রায়ের মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।