ইতিহাস

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (Sandhya Mukhopadhyay) একজন প্রবাদপ্রতিম প্লেব্যাক শিল্পী যিনি বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে বেশ কয়েক দশক ধরে শ্রোতাদের মনে পাকাপাকি জায়গা করে নিতে পেরেছেন। বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলতে যে কয়েক দশককে নির্দিষ্ট করা হয়, সেদিকে একবার নজর দিলেই দেখা যাবে, অবিস্মরণীয় শিল্পী, সুরকার, গীতিকারদের সাথে একই নিশ্বাসে উচ্চারিত হয়ে এসেছে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের নাম। পঞ্চাশ বছরেরও বেশী সময় ধরে নানান ভাষার ছবিতে প্লেব্যাক ছাড়াও, বাংলা আধুনিক গান ও ধ্রুপদী সঙ্গীতের জগতে সমান পারদর্শিতায় রাজত্ব করে গেছেন তিনি।

১৯৩১ সালের ৪ অক্টোবর, দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়ায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম হেমপ্রভা দেবী। তাঁর বাবা চাকরি করতেন রেলওয়েতে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়রা ছিলেন মোট ছয় ভাইবোন। তাঁর এক ভাই এবং এক বোনের কম বয়সেই মৃত্যু হলেও, তাঁর দাদা রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তাঁর সবথেকে কাছের মানুষ এবং সঙ্গীত শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর মূল উৎসাহদাতা। পরবর্তীকালে সঙ্গীত শিক্ষার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বারেবারেই তাঁর দাদাকে পাশে পেয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।১৯৬৬ সালে গীতিকার শ্যামল গুপ্তের সাথে বিবাহ হয় তাঁর। তাঁদের একমাত্র কন্যার নাম ঝিনুক এবং পৌত্রের নাম রাহুল।

কলকাতায় যে সময় সব বাড়িতে রেডিও বা রেকর্ড প্লেয়ারের ব্যবহার ছিলনা, সেই সময়ে থেকেই বাবার সাথে মাঝেমাঝেই ঠাকুর দেবতার গান গাইতেন কিশোরী সন্ধ্যা।মায়ের কাছেই খুব ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গীতশিক্ষার হাতেখড়ি। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলেও তাঁর ডাক পড়তো গান শোনানোর জন্য। তাঁর পাড়ার কোনও বাড়ি থেকে রেডিওতে গানের সুর ভেসে এলে সন্ধ্যা ছুটে যেতেন সেই গান শুনতে। যদিও সেই সময়ে বড় হয়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের কাছে এটা নেহাতই সাধারণ ঘটনা ছিল কিন্তু বোনের মধ্যে ভবিষ্যতের গায়িকা হওয়ার সম্ভাবনার আভাষ পেয়েছিলেন তাঁর দাদা। তিনিই তাঁকে নিয়ে যান তাঁর প্রথম গানের শিক্ষক ডক্টর যামিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। খুব ছোট বয়স থেকেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বাদ পেয়ে বড় হয়ে ওঠার ফলেই বোধ হয়, সেই মোহ তাঁর মনে রয়ে গেছে আজীবন। তখন থেকেই শুরু অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স বা অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সের অন্তর্গত বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলিতে অংশগ্রহণ, প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে সে সব মঞ্চে সমাদৃত হওয়া এবং সেই সুত্র ধরেই তখনকার স্বনামধন্য সুরকারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এরই মাঝে ১৯৪৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বেসিক গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। সেই প্রথম গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে প্রকাশিত রেকর্ডে তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় “তোমারো আকাশে ঝিলমিল করে চাঁদের আলো”। এই নতুন পথে চলার সাথেসাথেই চলতে থাকে তাঁর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা। ১৯৪৬ সালের ৬ই এপ্রিল গীতশ্রী পরীক্ষায় প্রথম স্থান পান তিনি। ভজনের পরীক্ষাতেও প্রথম হন সেই সময়। এই পরীক্ষায় তাঁর পরীক্ষক হিসেবে ছিলেন উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, উস্তাদ মহম্মদ দাবির খাঁ এবং রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সন্ধ্যা তাঁর এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর দাদার কাছে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন, যদি কোনোভাবে উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেবের কাছে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। তাঁর দাদা সেই কথা গিয়ে জানান পণ্ডিত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষকে। পণ্ডিতজীর ডিকসন লেনের বাড়িতেই উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। তারপর দীর্ঘ দিন,মাস, বছর ধরে চলে উস্তাদ বড়ে গুলাম আলির খাঁ সাহেবের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শিক্ষা ও অনুশীলন। দিনরাত কেটে যেত নানান স্বাদের রাগ, ঠুংরি, দাদরার সুরের সাধনায়। পাতিয়ালা ঘরানার সুরের ভাঁড়ার উজার করে দিয়েছিলেন উস্তাদজি তাঁর এই অসাধারণ ছাত্রীর কাছে। উস্তাদ বড়ে গুলাম আলির প্রয়াণের পরেও তাঁর পুত্র উস্তাদ মুনাওয়ার আলি খাঁর কাছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় চালিয়ে গেছেন তাঁর তালিম। তাঁর গলার মাদকতা, তাঁর অসাধারণ সুরের বোধ, শ্রোতাদের নিয়ে যেত এক অন্য সুরলোকে।

১৯৪৮ সালে প্রথমবার ‘অঞ্জনগড়’ ছবির জন্য প্লেব্যাক গাইতে শোনা যায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সন্ধ্যা এক জায়গায় বলেন এই গান রেকর্ডিংয়ের আগে এক মাস ধরে সুরকার শ্রী রাইচাঁদ বড়ালের তত্ত্বাবধানে অনুশীলন করতে হয়েছিল তাঁকে, কারণ সেটাই ছিল সেই সময়ের দস্তুর। ছবির সাথে যুক্ত সব শিল্পী, কলাকুশলী এসে হাজির হতেন রেকর্ডিংয়ের সময়। ‘সমাপিকা’ ছবির জন্য গান গাওয়ার সময় নায়িকা সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সন্দেহ ছিল এত অল্পবয়সী শিল্পীর গান তাঁর গলায় মানাবে কিনা। রেকর্ডিংয়ে হাজির থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছিলেন তিনি।

এরই মাঝে বেশ কিছু হিন্দি ছবির জন্য গান করেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। ১৯৫০ সালে ‘পহেলা আদমি’, ১৯৫১ সালে শচীন দেববর্মণের সুরে ‘সাজা’, সেই বছরেই অনিল বিশ্বাসের সুরে লতা মঙ্গেশকরের সাথে ডুয়েট ”বোল পপিহে বোল”, ১৯৫৩ সালে মদনমোহনের সুরে ‘বাগী’, অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘ফরেব’ তাঁকে এনে দেয় দেশজোড়া খ্যাতি। এমনই কোনও এক রেকর্ডিংয়ে তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়ে অভিনেতা, পরিচালক রাজ কাপুর তাঁকে অনুরোধ করেন তাঁর ডাবল ভার্সন ছবি ‘জাগতে রাহো’ তে গান গাওয়ার জন্য। জাগতে রাহো ছবিতে সলিল চৌধুরীর সুরে তাঁর গাওয়া “ম্যায়নে জো লি অঙ্গরায়ি” আজও সঙ্গীতমোদীদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। রাইচাঁদ বড়াল থেকে শুরু হওয়া যাত্রা রবিন চট্টোপাধ্যায়, অনুপম ঘটক, সলিল চৌধুরী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় সহ সমসাময়িক প্রায় সব দিকপাল সুরকারের ছোঁয়ায় প্রজাপতির মতো রং ছুইয়ে গেছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের জুটি অমর হয়ে আছে উত্তমকুমার সুচিত্রা সেনের মুখে চিত্রায়িত বহু রোম্যান্টিক গানে। “গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু”, “ফুলের কানে ভ্রমর আনে”, “এ শুধু গানের দিন”, “এই মধুরাত”, “এই পথ যদি না শেষ হয়” বাঙ্গালীর রোম্যানটিকতার সমার্থক হয়ে রয়ে গেছে।

প্লেব্যাক গানের বাইরে বেসিক গানের দুনিয়ায় তাঁর অমরত্বের প্রমাণ বয়ে চলেছে “হয়ত কিছুই নাহি পাবো”, “মধুর মধুর বংশী বাজে”, “তারা ঝিলমিল স্বপ্ন মিছিল”, “গুন গুন মন ভ্রমরা”, “আয় বৃষ্টি ঝেপে, ধান দেবো মেপে”র মতো কালজয়ী সব গান। “মায়াবতি মেঘে এলো তন্দ্রা”, “ওগো সিঁদুর রাঙা মেঘ”, “ও বক বক বকুম বকুম পায়রা”, “শঙ্খ বাজিয়ে মাকে ঘরে এনেছি”, “বাধে ঝুলনা”, “আহা কি মিষ্টি”, “কে তুমি আমারে ডাকো”, “চম্পা চামেলি গোলাপেরই বাগে” এই সব অফুরন্ত গানের ডালি প্রমাণ করে কি ভাবে শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় বাঙ্গালীর জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন গত পাঁচ দশক পার করেও।

১৯৬৫ সালে ‘সন্ধ্যাদীপের শিখা’ ছবির জন্য তিনি বি এফ জে এ পুরস্কার পান। ১৯৭১ সালে ‘জয় জয়ন্তী’ ছবিতে “আমাদের ছুটি ছুটি” এবং নিশিপদ্ম ছবিতে “ওরে সকল সোনা মলিন হল” গান দুটির জন্য শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পান। ১৯৯৯ সালে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের জন্য ভারত নির্মাণ সম্মান পান। ২০১১ সালে তাঁকে বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে তিনি সক্রিয়ভাবে জনজাগরনের কাজে যুক্ত হন। হাজারে হাজারে শরণার্থীরা তখন প্রাণ বাঁচাতে ছুটে আসছে এপার বাংলায়। তাঁদের জন্য অর্থ সাহায্য তোলার কাজে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে এই ঘটনার দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় পূর্ব বাংলার শিল্পী শ্রী সমর দাসের সহায়তায় কলকাতায় “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” তৈরি করেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যখন দেশে ফিরে আসেন, সেই সময় স্বাধীন বাংলাদেশের দেশনায়কের উদ্দেশ্যে তিনি গান, “বঙ্গবন্ধু তুমি ফিরে এলে” গানটি। সারা জীবনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে গেছেন তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করতে, তারই মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ১৯৭১ সালে ঢাকার পল্টন ময়দানে খোলা আকাশের নিচে প্রথমবার একুশে ফেব্রুয়ারির স্মরণে অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গীত পরিবেশন।

এত উজ্জ্বল এক জীবনের পরেও এখনও তিনি প্রথম দিনের মতোই নম্র, স্বাভাবিক। এখনও কোনও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান থাকলে হাল্কা গান গাওয়ার অনুরোধ ফিরিয়ে দেন তিনি। সঙ্গীতের প্রতি এই নিবেদিত থাকাই বোধ হয় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সাফল্যের চাবিকাঠি। যতদিন গলায় সুর থাকবে ততদিনই তিনি গান গেয়ে যাবেন, তাঁর বেশী নয়। এত সাফল্যের পরেও এতটা নির্লিপ্তি সবার থাকেনা। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের আছে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন