খেলা

লিয়েন্ডার পেজ

লিয়েন্ডার আদ্রিয়ান পেজ (Leander Paes) একজন বিখ্যাত ভারতীয় টেনিস খেলোয়াড় যিনি ডেভিস কাপে ডাবলস বিভাগে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ডের অধিকারী হওয়ার পাশাপাশি টেনিস খেলার ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা ডাবলস খেলোয়াড় হিসাবে বিবেচিত হন।

১৯৭৩ সালের ১৭ জুন কলকাতায় লিয়েন্ডার পেজের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবা ভেস পেজ ছিলেন ব্রোঞ্জপদক জয়ী ভারতীয় হকি খেলোয়াড় যিনি  ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে জাতীয় হকি দলের সদস্য ছিলেন।  লিয়েন্ডারের মা জেনিফার পেজ ছিলেন একজন নামকরা বাস্কেটবল খেলোয়াড়। তাঁর মায়ের দিক থেকে লিয়েন্ডার পেজ ছিলেন বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বংশধর৷

লিয়েন্ডার পেজের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল লা মার্টিনিয়ার ক্যালকাটা স্কুল থেকে৷ এরপর তিনি মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে  পড়াশোনা করেন৷ স্কুলের পাঠ শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন৷ পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে এরপর তিনি ১৯৮৫ সাল নাগাদ চেন্নাইয়ের ব্রিটানিয়া অমৃতরাজ টেনিস একাডেমিতে ভর্তি  (Britannia Amritraj Tennis Academy) হন৷ এখানে তাঁর কোচ ছিলেন ডেভ ও’মায়ারা।

লিয়েন্ডারের কর্মজীবন বলতে তাঁর খেলোয়াড় জীবনের কথাই বলতে হয়৷ লিয়েন্ডার পেজ জুনিয়র ইউএস ওপেন এবং জুনিয়র উইম্বলডনে শিরোপা জেতার পর ১৯৯১ সাল থেকে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে টেনিসে পদার্পণ করেন৷ ১৯৯২ সালে তিনি রমেশ কৃষ্ণণনের সঙ্গে বার্সেলোনা অলিম্পিকে ডাবলস ইভেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছন৷ ১৯৯৬ সালের আটলান্টা অলিম্পিকে  তিনি ফার্নান্দো মেলিগেনিকে পরাজিত করে ব্রোঞ্জ পদক জেতেন। তাঁর আগে একমাত্র কে.ডি.যাদব ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ভারতের হয়ে প্রথম ব্যক্তিগত স্তরে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন৷ এই ম্যাচের পর লিয়েন্ডারের কব্জিতে গুরুতর আঘাত লাগে।

১৯৯৩ সাল ছিল তাঁর জীবনের সফলতম বছর৷ তিনি ইউএস ওপেনের ডাবলস সেমিফাইনালে সাবাস্তিয়ান লারোর সাথে জুটি বাঁধেন। তবে তাঁর জীবনের সবথেকে সফল ডাবলস জুটি ছিলেন মহেশ ভূপতি। তাঁদের এই জুটি লি-হেশ নামে পরিচিত ছিল৷

১৯৯৯ সালে লিয়েন্ডার পেজ ও মহেশ ভূপতি যুগ্মভাবে  গ্র্যান্ড স্ল্যাম, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফরাসী ওপেন এবং ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন৷ তাঁদের এই জুটি চারটি গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে পৌঁছেছিল। তাঁরা উইম্বলডন এবং ফরাসী ওপেনে জয় লাভ করে গ্র্যান্ড স্লামের ডাবলস ইভেন্টে জয়লাভ করা প্রথম ভারতীয় জুটি হয়ে ওঠেন।

২০০২ সালে বুশানে (Busan) অনুষ্ঠিত হওয়া এশিয়ান গেমসে  পেজ ও ভূপতির জুটি স্বর্ণপদক জেতে৷ ২০০৩ সালে তিনি মার্টিনা নাভ্রাতিলোভার সঙ্গে জুটি বেঁধে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন এবং উইম্বলডনে মিক্স ডাবলস ইভেন্ট জেতেন৷ তাঁর কেরিয়ারের এই সোনার অধ্যায় চলাকালীন সময়েই মাথায় টিউমার সন্দেহে তাঁকে এম ডি আন্ডারসন ক্যানসার সেন্টারে ভর্তি করানো হয় যা পরে নিউরোসাইকাস্টারোসিস বা মস্তিষ্কে পরজীবী সংক্রমণ বলে প্রমাণিত হয়৷ এরফলে তিনি ইউএস ওপেনে নামতে পারেননি৷

২০০৪ সালে এথেন্স অলিম্পিকে তিনি ভূপতির সঙ্গে আবার জুটি বাঁধেন কিন্তু সেমিফাইনালে পৌঁছে তাঁরা হেরে যান। এরপর আবার  ২০০৬ সালে গ্র্যান্ড স্ল্যামে তাঁর সাফল্য আসে। ওই বছরই দোহা এশিয়ান গেমসে ভারতীয় টেনিস দলকে লিয়েন্ডার পেজ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেখানে ভূপতির সঙ্গে জুটিতে পুরুষদের ডাবলসে দুটি সোনা পান এবং সানিয়া মির্জার সঙ্গে জুটি বেঁধে মিক্সড ডাবলসে আরও দুটি সোনা জেতেন। ২০১০ সাল তাঁর খেলোয়াড় জীবনে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রচনা করেছিল। এই মরসুমে তিনি দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন৷ তিনি কারা ব্ল্যাকের সাথে যুগ্মভাবে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন মিক্সড ডাবলস শিরোপা জিতেছিলেন।  এই জুটি টানা তৃতীয়বার গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল জেতে৷  লিয়েন্ডার পেজ ২০১৫ সালে ক্লাসেনের( Klaasen) সঙ্গে জুটি বেঁধে এটিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুর শুরু করেন৷

১৯৯০ সালে লিয়েন্ডার পেজ তাঁর ডেভিস কাপের কেরিয়ার শুরু করেন। জুলাই ২০১৫ পর্যন্ত তাঁর ডেভিস কাপের রেকর্ডটি ছিল ৮৯-৩২। পেশাদার টেনিস কেরিয়ারে ১৮টি ডাবলস গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছিলেন লিয়েন্ডার পেজ। পেজ ও ভূপতি ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে পুরুষদের ডাবলসে অংশ নিয়েছিলেন যদিও তাঁরা কোয়ার্টার ফাইনালে রজার ফেদেরার এবং স্ট্যানিস্লাস ওয়াওরিঙ্কার কাছে পরাজিত হন ৷  কারা ব্ল্যাকের সাথে তিনি ২০০৮ সালে ইউএস ওপেনের মিক্সড ডাবলস শিরোপা জিতেছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি ফরাসী ওপেন এবং ২০১০ সালে  অস্ট্রেলিয়ান ওপেন মিক্সড ডাবলস জেতেন। তাঁর খেলোয়াড় জীবনে জয়ের শিরোপা চলতেই থাকে৷ বছরের পর বছর একটার পর একটা কৃতিত্বের পালক তাঁর মুকুটে জুড়ে যায়৷ ১৯৯২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে অলিম্পিক গেমসে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। লিয়েন্ডার পেজ হলেন প্রথম ভারতীয় টেনিস খেলোয়াড় যিনি সাত সাতটি অলিম্পিক গেমসে অংশ গ্রহণ করেছেন। তিনি ভারতীয় ডেভিস কাপ দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ছিলেন এবং ডেভিস কাপে পুরুষদের ডাবলস্ ইভেন্টে ৪৩ টি ম্যাচ জিতে সর্বাধিক জয়ের রেকর্ড গড়েন।

লিয়েন্ডার পেজ হরিয়ানা রাজ্যের ক্রীড়াদূত নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি এবং মহেশ ভূপতির জুটি বহুবার বহু খেলায় সাফল্যের মুখ দেখেছে৷ মাঠের বাইরেও তাঁদের দুজনের বন্ধুত্ব অটুট ছিল৷ তাঁদের এই জুটির একসাথে ৩০৩-১০১ স্কোরের রেকর্ড রয়েছে। বিভিন্ন শীর্ষ দলের বিপক্ষে তাঁদের সাফল্যের হার অন্যান্য ভারতীয় ডাবলস জুটির তুলনায় অনেক বেশি।

খেলোয়াড় জীবনের বাইরে লিয়েন্ডার পেজ অশোক কোহলি পরিচালিত ‘রাজধানী এক্সপ্রেস’ সিনেমায় অভিনয় করেন৷ এটিই  তাঁর অভিনীত  প্রথম সিনেমা  ।

লিয়েন্ডার পেজ ১৯৯৬ সালে  রাজীব গান্ধী খেলরত্ন পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০১ সালে লিয়েন্ডার পেজ পদ্মশ্রী দ্বারা সম্মানিত হন৷ ২০১০ সালে তিনি অলিম্পিক গোল্ড কোয়েস্টের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন৷ 

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।