সববাংলায়

ধনতেরাস

বিভাগঃ ,

হিন্দুদের কাছে দীপাবলি মূলত আলোর উৎসব বলেই পরিচিত। খুব সাধারণভাবে বলতে গেলে বাঙালিদের পালনীয় দ্বীপান্বিতা কালীপূজা এই দীপাবলিরই অঙ্গ। তবে শুধু হিন্দুরাই নয়, বৌদ্ধ, শিখ এবং জৈন ধর্মাবলম্বীরাও এই দীপাবলি উৎসব পালন করে থাকেন পৃথক পৃথক তাৎপর্যকে মাথায় রেখে। বাংলা বর্ষপঞ্জির আশ্বিন-কার্তিক মাসে অনুষ্ঠিত এই দীপাবলি উৎসবেরই প্রথম দিনটিকে বলা হয়ে থাকে ধনতেরাস। মূলত অবাঙালিদের মধ্যে অধিক প্রচলিত এই উৎসব। এই দিনে সোনা বা অন্য কোনো ধাতু কেনা শুভ ফলদায়ক বলে মনে করা হয়।  

২০২৫ সালের ধনতেরাস কবে?

  • বাংলা তারিখ: ৩১ আশ্বিন, ১৪৩২
  • ইংরাজি তারিখ: ১৮ অক্টোবর, ২০২৫

ধনতেরাসকে অনেক জায়গায় ‘ধনত্রয়োদশী’ নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। ‘ধন’ মানে হল সম্পদ আর ‘তেরাস’ হল ত্রয়োদশী তিথি অর্থাৎ ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় এই উৎসব। 

ধনতেরাসের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখবো প্রাচীনকালে রাজা ‘হিম’-এর পুত্র এই ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে আসেন যে, বিয়ের চতুর্থ দিন রাতে সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হবে। তাঁর সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে নিজের যাবতীয় সোনা-রূপোর গয়না স্তূপাকারে জড়ো করে রাখেন স্বামীর শোওয়ার ঘরের দরজায় এবং সমস্ত ঘর প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে দেন সাপের পথ আটকাতে। এরপর তিনি সারারাত গল্প বলে, গান গেয়ে স্বামীকে জাগিয়ে রাখেন। যখন যম সাপের বেশে সেই রাজপুত্রের ঘরে প্রবেশ করতে যান, তার চোখ ধাঁধিয়ে যায় অলঙ্কার ও প্রদীপের ঔজ্জ্বল্যে। ঘরে ঢোকার আগেই বাধা পেয়ে যম ওই সোনার স্তূপের উপর উঠে অন্যপথে প্রবেশ করতে যান। কিন্তু রাজরানীর গল্পে ক্রমশ আকৃষ্ট হয়ে সারারাত সেখানেই কাটিয়ে পরদিন ভোরে নিঃশব্দে ফিরে যান তিনি। যেহেতু সোনার অলঙ্কার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রাজকুমারকে বাঁচায়, তাই এই দিন ধন-সম্পদের আরাধনা করা হয়। এই কারণে ধনতেরাস উপলক্ষ্যে সোনা কেনার বিশেষ প্রবণতা দেশ জুড়ে দেখা যায়।

এছাড়াও কেউ কেউ বলেন, একসময় দুর্বাশা মুনির অভিশাপে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন লক্ষ্মী। রাক্ষসদের সঙ্গে লড়াই করে ধনতেরাসের দিনেই দেবতারা ফিরে পান দেবী লক্ষ্মীকে। হারিয়ে যাওয়া লক্ষ্মীকে ফেরানোর উৎসব হল ধনতেরাস। আবার পুরাণে বলা হয়েছে যে সমুদ্র মন্থনের সময় ধনত্রয়োদশী তিথিতে দুধসাগর থেকে উত্থিতা হন দেবী লক্ষ্মী। তাই এই দিনে লক্ষ্মী দেবীর আরাধনা করা হয়। অনেক জায়গায় আবার আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের জনক ধন্বন্তরির পুজো করা হয় ধনতেরাসের দিন। মানবজাতির সুস্থতার কামনায় এবং নীরোগ শরীরের প্রার্থনায় ধন্বন্তরির পূজা করা হয়। হিন্দু পুরাণে বলা হয়, সমুদ্র মন্থনের সময় এক হাতে একটি কলসের মধ্যে অমৃত নিয়ে এবং অন্য হাতে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মূলগ্রন্থ নিয়ে সমুদ্র থেকে উঠে আসেন ধন্বন্তরি। তাঁকেই দেবতাদের মধ্যে বৈদ্য বলা হয়।

ধনতেরাস সম্পর্কে আরেকটি পৌরাণিক কাহিনী পাওয়া যায়। একবার দেবী লক্ষ্মী তাঁর মর্ত্যযাত্রার সময় শ্রীবিষ্ণুকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইলে শ্রীবিষ্ণু এই প্রস্তাবে সম্মত হন কিন্তু একটি শর্ত দেন যে মর্ত্যে গেলে লক্ষ্মী যেন কোনোভাবেই পৃথিবীর শোভা বা অন্য কিছু দেখে মোহিত হয়ে দক্ষিণ দিকে না তাকান। এই শর্তে রাজি হয়ে লক্ষ্মী শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে মর্ত্যে নেমে আসছিলেন। ঠিক এরই মাঝে দেবী লক্ষ্মীর মনে দক্ষিণ দিকে কী আছে দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগে। চঞ্চল স্বভাবের জন্য তিনি কিছুতেই যখন সেই ইচ্ছাকে দমন করতে পারলেন না, সেই সময় দক্ষিণ দিকে তাকালেন দেবী লক্ষ্মী এবং তাকানো মাত্র পৃথিবীর মাটিতে হলুদ সর্ষে ফুলে ঢাকা বিস্তীর্ণ ক্ষেত দেখে মোহিত হয়ে গেলেন। একইসঙ্গে তিনি পৃথিবীর মাটিতে আখের ক্ষেতও দেখতে পান। আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঐ সর্ষেফুল দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে তোলেন আর আখের রস খেতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে বিষ্ণু এই ঘটনা দেখতে পান এবং প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন দেবীর উপরে। বিষ্ণুর কথা অমান্য করার শাস্তি হিসেবে দেবীকে তিনি বলেন যে আগামী বারো বছর মর্ত্যে এক কৃষকের অনুগত কর্মী হয়েই তিনি জীবন নির্বাহ করবেন। এতে কৃষকের ঘরে লক্ষ্মী আসায় তিনি ধনে-মানে সমৃদ্ধ হয়ে উঠলেন। বারো বছর পরে প্রতিশ্রুতিমতো বিষ্ণু যখন ছদ্মবেশে তাঁকে বৈকুণ্ঠে নিয়ে যাওয়ার জন্য নিতে এলেন, সেই কৃষক লক্ষ্মী দেবীকে কিছুতেই ছাড়তে চাইলেন না। তিনিই যে তাঁর সমৃদ্ধির কারণ, কেনই বা তিনি দেবীকে ছাড়তে যাবেন! পরে বিষ্ণু এবং দেবী লক্ষ্মী উভয়েই স্বরূপ ধারণ করে বিশদে ঘটনাটি বলেন কৃষককে। দেবী লক্ষ্মী তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে প্রতি বছর কৃষ্ণাত্রয়োদশী তিথিতে তিনি তাঁর ঘরে আসবেন। এই উপলক্ষ্যে কৃষক প্রতি বছর ঐ বিশেষ দিনের আগে ঘর-দোর পরিষ্কার করে রাখেন দেবী লক্ষ্মীর আগমনের আশায়। এই ঘটনাই জুড়ে গেছে ধনতেরাসের আচার-সংস্কারের সঙ্গে।  

এই ধনতেরাসের দিন রাত্রের প্রদীপ জ্বলে ওঠে যখন ঘরে ঘরে দেবী লক্ষ্মীর পূজা শুরু হয় ভারত জুড়ে। তার সঙ্গে চলে ভজন, দেবী লক্ষ্মীকে নিয়ে নানাবিধ ভক্তিগীতি। বহু মিষ্টি নৈবেদ্য হিসেবে অর্পণ করা হয় দেবীকে। মহারাষ্ট্রে এই নৈবেদ্য হিসেবে ধনে বীজের সঙ্গে গুড় মিশিয়ে অর্পণ করা হয়। দীপাবলির আগে আগে এই দিনে সকলেই নিজ নিজ ঘর পরিস্কার করে রাখেন। বাড়ির সদর দরজা আলোকিত হয় নানা রঙের প্রদীপ, লণ্ঠন ইত্যাদি দিয়ে এবং দরজার সামনে আঁকা হয় ‘রঙ্গোলি’। সম্পদ ও সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীকে আবাহন জানাতে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বিন্যাসে এই রঙ্গোলি আঁকার রীতি চলে আসছে বহুকাল ধরে। 

হিন্দুরা এই দিনটিকে বিশেষভাবে কিছু কেনাকাটার জন্য শুভ সময় বলে মনে করেন। সোনা, রূপোর গয়না বা অন্য কোনো ধাতু কিনে থাকেন অনেকে। ফলে এই সময় সোনার অলঙ্কার কেনার একটা ঢল নামে সারা ভারত জুড়ে। মূলত অবাঙালিদের মধ্যে এই ধনতেরাস পালনের রীতি থাকলেও বর্তমানে বাঙালিরাও এই ধনতেরাসকে তাদের উৎসবের তালিকায় স্থান দিয়েছে।   


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading