ইতিহাস

অন্নদাশঙ্কর রায়

অন্নদাশঙ্কর রায় (Annada Shankar Ray) বাংলা সাহিত্যের একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক। কেবল বাংলা ভাষা নয়, ওড়িয়া ভাষাতেও তিনি সাহিত্য রচনা করেছেন।

 ১৯০৪ সালের ১৫ মার্চ ওড়িশার ঢেঙ্কানালে জমিদার বংশে অন্নদাশঙ্কর রায়- এর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন নিমাইচরণ রায় ও মা হেমনলিনী রায়। প্রথম থেকেই অন্নদাশঙ্করের পারিবারে সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা ছিল। অন্নদাশঙ্করের ঠাকুরদা শ্রীনাথ রায়, বাবা নিমাইচরণ রায় ও কাকা হরিষচন্দ্র রায় সকলেই ছিলেন সাহিত্যরসিক ও সাহিত্যের অনুরাগী। অন্নদাশঙ্করের মা ছিলেন বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ও বাবা ছিলেন শাক্ত সম্প্রদায়ের। অন্নদাশঙ্করের বাবা নিমাইচরণ ‘শ্রী চৈতন্যচরিতামৃত’-এর ওড়িয়া অনুবাদ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কোতরাং গ্রামে ছিল তাঁদের আদি বাড়ি।

অন্নদাশঙ্কর রায় -এর প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ন হয় ওড়িশার ঢেঙ্কানাল জেলা থেকেই। ১৯২৩ সালে তিনি আই.এ পরীক্ষায় প্রথম হন। এরপরে তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কটকের (রাভেন্স) কলেজে স্নাতক স্তরে ভর্তি হন। ১৯২৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ প্রথম শ্ৰেণীতে (রাভেন্স) কলেজ থেকে বি.এ পরীক্ষায় উতীর্ণ হন।

কটকে পড়াশোনা করার সময় অন্নদাশঙ্কর ‘উৎকল সাহিত্য’ নামে একটি ওড়িয়া পত্রিকায় বেনামে লেখা পাঠাতেন। তাঁর লেখা ছোটগল্প ‘স্বপ্না’ ও প্রবন্ধ ‘খেলাঘর’ বেনামে প্রকাশিত হয়েছিল এই পত্রিকায়।  ১৯২২-১৯২৬ সাল অবধি এই পত্রিকায় তাঁর লেখা কবিতা, প্রবন্ধ ও তিন খণ্ডের একটি উপন্যাস ‘বাসন্তী’ প্রকাশিত হয়েছিল। বিখ্যাত ওড়িয়া লেখক কালিন্দীচরণ অন্নদাশঙ্করের লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কলেজ শেষের পর সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের সাথে অন্নদাশঙ্করের পরিচয় তাঁকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করতে অনুপ্রাণিত করে।

অন্নদাশঙ্কর রায় সাহিত্য রচনার সাথে সাথে এম.এ পরীক্ষা ও তার সাথে ICS (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। ১৯২৭ সালে তিনি ICS পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ওড়িশার প্রথম ICS অফিসার নির্বাচিত হন। এরপর  উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান। ইংল্যান্ডে সিভিল সার্ভিসের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ফাঁকে তিনি নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। ইংল্যান্ড সহ জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স নানা দেশ তিনি ভ্রমণ করেছিলেন। এই বিশ্ব ভ্রমণ তাঁকে ভ্রমণ কাহিনীর রসদ জোগায়। তিনি তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইতিহাস নিয়ে লেখা শুরু করেন। তাঁর কলমে সৃষ্টি হতে শুরু করে নানা সাহিত্য, প্রবন্ধ, গদ্য, পদ্য, উপন্যাস। অবশেষে ১৯৩১ সালে ‘পথে প্রবাসে’ বইটি প্রকাশের সাথে বাংলা সাহিত্য জগতে অন্নদাশঙ্কর নিজের জায়গাটি পাকা করে নেন।

পড়াশোনা শেষ করার পর ১৯২৯ -১৯৪৭ সাল অবধি তিনি অভিবক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ হিসাবে কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি মুর্শিদাবাদ, বাঁকুড়া, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ত্রিপুরা, হুগলি, হাওড়া ইত্যাদি জায়গায় শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগীয় কাজের দায়িত্ব পালন করেছেন।১৯৪৭ সালের পর উচ্চপদে IAS (ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস) অফিসার নিযুক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ও বিচারবিভাগীয় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫১ সালে তিনি স্বেচ্ছায় বিচার বিভাগের সচিব পদ থেকে (দীঘ ২২ বছরের কর্মজীবন) অব্যাহতি নেন এবং সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন।

ওড়িয়া ভাষার সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু হয়। ওড়িয়া, হিন্দি, ইংরেজি, সংস্কৃত ভাষা জানলেও বাংলা ভাষাকেই তিনি সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। ছোট বয়স থেকেই বাড়িতে কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত, চন্ডীদাসের পদাবলী পড়তে অন্নদাশঙ্কর রায় অভ্যস্ত ছিলেন। বাড়িতে সাহিত্য চর্চা থাকায় ইউরোপীয় সাহিত্য ও প্রবন্ধ সম্পর্কেও ছোট থেকেই তাঁর ধারণা গড়ে ওঠে। তবে বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর আজন্মলালিত একটা টান ছিল। বাংলায় লেখা ছোটদের ‘সন্দেশ’, ‘মৌচাক’, ‘সবুজপত্র’, ‘প্রবাসী’ প্রভৃতি পত্রিকার তিনি নিয়মিত পাঠক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও প্রমথ চৌধুরির লেখা অন্নদাশঙ্করকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছিল। পরবর্তীসময়ে তাঁর নিজের লেখার ক্ষেত্রেও এই দুই লেখকের স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।

 ১৯২০ সালে ষোল বছর বয়সে অন্নদাশঙ্কর টলস্টয়ের ছোট গল্প ‘The Three Questions’ এর বাংলা অনুবাদ ‘তিনটি প্রশ্ন’ রচনা করেন যেটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল সেই সময়।
অন্নদাশঙ্করের লেখা প্রথম প্রকাশিত বাংলা প্রবন্ধের নাম ‘তারুণ্য’ যেটি ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রায় সত্তর বছর ধরে অন্নদাশঙ্কর রায় নানা সাহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন। ছোট গল্প, উপন্যাস, মহাকাব্য, গদ্য, পদ্য, ছড়া, ভ্রমণ কাহিনী ইত্যাদি। অন্নদাশঙ্করই প্রথম যিনি বাংলায় মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনার পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁর লেখা প্রথম মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘সত্যাসত্য’ কে তিনি ছয়টি খন্ডে প্রকাশিত করেছিলেন। যেগুলি হল:- ‘যার যেথা দেশ’ (১৯৩২), ‘অজ্ঞাতবাস’ (১৯৩৩), ‘কলঙ্কবতী’ (১৯৩৪), ‘দুঃখমোচন’ (১৯৩৬), ‘মত্যর স্বর্গ’ (১৯৪০), ‘অপসরণ’ (১৯৪২)।

তাঁর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘অসমাপিকা'(১৯৩১)। এছাড়া তাঁর রচিত অন্যান্য উপন্যাসগুলি হল – ‘পুতুল নিয়ে খেলা'(১৯৩৩), ‘কন্যা’ (১৯৫৩), চারখন্ডে প্রকাশিত মহাকাব্যিক উপন্যাস – ‘ক্রান্তদশী’ যেটি তৎকালীন সময়ের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চারটি পর্যায়ে রচনা করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ব্রিটিশ-কংগ্রেস-মুসলিম রাজনীতি, দেশভাগ-দাঙ্গা পরিস্থিতি উপর দৃষ্টিপাত করে তাঁর এই উপন্যাস রচিত। অন্নদাশঙ্করের অন্যতম জনপ্রিয় ছড়া ‘খুকু ও খোকা’। ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’ নামে অবশ্য ছড়াটি বেশি পরিচিত।

অন্নদাশঙ্করের সাহিত্য সৃষ্টি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। তাঁর লেখা গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ একসময় বাংলাদেশের পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।জীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছিলেন।যেমন:-বর্ধমান, রবীন্দ্রভারতী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট, ১৯৬২ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার। এছাড়াও আনন্দ পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, নজরুল পুরস্কার সহ আরও অসংখ্য পুরস্কার তিনি পেয়ছেন।

২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর আটানব্বই বছর বয়সে এই অসামান্য প্রতিভার মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।