ধর্ম

অলক্ষ্মী পূজা

দুর্গাপূজা মিটলেই বাংলার ঘরে ঘরে সুখ-সমৃদ্ধির কামনায় শুরু হয়ে যায় দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার তোড়জোড়। আশ্বিন মাসের কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী নেমে আসেন মর্ত্যভূমিতে। ষোড়োশোপচারে তাঁর আরাধনা করে আপামর বাঙালি, তাকেই আমরা বলে থাকি কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। আদিকাল থেকেই দেবী লক্ষ্মী সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাংলায় পূজিতা হয়ে আসছেন। দেবীকে অর্পণ করা হয় ধানের ছড়া যার থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীনকালে দেবী লক্ষ্মী আমাদের কৃষি সভ্যতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্রমে বিবর্তিত হতে হতে তিনি ফসলের পাশাপাশি ধন-সম্পদ ও সৌভাগ্যের প্রতিভূ হয়ে ওঠেন। আর এই লক্ষ্মীর বিপরীতেই থাকেন অলক্ষ্মী । সুন্দরের বিপরীতে যেমন থাকে অসুন্দর, সুখের বিপরীতে দুঃখ, তেমনিই দেবী লক্ষ্মীর বিপ্রতীপে অধিষ্ঠান করেন অলক্ষ্মী। বাঙালিদের বিশ্বাস অলক্ষ্মীকে ঘর থেকে দূর করে দেবী লক্ষ্মীকে ঘরে অধিষ্ঠিত করালেই সংসারে সুখ-সমৃদ্ধি আসবে।

দেবী লক্ষ্মী উর্বরতার প্রতীক আর অলক্ষ্মী অমঙ্গল ও অশুভের প্রতীক। মনে করা হয় লক্ষ্মী হলেন পূর্ণিমা আর অলক্ষ্মী হলেন অমানিশা। পুরাণের গল্পে বলা হয় এই লক্ষ্মী আর অলক্ষ্মী আসলে দুই বোন। দেবী লক্ষ্মীর বড়ো বোন দেবী অলক্ষ্মীকে দুর্ভাগ্যের দেবীরূপে কল্পনা করা হয়। কল্কি পুরাণে আবার অলক্ষ্মীকে পরাক্রমী দৈত্য কলির দ্বিতীয়া স্ত্রী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন পুরাণ এবং বৈদিক অনুষঙ্গে অলক্ষ্মীর নানারূপ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও তাকে গোরু-খেদানো, কুৎসিত দর্শন, শুষ্ক দেহ ও কুঞ্চিত গালযুক্ত নারী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, আবার কোথাও বা দেবী অলক্ষ্মী গর্দভের পিঠে অধিষ্ঠিতা। অনেকে মনে করেন দেবী লক্ষ্মীর বাহন যেমন পেঁচা, অলক্ষ্মীও নাকি এই পেঁচার রূপ ধরেই পৃথিবীতে আসেন। পুরাণের কাহিনীতেই আমরা জেনেছি প্রজাপতি ব্রহ্মার মুখের আভা থেকে জন্ম হয়েছিল দেবী লক্ষ্মীর আর ব্রহ্মার পৃষ্ঠদেশ থেকে জন্ম নেন দেবী অলক্ষ্মী। আবার অন্যত্র জানা যায় সমুদ্রমন্থনকালে বাসুকি নাগের বিষ থেকে অলক্ষ্মী আবির্ভূতা হন। লোকের বিশ্বাস অলক্ষ্মী ঘরে থাকলে সর্বনাশ, ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ লেগে থাকবে, সাংসারিক অশান্তি-কলহে সংসারে ভাঙন ধরতে পারে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও হতে পারে। অলক্ষ্মীকে নিয়ে দুটি কাহিনী তথা জনশ্রুতি বহুকাল ধরে সমাজে বাহিত হয়ে আসছে। প্রথম কাহিনীতে বলা হয় বিষ্ণুর সঙ্গে লক্ষ্মীকে সুখে সংসার করতে দেখে অলক্ষ্মী অত্যন্ত রুষ্ট হন। অলক্ষ্মীর তখনো স্বামী-সংসার কিছুই হয়নি। লক্ষ্মী তাঁকে বর দেন যে কলির স্ত্রী হবেন অলক্ষ্মী আর হিংসা-লোভ-মোহ-কাম-অত্যাচার-অশান্তির মধ্যে বাস করবেন তিনি। দ্বিতীয় কাহিনীতে দেখা যায় দুই বোন লক্ষ্মী আর অলক্ষ্মী একবার এক বণিককে জিজ্ঞাসা করেন যে তাদের মধ্যে কে বেশি সুন্দরী। বুদ্ধিমান বণিক এর সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেন যে ঘরে প্রবেশ করলে লক্ষ্মী সুন্দর আর অলক্ষ্মী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি সুন্দর। এর থেকেই বণিকের গৃহে সৌভাগ্যের প্রবেশ এবং দুর্ভাগ্যের প্রস্থান ঘটে।

অলক্ষ্মী রূপী এই দুর্ভাগ্যকে দূর করতেই হিন্দু বাঙালি সমাজে অলক্ষ্মী বিদায়ের রীতি রয়েছে বহুকাল ধরে। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা ছাড়াও বাংলায় কালীপূজা বা দীপাবলির রাতে আরেক রকম লক্ষ্মীপূজা হয়ে থাকে। মূলগতভাবে সেই পূজাটিই হল অলক্ষ্মী বিদায়ের পূজা। এই দিনে ঘর-বাড়ি পরিস্কার করে চালের গুঁড়ো দিয়ে পিটুলি বানিয়ে তা দিয়ে আলপনা দেওয়া হয় সমগ্র ঘর জুড়ে। ঘরের চারপাশে জ্বলে প্রদীপ। ভাঁড়ার ঘর ঝাঁট দিয়ে সব জঞ্জাল একত্রে জড়ো করা হয়। প্রাচীন বাংলার রীতি অনুযায়ী একজন সেই জঞ্জালের কিছুটা একটা ভাঙা কুলোর মধ্যে নিয়ে কাঠি দিয়ে কুলোটিকে পিটতে পিটতে ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ঝেড়ে ফেলেন এবং বলেন ‘অলক্ষ্মী যাও ছারে খারে’। আবার যশোর, খুলনার পূর্ববঙ্গীয় সংস্কৃতিতে গোবর জল দিয়ে অলক্ষ্মীর মূর্তি গড়া হয় এবং পিটুলি দিয়ে তৈরি করা হয় লক্ষ্মী, কুবের ও নারায়ণের মূর্তি। ঘরের বাইরে অলক্ষ্মীর মূর্তি কলার খোলে বসিয়ে প্রথমে তার পুজো করা হয় এবং পরে পুজো শেষ হলে বাড়ির মহিলারা কুলো পিটাতে পিটাতে অলক্ষ্মীর মূর্তি মাথায় নিয়ে ‘অলক্ষ্মী দূর হ’ বলতে বলতে চলে যান। প্রথমে এভাবে অলক্ষ্মীকে বিদায় করে বাড়ি ফিরে মহিলারা সমবেতভাবে লক্ষ্মীর আরাধনা করেন। সাধারণত কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রীতি অনুযায়ী ঢাক, কাঁসর, ঘন্টা বাজানো হয় না। কিন্তু অলক্ষ্মীকে বিদায় করার সময় পুরুষেরা ঢাক, কাঁসর, ঘন্টা ইত্যাদি বাজিয়ে থাকেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


দীপাবলি এমনিতেই আলোর উৎসব। এই আলোয় যাতে মনের সব অন্ধকার দূরীভূত হয় তার জন্যেই অলক্ষ্মীকে দূর করে লক্ষ্মীকে ঘরে অধিষ্ঠান দেওয়া হয়। নিজের মনের অন্ধকারই আসলে অলক্ষ্মী, তাকে দমিত করে শুভবোধের জাগরণ ঘটান লক্ষ্মী। সংসারে-সমাজে-রাষ্ট্রে নেমে আসে সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের ছায়া।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নাটাই চণ্ডী ব্রত নিয়ে বিস্তারিত জানতে



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও