ধর্ম

ভূত চতুর্দশী

ভূত চতুর্দশী

বাঙালি হিন্দুদের কাছে প্রতি বছর আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষে অনুষ্ঠিত দীপাবলি উৎসবটি আলোর জোয়ার নিয়ে আসে। মনের সব অন্ধকার দূর করে দেবী কালীর পূজায় মেতে ওঠে বাঙালিরা। সঙ্গে থাকে আতসবাজি পোড়ানো আর নানাবিধ লৌকিক আচার। তবে কালীপূজার ঠিক আগের দিন আপামর সকল বাঙালি হিন্দু পালন করে থাকেন ভূত চতুর্দশী। পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই বাংলাদেশেও হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে ভূত চতুর্দশী পালনের রীতি রয়েছে। পশ্চিমি দুনিয়ার হ্যালোউইন উৎসবের জনপ্রিয়তা বেশি হলেও বাঙালির একেবারে নিজস্ব সংস্কৃতির এই উৎসব হ্যালোউইনের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, তাৎপর্যে ও মাহাত্ম্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

পাঁচ দিন ধরে চলা দীপাবলির দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে ভূত চতুর্দশী পালিত হয়। দ্বীপান্বিতা কালীপূজার আগের দিনেই এই উৎসবটি পালন করা হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

ভূত চতুর্দশীর উৎপত্তি হল কীভাবে তা নিয়ে একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে। বিষ্ণু পুরাণে বলা আছে, দানবরাজা বলি ছিলেন স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর। তাঁর একটি বিষয়ে খুবই অহংকার ছিল যে তিনি বড়োই দানবীর। তাঁর মতো দানবীর ব্রহ্মাণ্ডে আর নেই বলেই বিশ্বাস করতেন বলি। দেবতাদের প্রচণ্ড উত্যক্ত করে তুলেছিলেন এই দানবরাজ বলি। এর সমাধানের উদ্দেশ্যে দেবতারা ঠিক করেন বিষ্ণু বামন রূপে তাঁর কাছে পা রাখার জন্য মাত্র তিন পা জমি ভিক্ষা চাইতে যাবেন। দেবগুরু বৃহস্পতির পরামর্শে এইভাবে বিষ্ণু ছদ্মবেশে ভিক্ষা চাইতে গেলে বলি কোনোভাবে বুঝতে পেরে যান। কিন্তু বিষ্ণুকে তিনি এই ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝতে দেননি। বিষ্ণুর কথামতো বলি রাজি হলেন তিন পা জমি ভিক্ষা দিতে। আর এই সুযোগে বামনরূপী বিষ্ণু তাঁর একটি পা রাখেন স্বর্গে, একটি পা রাখেন মর্ত্যে। তাঁর নাভির মধ্য থেকে আরেকটি পা উৎপন্ন হলে রাজা বলির মাথায় সেই পা রাখেন বিষ্ণু। এর ফলে দানবরাজ বলি পাতালে চলে যান। এই ঘটনা যে ঘটবে তা জেনেও দৈত্যরাজ বলি বিষ্ণুকে জমি দিয়েছিলেন বলে বিষ্ণু বলিরাজকে নরকাসুর রূপে পুজোর প্রচলন করেন মর্ত্যে। কথিত আছে, ভূত চতুর্দশীর দিন বলি নরকাসুর রূপে তাঁর ভূত-প্রেত সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে মর্ত্যে পুজো নিতে আসেন। আর সেই সব ভূতদের দূরে রাখার জন্যেই ভূত চতুর্দশীর দিনে জ্বালানো হয় ১৪টি প্রদীপ। গৃহস্থরা ঘরের ১৪টি কোনায় এই প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করে রাখেন বাড়ি। তবে অনেকে বিশ্বাস করেন এই দিনে মৃত পূর্বপুরুষের আত্মা নেমে আসে মর্ত্যধামে। তাঁদের সন্তুষ্ট করতেই প্রদীপ জ্বালানো হয়। যাতে অতৃপ্ত আত্মারা কোনো অভিশাপ না দেয় তাঁর জন্যেও এই রীতি পালিত হয় হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে।

ভূত চতুর্দশীর দিনটি অনেক স্থানে ‘যম চতুর্দশী’ নামেও পরিচিত। যম চতুর্দশীর সঙ্গে ১৪ জন যমের পৌরাণিক প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে। ধর্মরাজ, মৃত্যু, অন্তক, বৈবস্বত, কাল, সর্বভূতক্ষয়, যম, উড়ুম্বর, দধ্ন, নীন, পরমেষ্ঠী, বৃকোদর, চিত্র ও চিত্রগুপ্ত। পদ্মপুরাণে বলা আছে এই তিথিতে কেউ যদি গঙ্গাস্নান করে, তবে কোনোদিনই তাঁর নরক দর্শন ঘটে না। ভূত চতুর্দশীর সঙ্গে ‘পঞ্চভূত’ তত্ত্বের খানিক অনুষঙ্গ জুড়ে আছে। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে রয়েছে যে, মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মা এই ব্রহ্মাণ্ডের পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। পঞ্চভূত হল – ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। অর্থাৎ বায়ু, জল, আগুন, আকাশ এবং মাটি।

তাছাড়া এই দিন বাঙালিদের মধ্যে চোদ্দো রকম শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে। ওল, কেও, বেতো কালকাসুন্দা, নিম, সরিষা, শালিঞ্চা বা শাঞ্চে, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পটুক পত্র বা পলতা, ভন্টাকি(ঘেঁটু) বা ভাঁট , হিলমোচিকা বা হিঞ্চে, সুনিষন্নক বা শুষুনী বা শুষনি, শেলু বা শুলকা ইত্যাদি শাক থাকে এই চোদ্দো শাকের মধ্যে। বাংলার নব্য-স্মৃতিশাস্ত্রকার রঘুনন্দন তাঁর অষ্টবিংশতি তত্ত্বের অন্যতম গ্রন্থ “কৃত্যতত্ত্বে” এই শাকগুলির নাম উল্লেখ করেছেন –

ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।
শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,
প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।

তবে আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে, প্রাচীন বাংলায় চোদ্দো রকম শাক ছিল পালং, লাল, শুশনি, পাট, ধনে, পুঁই, কুমড়ো, গিমে, মূলো, কলমি, সরষে, নটে, মেথি, লাউ অথবা হিঞ্চে। পুরাণের কাহিনী অনুসারে ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি প্রচলন করেন ঋক্ বেদের বাস্কল বা শাকদ্বীপি ব্রাহ্মণরা। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী আমাদের পূর্বতন চোদ্দো পুরুষ জল, মাটি, বাতাস, অগ্নি ইত্যাদির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে থাকেন। মূলত সেই কারণেই মাটিতে জন্মানো চোদ্দোটি বিশেষ শাক খেয়ে এই দিনটি তাঁদের জন্য উৎসর্গ করা হয়।

তবে এই রীতি বা আচারের মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। দীপাবলির এই মাসটায় ঋতু পরিবর্তনের ফলে নানা রোগের প্রকোপ বাড়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই জন্য আশ্বিন ও কার্তিক মাস দুটিকে ‘যমদংস্টা কাল’ বলা হতো। চোদ্দো রকম শাকের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা ছিল দারুণ। হয়তো বাঙালিকে এই শাকের গুণাগুণ অন্য কোনোভাবে বোঝাতে না পেরে ধর্মের পালনীয় কর্তব্যের মোড়কের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা থেকেই এই রীতির শুরু। রামায়ণের কাহিনী থেকে জানা যায়, ভূত চতুর্দশীর দিনেই রামচন্দ্র চোদো বছরের বনবাস পর্ব সমাপ্ত করে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। তাঁর অভ্যর্থনা করতে সমগ্র অযোধ্যাবাসী এই দিনে প্রদীপ জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট আলোকিত করে তুলেছিলেন। মনে করা হয়, এই অনুষঙ্গ থেকেই ভূত চতুর্দশীর দিনে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর রীতি শুরু হয়েছে।

১৪ প্রদীপ জ্বালানো আর ১৪ রকম শাক খাওয়ার মাধ্যমেই বাঙালিরা এই দিনটি পালন করে থাকেন। বাংলাদেশের ফরিদপুর অঞ্চলে এই দিনে পালিত হয় ‘চৌর চতুর্দশী’। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে কিছু না কিছু চুরি করার রীতি রয়েছে বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে। অনেক সময় দেখা গেছে, মালদা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের কিছু কিছু অংশে এই বিশেষ দিনে মানুষ ভূত উৎসব পালন করে থাকেন। অনেক জায়গায় আবার পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে জল, মিষ্টি ও বাতাসা অর্পণ করা হয় এবং অনেকে মনে করেন তাঁর পূর্বপুরুষরা যাতে সঠিকভাবে ফিরে যেতে পারে সেই জন্য প্রদীপ জ্বালিয়ে বংশধরেরা পথ আলোকিত করে তোলেন। তবে দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ইত্যাদি জায়গায় ভূত চতুর্দশীর দিনটি পালিত হয় ‘নরক চতুর্দশী’ হিসেবে। এর সঙ্গেও জুড়ে আছে নরকাসুর বধের এক বিশেষ পৌরাণিক আখ্যান।

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: দীপাবলি | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিপত্তারিনী ব্রত নিয়ে জানতে


বিপত্তারিণী

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন বাংলার রূপকার। তাঁর কিংবদন্তী নিয়ে


বিধান চন্দ্র রায়

বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন