বিবিধ

টেরা প্রেটা (পৃথিবীর উর্বরতম সার)

টেরা প্রেটা (Terra preta) ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় পাওয়া একধরনের কালো জৈব সার যার মিশ্রণে মাটির উর্বরতা অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি পায়। এই টেরা প্রেটার  স্থানীয় নাম- ‘টেরা প্রেটা দে ইন্দিও’ (Terra Preta de Indio)। টেরা প্রেটা একটি পর্তুগীজ শব্দ যার অর্থ ‘কালো পৃথিবী’। ব্রাজিলের আমাজন অববাহিকায় চাষের কাজে এই বিশেষ ধরনের মাটি বহুদিন ধরে ব্যবহার করে আসছে চাষিরা।

১৯৬০-এর দশকে আমাজন, রিও নেগ্রো এবং মাদেইরা নদীর সংযোগস্থলে প্রাচীন  আদিবাসী সভ্যতার অবশেষ আবিষ্কার হল। বিজ্ঞানীরা প্রাচীন এই বিশাল জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের অন্ন সংস্থান করেছিল সে সম্পর্কে ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন এই টেরা প্রেটা। নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, প্রায় ৮০০০-৯০০০ বছর আগে থেকে এই সারের ব্যবহার শুরু হয়। এই সার মিশ্রিত মাটিতে সাধারণ মাটির তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশী দ্রুত ফলন হয়।

বিজ্ঞানীরা এই মাটির অবিশ্বাস্য উর্বর ক্ষমতার গোপন রহস্য উদঘাটন করার জন্য মাটি পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখতে পেলেন এই মাটিতে প্রাচীন মৃৎশিল্পের অংশবিশেষ, হাড়, মুরগির ছাঁট, মানুষের মল, কাঠকয়লা, ছাই এবং মাছের হাড় মাটিতে মিশে আছে। এই বিভিন্ন ধরণের জৈব বর্জ্য  ধীরে ধীরে মাটির শক্তিশালী হিউমাস স্তর তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা জৈব পদার্থের এই সংমিশ্রনকে জৈব কয়লা বা বায়োচার (BIOCHAR) নাম দিলেন। বায়োচারের উর্বরতা বৃদ্ধির বৈশিষ্ট্যগুলি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সামনে আনতে হলে বায়োচারকে প্রথমে বিভিন্ন পুষ্টি সরবরাহকারী উপাদানের মাধ্যমে জৈবিকভাবে সক্রিয় করতে হয়। বায়োচার সক্রিয়করণের জন্য বায়োচারের সাথে সার মেশানোর পাশাপাশি আরও অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে। বায়োচার তৈরির সময় প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয় যা রান্না বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা বায়োচার মাটিতে প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। জমিতে বায়োচার ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় ফলে খরা প্রবণ এলাকায় চাষ করা সহজ হয়। বায়োচার জমিতে ভারী ও বিষাক্ত ধাতুকে নিষ্ক্রিয় করে রাখে যার ফলে উদ্ভিদের শিকড়ের সাহায্যে তা ফসল পর্যন্ত পৌঁছায় না এবং নিরাপদ ও বিষাক্ত ধাতু মুক্ত ফসল পাওয়া যায়।

টেরা প্রেটার গুণ সীমাবদ্ধ কেবল তার ফলন ক্ষমতাতেই নয় তার আরও অনেক গুণ আছে  যেমন- ১) এই সার বাতাস থেকে নাইট্রোজেন মাটিতে ধরে রাখতে পারে। ২) এর উর্বরতা বহু বহু দিন অবধি অবিকৃত থাকে। শয়ে শয়ে বছর ধরে টেরা প্রেটা সারের গুণ ধরে রাখার ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের গ্রিনহাউস গ্যাস ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করে তুলেছে। তাঁদের মতে কাঠকয়লা যদি দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ অবস্থায় অবিকৃত থাকতে পারে, তাহলে এই পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগে পৃথিবীতে আরও বেশি কার্বন আটকে রাখা যেতে পারে। বায়োমাস (উদ্ভিদ ও জীবজন্তুর অবশেষ)কে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে উত্তপ্ত করে চারকোলে পরিণত করে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ আটকে পৃথিবীর উষ্ণ হওয়া অনেকটাই আটকানো যেতে পারে।  বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, এই ‘জৈব কয়লা’ প্রতি বছর বাতাস থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশো থেকে সাড়ে নয়শো কোটি টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলতে পারে অনায়াসেই।

বর্তমানে বাংলাদেশে কমোডের বর্জ্যের সাথে বায়োচার মিশিয়ে টেরা প্রেটা তৈরি শুরু হয়েছে। টেরা প্রেটার বিশেষত্ব কেবলমাত্র বায়োচার হিসেবে তার ব্যবহারেই নয় এতে আবদ্ধ পুষ্টিচক্রের গুরুত্বও একে সমান উপযোগী করে তুলেছে। কেবলমাত্র জমে থাকা সমস্ত বর্জ্য পদার্থের সচেতন পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যথায় পুষ্টিকর দরিদ্র গ্রীষ্মমন্ডলীয় মাটি বর্তমান বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস বা জাপানের চেয়ে বেশি জনসংখ্যার ঘনত্বের অনুমতি দিতে পারে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন