রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা

রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা

ভারতের ইতিহাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিসরকে প্রশস্ত করেছিল রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা (Raj Narain Vs. the State of Uttar Pradesh Case)। এই মামলা প্রথম বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছিল। বিচার বিভাগ কীভাবে সংসদীয় রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হয় তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল এই মামলা। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, আদালতের ক্ষমতা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অধিকার, শাসন ইত্যাদি নানা বিষয়কে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা। এই মামলার ফলেই ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন বাতিল করা হয়। জরুরি অবস্থা চলাকালীনই এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি করে সুপ্রিম কোর্ট, ঐ সময় সকল প্রকার মৌলিক অধিকার খর্ব থাকার কারণে মামলাটির কোনও গণশুনানি হয়নি। এমনকি এ নিয়ে সেভাবে কোনও প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়নি।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা শুরু হয়। পরে তা সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তরিত হয়। সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার বিচারক বেঞ্চে উপস্থিত ছিলেন এ. এন. ম্যাথিউ, কুট্টিল কুরিয়েন আলাগিরিস্বামী, এ. সারকারিয়া, রঞ্জিৎ সিং উন্টওয়ালিয়া প্রমুখ। ১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট।

১৯৭১ সালে ভারতে পঞ্চম লোকসভার সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ইন্দিরা গান্ধী নিজের এবং তাঁর দলের জন্য ব্যাপক প্রচার চালান। সেই নির্বাচনেই ইন্দিরা গান্ধী ৫১৮টি আসনের মধ্যে ৩৫২টি আসন পেয়ে কংগ্রেসকে বিজয়ী প্রতিপন্ন করেন। রায়বেরিলির নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর বিপক্ষে প্রার্থী ছিলেন রাম মনোহর লোহিয়া প্রতিষ্ঠিত এসএসপি (SSP) দলের নেতা রাজনারায়ণ। নির্বাচনে বিজয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রাজনারায়ণ। এতটাই তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল যে, নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই তিনি একটি বিজয়-সমাবেশ আয়োজন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে হেরে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন রাজনারায়ণ। কিন্তু এই পরাজয় তিনি মেনে নেননি, বরং নির্বাচনী প্রচারের সময় ইন্দিরা গান্ধীর দুর্নীতি করার প্রস্তাব এনে সেই নির্বাচন বাতিল করার আবেদন জানান রাজনারায়ণ। ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে তিনি একটি লিখিত অভিযোগপত্র দায়ের করে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ জানান। রাজনারায়ণ ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে নিযুক্ত নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন। সরকারি কর্মকর্তা, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী সকলেই তাঁর প্রচারে সহায়তা করেছিল। এমনকি রাজনারায়ণ অভিযোগ করেন যে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর নির্বাচনী প্রচারের জন্য সরকারের গাড়ি ব্যবহার করেছিলেন এবং ভোটারদের মধ্যে মদ ও কম্বল বিতরণ করেছিলেন। এর মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলেই রাজনারায়ণের অভিযোগ ছিল, এমনকি তিনি এও দেখান যে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনের প্রচারের খরচ সেবারে ভারতীয় মুদ্রায় ৩৫ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এর ফলে এলাহাবাদ উচ্চ আদালত ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে এবং ইন্দিরা গান্ধী স্বয়ং তখন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। সুপ্রিম কোর্ট সেই সময় ছুটিতে থাকায় ইন্দিরাকে শর্তসাপেক্ষে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ৩৯তম সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করেন যার ফলে ভারতের সংবিধানে ৩৯২ এ ধারা যুক্ত হয়। এই ধারায় বলা হয় যে প্রধানমন্ত্রী এবং লোকসভার অধ্যক্ষের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনও আইনি আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না, কেবলমাত্র সংসদ দ্বারা গঠিত কমিটির সামনেই এই বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। এভাবে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচন বাতিলের মামলার সিদ্ধান্ত নিতে সুপ্রিম কোর্টকে বাধা দেন। এর কারণে এই সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কেশবানন্দ ভারতী মামলার সময়ে ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রাখার কথা বলা হয়েছিল। আর এই মৌলিক কাঠামো অনুযায়ী সংসদ শুধুমাত্র একটি শর্তে সংবিধানের বহুল সংশোধন করতে পারে আর সেই শর্তটি হল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বিঘ্নিত করা যাবে না এবং সংবিধানের সংশোধনীগুলি কোনওভাবেই মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী হবে না। সংবিধানের সেই মৌলিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে –

  • সংবিধানের আধিপত্য এবং প্রাধান্য
  • সরকারের প্রজাতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক চরিত্র
  • সংবিধানের সার্বভৌম চরিত্র
  • ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
  • ব্যক্তি স্বাধীনতা
  • ভারতের ঐক্য এবং সার্বভৌমত্ব

সংবিধানের ৩৬৮ নং ধারা অনুসারে সংসদের হাতে সংবিধান সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া আছে। ৩৯তম সাংবিধানিক সংশোধনী যখন পাস হয়, সেই সময় সংসদের বেশ কয়েকজন সদস্য অনুপস্থিত ছিলেন কারণ তাদের বিরোধিতাজনিত কারণে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ৩৬৮ নং ধারায় কখনই সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে কোনও বিতর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয় না সংসদকে। রাজনারায়ণ দাবি করেন যে অনেক বিরোধী পক্ষের নেতাকে আটক করে রাখার কারণে সংসদীয় কার্যক্রমে ভোট দিতে পারেননি তাঁরা। তাই ৩৯তম সংশোধনী পাস হওয়ার সময় তাঁদের মতামত না নেওয়ায় এই আইনটি বাতিল হওয়া আশু প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট মনে করেছে যে এই বিষয়টি সংসদের উভয়কক্ষের মধ্যে সম্পর্কিত এবং আদালত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এখন ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল সঙ্গত কিনা সেই বিচারে সুপ্রিম কোর্ট তথ্য প্রমাণ খতিয়ে দেখে জানতে পারে যে ১৯৭৫ সালের জনপ্রতিনিধি আইনের ১২৩ নং ধারা অনুসারে ১৯৭১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইন্দিরা গান্ধী নিজের মনোনয়নপত্র জমা করেছিলেন, ফলে তার আগে তিনি যদি সরকারি পুলিশি সহায়তা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধে নিয়ে থাকেন তা কোনওভাবেই দণ্ডনীয় নয়। কিন্তু রাজনারায়ণ বলেন যে সরকারি অফিসার হওয়া সত্ত্বেও যশপাল কাপুর তাঁর কার্যকালের মধ্যেই ১৯৭১ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর সপক্ষে বহু বক্তব্য রেখেছেন। অথচ আদালত এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ পায়নি। অন্যদিকে ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধি আইনের ৭৭ নং ধারা অনুসারে সুপ্রিম কোর্ট প্রমাণ করে কোনও রাজনৈতিক দল তার প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে যে অর্থ খরচ করে, তা কোনওভাবেই নির্বাচন প্রক্রিয়ার খরচের অন্তর্গত নয়।

এতসব প্রমাণাদি তথ্য বিচার করে ১৯৭৬ সালের ৭ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৫ সালের ৩৯তম সংশোধনীকে অসাংবিধানিক প্রমাণ করে। এলাহাবাদ উচ্চ আদালতের মতের সপক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ থেকে সরিয়ে আনা হয় এবং তাঁর নির্বাচনকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের জনস্বার্থ মামলা বিভাগের বিখ্যাত আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের লেখা ‘দ্য কেস দ্যাট শুক ইন্ডিয়া’ বইটি থেকে রাজনারায়ণ বনাম উত্তরপ্রদেশ মামলা সম্পর্কে আরো বিশদে তথ্য পাওয়া যায়।

আপনার মতামত জানান