বিজ্ঞান

মহামারী ও অতিমারী

মানুষ হোক বা অন্য জীব, রোগ ভোগ লেগেই রয়েছে তাদের। কখনও কখনও এমনও হয়েছে যে গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর কোন রোগের প্রভাবে শেষ হয়ে গেছে। তখন আমরা বলেছি এটা মহামারী বা অতিমারীর প্রকোপ। খুব কম সময়ের মধ্যে কোন রোগ যখন বিপুল সংখ্যক লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে বলে মহামারী। আর রোগ যখন সারা দেশজুড়ে বা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে বলে অতিমারী। ২০২০ সালে করোনা যখন চীনের সীমানা অতিক্রম করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল, তখন তা অতিমারীর রূপ নিল।

সাধারণত কোনও অঞ্চলে যদি হঠাৎ কোন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং প্রচণ্ড দ্রুতগতিতে তা ছড়িয়ে পড়ে, সেই রোগকে তখন মহামারী ঘোষণা করা হয়। অথবা কোন অঞ্চলে কোন রোগ প্রত্যাশিত সীমার উর্ধ্বে ছড়াতে থাকলেও তা মহামারীর পর্যায়ে পড়ে। প্রত্যাশিত সীমা এই কারণেই বলা হচ্ছে, কারণ কোন অঞ্চলে একটি রোগ অনেকদিন ধরেই থাকতে পারে। কিন্তু কোন কারণে হঠাৎ সেটা এতটাই বেড়ে গেল যে সেটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল, তখন তাকে মহামারী হিসাবে ঘোষণা করা হয়। আবার এই মহামারীই যখন দেশজুড়ে শুরু হয়ে যায়, অথবা দেশের কাঁটাতার, আন্তর্জাতিক সীমারেখা পেরিয়ে ঢুকে পড়ে অন্যদেশে, তখন সেই মহামারীকে নাম দেওয়া হয় অতিমারী। তবে শুধু বিভিন্ন দেশজুড়ে প্রচুর মানুষ কোন একটি বিশেষ রোগে মারা যাচ্ছে বলেই তাকে অতিমারী হিসাবে ঘোষণা করা হয় না, যদি না সেই রোগ ছোঁয়াচে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ক্যান্সার সারা বিশ্বজুড়েই প্রচুর মৃত্যুর জন্য দায়ী তবে এটি কিন্তু অতিমারী হিসাবে বিবেচিত হয় না কারণ এই রোগ ছোঁয়াচে নয়।

বিশ্বে বিভিন্ন সময়ের কয়েকটি মহামারী-অতিমারীর বিষয়ে এক নজরে দেখে নেওয়া যাক

এথেন্সের প্লেগ
খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ সালে এথেন্স এবং স্পার্টার যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই এই মহামারী এথেন্সের মানুষকে বিধ্বস্ত করেছিল এবং সেটা প্রায় পাঁচ বছর ধরে ছিল।বলা হয়ে থাকে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের ছুঁয়েছিল।

জাস্টিনিয়ানের প্লেগ
৫৪০-৫৪১ সালের দিকে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট জাস্টিনিয়ানের শাসনকালে ভয়াবহ প্লেগের সংক্রমণ হয়েছিল। বলা হয় বাইজান্টাইনের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলেই নাকি প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার মানুষ মারা যেত। প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ গিয়েছিল এই রোগে।

কুষ্ঠ
কুষ্ঠরোগের অস্তিত্ব অনেক আগে থেকেই ছিল এবং এই রোগ নিয়ে বিভিন্ন কুসংস্কারও ছিল। কিন্তু মধ্যযুগে ইউরোপে এই রোগ অতিমারী হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সময়েও প্রচুর মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও ওষুধের আবিষ্কার যেহেতু আগের মত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না, তাই এটা এখন আর মহামারী নয়।

কালো মড়ক
এই অতিমারী একসময় সারা পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানোয় এক বিশাল ভূমিকা রেখে গেছিল। ১৩৪৬-১৩৫৩ সালের মধ্যে ইউরোপ এবং এশিয়া মহাদেশের জনসংখ্যার সাড়ে সাত কোটি থেকে ২০ কোটি মানুষ এই রোগে মারা গেছিল। মধ্য এশিয়াতে উৎপত্তি হয়ে বণিকদের জাহাজে বাস করা কালো ইঁদুর’ ও র‍্যাট ফ্ল্যাই (একপ্রকারের মাছি)-এর মাধ্যমে এটি ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে।

লন্ডনের প্লেগ
১৬৬৫ সালে লন্ডনে এই রোগ দেখা গিয়েছিল। লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি এই রোগে মারা যায়। প্রাথমিকভাবে রোগের উৎস হিসেবে কুকুর-বিড়ালের কথা ভাবা হলেও র‍্যাট ফ্ল্যাই (একপ্রকারের মাছি)-এর মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়েছিল বলে জানা যায়।

প্রথমবারের কলেরা
কলেরা রোগ সারা পৃথিবী জুড়ে বহুবার হয়েছে। প্রথমবার ১৮১৭ সালে এই রোগ রাশিয়ায় শুরু হয়েছিল। সেখানে এই রোগে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পরে ব্রিটিশ সেনাদের মাধ্যমে ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। ভারতেও সেই সময় প্রচুর লোকের মৃত্যু হয়।

তৃতীয়বারের প্লেগ
১৮৫৫ সালে চীন থেকে এর সূত্রপাত হয়েছিল। পরে তা ভারত ও হংকং-এ ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই মহামারির শিকার হয়েছিল।

তৃতীয়বারের কলেরা
সাতটি কলেরা মহামারীর মধ্যে তৃতীয়বারের কলেরাকে সবচেয়ে মারাত্মক বলা হয়।১৮৫২ সাল থেকে শুরু করে ১৮৬০ অবধি এর প্রকোপে প্রচুর মানুষ মারা যায়।

স্প্যানিশ ফ্লু: ১৯১৮ সাল
১৯১৮ সালে এই ফ্লু উত্তর আমেরিকায় শুরু হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। যখন এই রোগ স্পেনে এসে মহামারীর আকার নেয়, তখন এর নাম হয় ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে এই রোগের প্রকোপ কমে আসে। সারা বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা বলা হয় ৫ কোটি।

এশিয়ান ফ্লু
১৯৫৭ সালে এই রোগ হংকং থেকে শুরু হয়ে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা ছয় মাসের মধ্যে আমেরিকা হয়ে যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়ায়।

এইডস
১৯৮১ সালে এইডস প্রথমবার শনাক্ত করা হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা ১৯২০ সাল নাগাদ পশ্চিম আফ্রিকায় এই ভাইরাসের উদ্ভব ঘটেছিল। এখনও পর্যন্ত এইডসে বিশ্বব্যাপী সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সোয়াইন ফ্লু
২০০৯ সালে মেক্সিকোতে এই রোগ দেখা দেয় এবং পরে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এক বছরেই এই রোগে সারা বিশ্ব জুড়ে প্রায় দেড় থেকে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

ইবোলা
এই রোগ ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং মহামারীর আকার নেয়। বলা হয় বাদুড় নিজে এই রোগে আক্রান্ত না হয়ে এই রোগ ছড়ায়।

করোনা
২০২০ সালের ১১ মার্চ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগটিকে অতিমারী হিসাবে ঘোষণা করে। চীন থেকে শুরু করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ১১৪ টি দেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।