যে কোন একজন বাঙালিকে জিজ্ঞাসা করুন – আচ্ছা রাধানাথ শিকদার (Radhanath Sikdar) কে ছিলেন বলুন তো? নির্দ্বিধায় ঐ মানুষটি উত্তর দেবেন – রাধানাথ শিকদার একজন ভারতীয় জরিপবিদ যিনি এভারেস্ট এর উচ্চতা মেপেছিলেন। ব্যস, এইটুকুই তাঁর সম্বন্ধে আমরা, মানে বাঙালিরা জানি। এর বাইরে মানুষটি নিজেও কখনও বের হতে পারেননি আর আমাদেরও কখনও আবিষ্কার করতে ইচ্ছা হয়নি এই বিদগ্ধ মানুষটিকে। বাঙালি কখনও জানার চেষ্টা করেনি কত বিচিত্র ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ডিরোজিওর (Derozio)অন্যতম প্রিয় এই ছাত্রটি । সেই সময়ের সেরা অঙ্কবিদ হওয়া সত্বেও বাঙালি তাঁকে চেনে শুধু মাউন্ট এভারেস্ট এর আবিষ্কর্তা হিসাবেই। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি অঙ্ক কষে বলে দিয়েছিলেন এভারেস্ট নাকি ২৯,০০০ ফুট উঁচু । ভুলটা আমাদের এখানেই হয়। এর বাইরেও আর কত কী যে জানতেন রাধানাথ শিকদার আমরা বাঙালিরা কেউ কখনও তার খোঁজ রাখার চেষ্টা করিনি, দেখাইনি বিন্দুমাত্র আগ্রহ । আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তাঁর জীবন সম্পর্কে বেশি কিছু জানাও যায় না। যেমন জানা যায় না, কীভাবে তিনি মারা যান, কোন জায়গায় মারা যান, ঠিক কত তারিখে মারা যান ইত্যাদি। আসল ব্যাপারটা হল, রাধানাথ শিকদারের গোটা জীবনটার পরতে পরতে রহস্যের আবরণ।
সাম্প্রতিক পোস্ট
রাধানাথ শিকদারের ১৮১৩ সালের ৫ অক্টোবর কলকাতার জোড়াসাঁকোয় জন্ম হয়। বাবা তিতুরাম শিকদার ছিলেন একজন সৎ, উচ্চশিক্ষিত মানুষ। মাও ছিলেন একজন আদর্শ সহধর্মিণী। রাধানাথের দুই ভাই ও তিন বোন ছিল । রাধানাথ ছিলেন সবার বড়ো। রাধানাথ প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন বাড়িতেই ,পণ্ডিত মশায়ের কাছে । প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হলে রাধানাথ ভর্তি হন চিৎপুরের ফিরিঙ্গি কমল বসুর বিদ্যালয়ে। ১৮২৪ সালে রাধানাথ হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্তি হন। হিন্দু কলেজে পড়ার সময় তিনি প্যারীচাঁদ মিত্র, হরচন্দ্র ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়দের প্রমুখের সাহচর্যে আসেন এবং যাঁদের অনেকের সঙ্গেই রাধানাথের আজীবন বন্ধুত্ব বজায় ছিল।
এই হিন্দু কলেজে পড়ার সময় তিনি ডিরোজিওর ভাবধারায় প্রভাবিত হন তিনি। কলেজের গণিতের অধ্যাপক ছিলেন ডক্টর টাইলার (John Tyler)। খুব অল্প সময়ের মধ্যে টাইলার-এর বিশেষ নজরে পড়ে যান রাধানাথ। টাইলার জানতেন ইতিমধ্যে এই অল্প বয়সেই রাধানাথ নিউটন এর Principia পড়ে ফেলেছেন। পড়ে ফেলেছেন উক্লিডয়ের (Euclid)উপাদান, Analytical Geometry ও Astronomy। রাধানাথ এগিয়ে যাচ্ছেন উচ্চগণিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন করার দিকে। ১৮৩০ সালে কলেজের শেষ পরীক্ষায় দেখা গেল, সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন রাধানাথ শিকদার নামের ছাত্রটি।
রাধানাথ এর কর্মজীবন বেশ ভাল ভাবেই শুরু হয়। গণিতের অধ্যাপক জন টাইলার (John Tyller) রাধানাথের অসামান্য প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলেন । তিনি রাধানাথের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন জর্জ এভারেস্ট (George Everst)এর। ১৮৩১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এভারেস্ট সাহেব ট্রিগোনোমেট্রিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (Trigonometrical Survey of India) প্রোজেক্টের কাজে নিয়োগ করলেন রাধানাথকে। অসামান্য কর্মদক্ষতার জন্য পরিচিত বৃত্তে নতুন নাম পেয়ে গেলেন রাধানাথ ‘chief computer’। কিছুদিনের মধ্যে অবসর নিলেন এভারেস্ট সাহেব। তাঁর জায়গায় এলেন আন্দ্রেও স্কট ওয়াহ (Andrew Scott Waugh)। শুধু জরিপ বিভাগের একজন কর্মকর্তাই ছিলেন না, এই ব্রিটিশ ভদ্রলোকই ১৮৫২ সালের এপ্রিল মাসে তথাকথিত অজানা মেঘের চাদরে ঢেকে থাকা P15 নামের হিমালয় শৃঙ্গটির নামকরণ করে দিলেন ‘মাউন্ট এভারেস্ট’।
হিমালয় রেঞ্জ এর ম্যাপ তৈরি করার জন্য রাধানাথকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শীর্ষস্থানীয় একজন জরিপ কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ করে। যে জরিপ দলের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন সেই দলটি ছিল তৎকালীন সময়ের সেরা জরিপ দল। এই সময় হিমালয়ের একটি অজানা শৃঙ্গ ছিল যার নাম ছিল ‘Peak XV’ । এই শৃঙ্গকে মাপার কাজে রাধানাথ জিওডিসি (Geodesy) (ভুবিবিদ্যায় ব্যবহৃত গণিত) পদ্ধতিতে দেখালেন তাঁর স্বকীয়তা। এরপর রাধানাথ সিকদারের হাতে ন্যস্ত হল পর্বতের উচ্চতা মাপার দায়িত্ব। রাধানাথ শুধু থিওডোলাইট (Theodolite) যন্ত্র ব্যবহার করে, আর অঙ্কের সহাযতা নিয়ে ৬টি বিভিন্ন প্রান্ত যেমন মিরজাপুর, জারল, জাহাজিপাতি, লান্দানিয়া, হারিপুর এবং মিনাই থেকে জরিপের কাজ শুরু করলেন। ৪ বছর কেটে গেল। ১৮৫২ সালে কর্নেল ওয়াকে রাধানাথ জানালেন তিনি পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ আবিষ্কার করে ফেলেছেন। বললেন P15 ২৯,০০০ ফুট উঁচু । কর্নেল ওয়ার আরও চার বছর লাগল শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে। শেষমেশ তিনি জানালেন রাধানাথ ভুল করেছেন। P15-এর আসল উচ্চতা হল ২৯,০০২ ফুট। ১৮৫৬ সালে নতুন আবিষ্কৃত শৃঙ্গের নাম রাখা হল মাউন্ট এভারেস্ট (Mount Everest)। আসল ব্যাপারটি হল আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে থাক একজন ভারতীয়ের নাম, এটা কোনদিনই চাইতেন না ব্রিটিশ কর্মকর্তারা। তাই রাধানাথের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমই বা হবে কেন? কৃতিত্ব সোজা চলে গেল জর্জ এভারেস্ট (George Everest) এর ঝুলিতে। এভারেস্ট ছিলেন ভারতের একজন প্রাক্তন সার্ভেয়ার-জেনারেল। অধ্যাপক টাইলার এর কথায় রাধানাথকে চাকরির সুযোগ তিনি করে দিয়েছিলেন বটে কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গের উচ্চতা গণনার সাথে তিনি কোনভাবেই যুক্ত ছিলেন না। সাম্রাজ্যবাদী কুচক্রী ব্রিটিশ সরকার একরকম জোর করেই এক সুযোগ্য ভারতীয় বিজ্ঞানীকে জেনেবুঝে ঠকাল। আর এর জন্য দায়ী হলেন ওয়াহ সাহেব।
রেডিও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে জগদীশচন্দ্র বসুর ইতিহাসটিও তো আমরা দেখেছি। রেডিও আবিষ্কারের সঙ্গে তাঁর নাম কি যুক্ত হয়েছিল কখনও? হয়নি। রাধানাথের ক্ষেত্রেও হল না। যাই হোক, রাধানাথের ক্ষেত্রে একটা নতুন ঘটনা ঘটলো। ব্রিটিশরা স্বীকৃতি দিল না বটে কিন্তু জার্মানরা দিল। বাভারিয়ান সোসাইটি (Bavarian Society) তাঁকে সদস্যপদ দিয়ে স্বীকৃতি জানাল। বিখ্যাত ভারতীয় বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা তাঁর বিখ্যাত বই ‘প্রগ্রেস অফ ফিজিক্স ইন পাস্ট টুয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স”-এ (Progress of Physics in Past Twenty Five Years) লিখলেন রাধানাথের অসামান্য ভূমিকার কথা। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের দেওয়া স্বীকৃতির কথা কেই বা মনে রাখে? ‘ম্যানুয়াল অফ সার্ভেইং ইন্ডিয়া’-র (Manual of Surveying of India) নথিপত্রে প্রথম দিকে রাধানাথের নাম ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! ১৮৭৫ সালের পর থেকে মানুয়ালে রাধানাথের নাম আর খুঁজে পাওয়া গেল না। রাধানাথ অবশ্য এই অপমান হজম করার জন্য তখন আর ইহজগতে ছিলেন না। তত্কালীন সংবাদপত্র ‘ফ্রেন্ড ওফ ইন্ডিয়া’ (Friend of India) লিখল “Penance must be performed for this cowardly sin and robbery of the dead”, এটি আর কিছুই নয় “মৃত দেহের উপর আঘাতের জন্য অনুতাপ করা উচিত”।
১৮৫১ সালে রাধানাথ সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এর ‘চিফ কম্পিউটার’ (Chief Computer} পদ লাভ করেন। একই সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব ছিল আবহাওয়া অফিসের সুপারিন্টেন্ডেন্ট এর পদ সামলানো। বিভাগটিকে আধুনিকভাবে গড়ে তোলেন রাধানাথ। ১৮৫৩ সাল থেকে তিনি দিতে শুরু করেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস।জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এই সময় যে ব্যাপারটির জন্য তিনি খ্যাত ছিলেন, তা হল ‘ব্যারোমিটার রিডিং’ (Barometer Reading)। কীভাবে যথা নিয়মে তাপমাত্রার ওঠানামা নির্ধারণ করা যায়, সেই ব্যাপারটির উপর প্রথম আলোকপাত করেন রাধানাথই।
১৮৬২ সালে জরিপ বিভাগ থেকে অবসর নেন রাধানাথ। যোগ দেন অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশনে (Assemblies Institution) যার বর্তমান নাম স্কটিশচার্চ কলেজ। গণিতের অধ্যাপক হিসাবে এই কলেজে যোগ দেন রাধানাথ। একদিকে অধ্যাপনা, অন্যদিকে চলছে সাহিত্য সাধনা। শুরু করলেন মহিলাদের জন্য বিশেষ পত্রিকার প্রকাশনা। প্যারীচাঁদ মিত্র পাশে ছিলেন। এই পত্রিকার পাতাতেই ছাপা হল ‘আলালের ঘরের দুলাল’। রাধানাথ নারী স্বাধীনতার পক্ষপাতী ছিলেন। বিধবা নারীদের পুনর্বিবাহ, নারী শিক্ষার প্রসার নিয়ে তিনি ভাবতেন। বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহের তিনি সবসময় বিরোধিতা করতেন। গরীব সাধারণ মানুষের উপর সেই সময়ের ইংরেজ শাসকরা যে অমানুষিক নির্যাতন চালাত, রাধানাথ তার ঘোর বিরোধিতা করতেন। এমনও হয়েছে স্পষ্ট কথা বলার জন্য তাঁকে জরিমানা পর্যন্ত দিতে হয়েছে নগদ দুশো টাকা।
জন্মেছিলেন বটে উনবিংশ শতকে, কিন্তু মনে প্রাণে আধুনিক ছিলেন রাধানাথ।কোন ধরনের ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার তাঁর দৃষ্টি আবিল করতে পারেনি। তিনি প্রকৃত অর্থে ছিলেন একজন মুক্তমনা। শোনা যায়, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। বাস করতে শুরু করেন চন্দননগরে। সবটাই কিন্তু ছোঁড়া ছোঁড়া কথা। কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেননি – “হ্যাঁ, তিনি শেষ সময়টা চন্দননগরেই কাটিয়ে ছিলেন “। ১৮৭০ সালের ১৭ মে রাধানাথ শিকদারের মৃত্যু হয় বলে প্রচারিত। কিন্তু কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয় তা কিন্তু এখনও অধরাই থেকে গেছে। এই চন্দননগর বাস নিয়েও রয়েছে অনেক ধোঁয়াশা। রাধানাথ ছিলেন একজন ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মচারী। তিনি থাকলে তো কলকাতাতেই থাকতে পারতেন। চন্দননগরে তাঁর থাকার কি প্রয়োজন পড়ল? চন্দননগর তো সেই সময় ছিল ফরসীদের অধিকারে। আর ফরাসীরা তো ছিল ইংরেজদের প্রবল প্রতিপক্ষ। তাহলে একটু ধন্দ থেকে যাচ্ছে না?
আরো আছে, মেনে নেওয়া গেল রাধানাথ চন্দননগরে মারা যান। তিনি ক্রিশ্চিযান ছিলেন। তাহলে তাঁকে তো কোথাও সমাধি দেওয়া হয়। সেই জায়গাটা কোথায়? সেক্রেড হার্ট চার্চের (Sacred Heart Church) কোথাও নাকি সমাধি আছে রাধানাথ শিকদারের। কিন্তু সেই জায়গাটা আজ পর্যন্ত কেউ চিহ্নিত করতে পারল না। কেন? কেন গির্জার রেকর্ড বইতে রাধানাথ শিকদার এর নাম নেই? যে সমাধিটি রাধানাথের বলে চালানো হয়, সেটি কার? এক জায়গায় লেখা আছে বটে Mount Everest Measured By Radhanath Sikdar। শুধু এইটুকুই। উনবিংশ শতকের খ্যাতনামা ‘কম্পিউটার’ মানুষটির শুধু এইটুকুই প্রাপ্তি?
লেখক : মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হাওড়া জেলার শিবপুরে। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা। বাবার অবসরপ্রাপ্তির পর চলে আসেন পূর্ব বর্ধমান জেলার নিজ গ্ৰামে। সেখানকার বিদ্যালয় থেকে কলা বিভাগে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতক। প্রথমে ক্যালকাটা অবজারভার কাগজে রিপোর্টার এর কাজ, তারপর বিভিন্ন পত্রিকায় অবাধ বিচরণ। গ্রামে ফিরে পশ্চিমবঙ্গ সংবাদ কাগজে কাজ শুরু। পরবর্তীকালে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতকোত্তর, গণমাধ্যমে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। সাংবাদিক জগত থেকে শিক্ষা জগতে প্রবেশ। প্রথমে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউ আই টি, পরে বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা এবং সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ । বর্তমানে অনুবাদ ও কনটেন্ট রাইটিং এর সঙ্গে জড়িত।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান