বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আফ্রিকান-আমেরিকানরা বর্ণগত বিভেদ ও বৈষম্য বর্জনের মাধ্যমে, সমান অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে সমগ্র আমেরিকা জুড়ে যে আন্দোলন শুরু করেন, তা ইতিহাসে নাগরিক অধিকার আন্দোলন (Civil Rights Movement) নামে পরিচিত। এটি আমেরিকার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণআন্দোলন ও প্রভাবশালী সামাজিক আন্দোলন। যদিও বহু শ্বেতাঙ্গ মানুষ এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও দেশের গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অনেক শ্বেতাঙ্গ নাগরিকও কৃষ্ণাঙ্গদের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে আন্দোলনে অংশ নেন। এই আন্দোলনে অহিংস প্রতিবাদ, নাগরিক অভিযান ও আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদী জনতা নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হন।
১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মার্কিন সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে মূলত আফ্রিকান-আমেরিকানরা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সক্রিয় সূচনা করেন। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের শিকড় খুঁজলে দেখা যায়, উনিশ শতকের গোড়া থেকেই এই সংগ্রামের ভিত্তি তৈরি হতে থাকে। ১৮৬১ সালের গৃহযুদ্ধের পর ১৮৬৫ সালে মার্কিন সংবিধানের ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়। আর ১৮৬৮ সালে ১৪তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে আফ্রিকান আমেরিকানদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়, সাথে এও বলা হয় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সকল ব্যক্তি নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সমান আইনি সুরক্ষা পাবে। এরপর আমেরিকার মানুষ বিশেষত দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ দাসত্ব থেকে মুক্তি পায় এবং আফ্রিকান-আমেরিকান পুরুষরা আমেরিকার পুনর্গঠনের সময় ওই অঞ্চলের ভোটদানের অধিকার পায় , এছাড়া তারা ওই সময় নানা রাজনৈতিক পদও লাভ করেছিল। ১৮৭০ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে জাতি বা পূর্ব দাসত্বের ভিত্তিতে ভোটাধিকার খর্ব করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যদিও বাস্তবে দক্ষিণের রাজ্যগুলো নানা কৌশলে এই অধিকার খর্ব করতে থাকে।
তবে ১৮৭৬ সালের পর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়, জিম ক্রো আইনের (Jim Crow Laws) মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা সরকারি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করে। এছাড়া আমেরিকানদের মধ্যে কর্মসংস্থান, আবাসন ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে বিভেদ ও বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে থাকে আর আফ্রিকান-আমেরিকানরা ক্রমশ শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। তাছাড়া ১৮৯৬ সালে প্লেসি বনাম ফার্গুসন (Plessy v. Ferguson) মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘পৃথক কিন্তু সমান’ নীতিকে বৈধতা দেয়, যা বর্ণ বৈষম্যকে আইনত প্রতিষ্ঠিত করে। আবার আমেরিকায় আফ্রিকান-আমেরিকানদের জাতিগত বৈষম্যের ভিত্তিতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থা অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।
আমেরিকার দক্ষিণ অঞ্চলের বাইরের কৃষ্ণাঙ্গদের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেকটা ভাল ছিল। তাই দক্ষিণাঞ্চলের অনেক কৃষ্ণাঙ্গ উন্নত জীবনযাপনের আশায় উত্তর এবং পশ্চিম অঞ্চলে নতুন করে অভিবাসনের চেষ্টা করে, ফলে ওই অঞ্চলগুলিতে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য কমে কৃষ্ণাঙ্গদের আধিপত্য বাড়তে শুরু করলে শ্বেতাঙ্গ মানুষদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। এরপর ১৯৩০ এর দশকে মহামন্দার ফলে অনেক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে চাকরির সন্ধান করতে থাকলে শহরের উপর মানুষের চাপ বৃদ্ধি পায়।
এরপর ১৯৫৪ সালে ব্রাউন বনাম বোর্ড অফ এডুকেশন (Brown v. Board of Education) মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় দেয় যে, আফ্রিকান-আমেরিকান ছাত্রদের জন্য আলাদা স্কুল থাকা স্বাভাবিকভাবে অসম এবং অসাংবিধানিক। এর ফলে দীর্ঘদিনের ‘পৃথক কিন্তু সমান’ নীতি বাতিল হয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। এই রায়ে শ্বেতাঙ্গদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের উপর অত্যাচার বাড়িয়ে তোলে।
১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী রোজা পার্কস (Rosa Parks) আলাবামার মন্টগোমেরির একটি বাসে একজন শ্বেতাঙ্গ যাত্রীকে তাঁর আসন ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর এই গ্রেপ্তারির পর কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা মন্টগোমেরি বাস বয়কট শুরু করে, যা পরবর্তীকালে সংগঠিতভাবে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সূচনা করে। এছাড়া এই বাস বয়কটের মাধ্যমে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র-এরও (Martin Luther King Jr.) খ্যাতি বৃদ্ধি পায়।
১৯৬৩ সালে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে বার্মিংহামে সাউদার্ন খ্রিস্টান লিডারশিপ কনফারেন্সে (Southern Christian Leadership Conference বা SCLC) বিচ্ছিন্নতা নীতির প্রতিবাদে বৃহৎ মিছিল শুরু হলে পুলিশ অনেক বিক্ষোভকারীকে কারাগারে বন্দি করে। এরপর নাগরিকরা বয়কট, স্বাধীনতা যাত্রা, পদযাত্রা, অহিংস প্রতিরোধ ও আইন অমান্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ চালিয়ে যান। এই সময় ডাব্লিউ. ই. বি. ডু বোইস (W. E. B. Du Bois), বুকার টি. ওয়াশিংটনের (Booker T. Washington) এর মতো ব্যক্তিত্বদের পূর্ববর্তী চিন্তাধারা আন্দোলনের আদর্শে প্রভাব ফেলে, যদিও তাঁরা সরাসরি এই সময়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেননি। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের আগুনের নল, কুকুর ব্যবহার এবং নির্মম নির্যাতনের ছবি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়ে তোলে।
অনেক শ্বেতাঙ্গ এই বিষয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের পাশে দাঁড়ালেও শ্বেতাঙ্গদের একাংশ এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। তারা আমেরিকায় ‘কু ক্লাক্স ক্ল্যান’ (Ku Klux Klan) বা কেকেকের মতো শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী সংগঠন কৃষ্ণাঙ্গদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। এরপর সারা দেশজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি পুলিশের অত্যাচার, গণপিটুনি, বোমা হামলা, হত্যা এবং কারাবাসের ঘটনা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে , যা একসময় ওকল্যান্ড, শিকাগো এবং নিউ ইয়র্কের মতো শহরগুলিতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
১৯৬৩ সালের ২৮শে আগস্ট লক্ষ লক্ষ মানুষ ওয়াশিংটনে চাকরি ও স্বাধীনতার জন্য জাতির সর্বকালের সর্ববৃহৎ অহিংস নাগরিক অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে, যা ওয়াশিংটন মার্চ (March on Washington) নামে পরিচিত। প্রায় ২৫০,০০০ মানুষ এই ওয়াশিংটন মার্চে অংশগ্রহণ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছিল। ওয়াল্টার রিউথারের (Walter Reuther) মতো অনেক শ্বেতাঙ্গরাও ‘ওয়াশিংটনে মার্চ’-এর মতো বড় সমাবেশে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই আন্দোলনে জুনিয়র মার্টিন লুথার কিং ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ (I Have a Dream) বক্তৃতা দিয়েছিলেন যা আজও অমর হয়ে আছে।
সেই একই বছরে অর্থাৎ ১৯৬৩ সালে ‘বার্মিংহাম প্রচার অভিযান’-এ মার্টিন লুথার কিং এবং অন্যান্য নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতারা বর্ণবাদ বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রচার করে। বিচ্ছিন্নতা এবং বর্ণবাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার আফ্রিকান-আমেরিকান শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনে সামিল হয়, কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই মিছিলের উপর পুলিশ নির্মমভাবে আক্রমণ করে যা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নৈতিক শক্তিকে আরও দৃঢ় করে।
অবশেষে রাষ্ট্রপতি জন এফ. কেনেডির (John F. Kennedy) প্রশাসন এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে আইন প্রণয়নের প্রস্তাব দেয়। কেনেডির মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি লিন্ডন বি জনসন (Lyndon B. Johnson) ১৯৬৪ সালে নাগরিক অধিকার বিলে স্বাক্ষরিত করলে, তা আইনে পরিণত হয়। ১৯৬৪ সালের নাগরিক অধিকার আইনে জনসাধারণের আবাসন, কর্মসংস্থান এবং ফেডারেলের সহায়তাপ্রাপ্ত কর্মসূচিতে জাতি, বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার ও ১৯৬৮ সালে আবাসনের ক্ষেত্রে বৈষম্য নিষিদ্ধ করার জন্য আইন প্রণয়ন করে।
তবুও ১৯৬৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরে একটি দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, যা ব্ল্যাক পাওয়ারের ‘ওয়াটস রায়ট’ (Watts Riot) নামে পরিচিত । এই দাঙ্গা প্রায় সারা শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। নাগরিক অধিকার আইন পাশ এবং ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিং-এর হত্যাকাণ্ডের পর ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূলধারা শেষ হয়, যদিও বর্ণবৈষম্য বিরোধী সংগ্রাম চলতে থাকে।
নাগরিক অধিকার আন্দোলন আমেরিকার নীতি, আইন ও সংস্কৃতি গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। অনেক কর্মী মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতিতে অনুপ্রাণিত হন এবং ভারত, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের ঔপনিবেশিকতা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। তবে এই আন্দোলন মাদক, অপরাধ ও দারিদ্র্যের সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। নাগরিক অধিকার আইন আইনি বৈষম্যের অবসান ঘটালেও আয়, আবাসন, শিক্ষা ও বিচার ব্যবস্থায় বর্ণগত ব্যবধান এখনও রয়ে গেছে। ২০২০ সালে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের (George Floyd) মৃত্যুর ঘটনা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অসমাপ্ততাকে আবারও সামনে এনে দেয় এবং আমেরিকার বর্ণনীতি ও আইনি কাঠামোকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান