সববাংলায়

নীল বিদ্রোহ

বিভাগঃ ,

ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কৃষক বিদ্রোহ হল নীল বিদ্রোহ (Indigo Revolt)। দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্যাতন ও দুর্ভোগের বিরুদ্ধে গিয়ে নীল চাষিরা এই আন্দোলন সংগঠিত করে। মহাবিদ্রোহের পর এই কৃষক আন্দোলন ইংরেজদের ব্যাপক প্রভাবিত করেছিল। ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ বিশেষত বাংলা এই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি হলেও বিহারের মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে নীলকর সাহেবদের দ্বারা অত্যাচারিত ও শোষিত হয়েছিল। শুধু গ্রামের নীলচাষিরা নয় জমিদার, জোতদার, মহাজনরাও ক্রমে নীল বিদ্রোহে জড়িয়ে পড়ে। আবার কলকাতার মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী সমাজও এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। ব্রিটিশ সরকার কঠোর দমনপীড়ন নীতির মাধ্যমে এই আন্দোলনের গতি স্তিমিত করার চেষ্টা করলেও মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে চাষিরা নিজেদের দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল।

নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে নীলচাষি বা রায়তরা ১৮৫৯ সালে নীল বিদ্রোহের সূচনা করে।

অনেকের মতে প্রাচীন কালে প্রধানত ভারতবর্ষে নীল প্রস্তুত করে অন্যান্য দেশে তা রপ্তানি করা হত। ইন্ডিয়া বা হিন্দুস্তান থেকে এই নীল রপ্তানি করা হত বলে গ্রীস ও রোমে নীল ‘ইন্ডিগো’ নামে পরিচিত ছিল। বস্ত্রশিল্পে এই নীলকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হত। লুইস বোনাউড (Louis Bonnaud) নামক এক ফরাসি ব্যক্তি ১৭৭৭ সালে আধুনিক প্রণালীতে প্রথম নীল প্রস্তুত করা শুরু করে বাংলার চন্দননগরের কাছে তালডাঙ্গায় ও গোন্দলপাড়ায় বা গোয়ালপাড়ায় দুটি নীলকুঠি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে সুতিবস্ত্র শিল্পের জন্য বিশ্বব্যাপী সমগ্র বাজারে এই নীলের চাহিদা ক্রমশ বৃদ্ধি পায় আর ইংল্যান্ডে শিল্পবিপ্লবের সময় এই চাহিদা আরও বেড়ে যায়। কিছুদিন পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার ভারতে ১৭৭৯ সালে সমস্ত ইউরোপীয়কেই বাংলা ও বিহারে নীলচাষ করার অধিকার দেয়। ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পের জন্য নীলের চাহিদা মেটানো এবং বাজার দখলের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সস্তা মজুর, অনুকুল আবহাওয়া ও সহজ পরিবহনের জন্য বাংলাকে তাদের প্রধান ঘাঁটি হিসাবে গড়ে তোলে। নীলের ব্যবসা এতই লাভজনক ছিল যে কোম্পানির ডিরেক্টর এক চিঠিতে তাদের কর্মচারীদের লিখে পাঠিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ থেকে টাকার পরিবর্তে নীল পাঠালে আর টাকা দেওয়ার দরকার নেই। নীলচাষ ক্রমশ বাংলার বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান, নদীয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, যশোর এবং পাবনায় ছড়িয়ে পড়ে। নীলকররা বাংলায় প্রায় এক হাজারেরও বেশি নীল কারখানা তৈরি করেছিল।

এক শোষণমূলক ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কোম্পানির কর্মচারীরা কৃষকদের নীল চাষ করতে বাধ্য করত। এই নীলচাষের জন্য কোম্পানির কর্মচারীরা কৃষকদের জোর করে দাদন বা অগ্রিম অর্থ দিত। আর একবার যে এই দাদন নিত সারাজীবন তাকে নিজের জমিতে নীল চাষ করে যেতে হত। অন্যদিকে নীলচাষে কৃষকদের কোনও লাভ থাকত না কারণ নীলকর সাহেবরা খুব কম দামে তাদের থেকে নীল কিনত। নীলকর সাহেবরা তাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার, উৎপীড়ন ও নিপীড়ন চালাত। যারা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করত তাদের সম্পত্তি জোর করে ছিনিয়ে নেওয়া, ফসল লুঠপাট করা, ফসল পুড়িয়ে দেওয়া, কৃষকদের পরিবারের সদস্যদের অপহরণ করা ইত্যাদি নানাভাবে অত্যাচার করা হত। এছাড়া ১৮৩০ সালের কুখ্যাত পঞ্চম আইন-বলে (Regulation V of 1830) নীলকররা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই আইনে বলা হয় যে, দাদন গ্রহণকারী কৃষকদের নীল চাষ না করাটা হবে আইনত অপরাধ। আর কিছু লোভী জমিদার নিজেদের সুবিধার্থে এই কাজে নীলকর সাহেবদের সাহায্য করত। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো যে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের মতো জমিদার ও ব্যবসায়িরা পর্যন্ত নীল চাষ বিষয়ে ইংরেজদেরই সমর্থন করেছিলেন। এছাড়া নীল চাষের জন্য কৃষকরা নিজেদের জমিতে লাভজনক ফসল ধান বা অন্যান্য শস্য উৎপাদন করতে পারত না, ফলে তারা ঋণগ্রহণ করে ক্রমে জমিদার ও মহাজনদের শোষণ চক্রে জড়িয়ে পড়ত। এইসকল পরিস্থিতির মধ্যে কৃষকরা ক্ষিপ্ত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

নীল বিদ্রোহ প্রথম সংগঠিত হয় নদীয়া জেলার চৌগাছা গ্রামে। ১৮৫৯ সালে সেখানে আন্দোলন সংগঠিত করেন মহাজন দিগম্বর বিশ্বাস ও জোতদার বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস। তাঁরা একটি অহিংস ধর্মঘটের মধ্যে দিয়ে নীলচাষীদের একত্রিত করে নীলচাষ করবে না বলে ঘোষণা করেন। নদীয়া ছাড়াও পাবনা জেলাতেও কৃষকরা ধর্মঘটের ডাক দেয়, পাবনায় নীল বিদ্রোহের নেতা ছিলেন কাদের মোল্লা। এছাড়া রফিক মণ্ডলের নেতৃত্বে মালদায় ও মহেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ঝিনাইদহে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এমনকি রামরতন মল্লিকের মতো জমিদারও এই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য নীলকর সাহেবরা খাজনা বৃদ্ধি করে ও কৃষকদের উচ্ছেদ করা শুরু করে, ফলে পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। অহিংসতার মধ্যে দিয়ে নীল বিদ্রোহ শুরু হলেও পরবর্তীকালে তা সহিংস হয়ে ওঠে। বিদ্রোহীরা নীলকর এবং তাদের সাহায্যকারী জমিদারদের উপর আক্রমণ করে, নীলকুঠিগুলি জ্বালিয়ে দেয়। কৃষক নেতা গোপাল মণ্ডল কৃষকদের নিয়ে অত্যাচারী নীলকর সাহেবের লাঠিয়াল বাহিনীকে আক্রমণ করেন। কৃষকরা আবার কিছু নীলকরকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে, ধরা পড়ার ভয়ে এই সময় অনেক নীলকর সাহেব পালিয়েও যায়। এছাড়া বর্ধমানের কালনায় নীল বিদ্রোহের নেতা শ্যামল মণ্ডল ‘মৃত্তিকা’ নামক এক পত্রিকায় নীলচাষীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে এইসময় চুক্তি ভঙ্গের অপরাধে অনেক নীলচাষীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। আবার জমিদার ও নীলকররা বহু কৃষককে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।

নীল বিদ্রোহ সরকারের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তীকালে নীল বিদ্রোহ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তাতে ব্রিটিশ সরকারের সমগ্র ভারত শাসন করার স্বপ্ন খানিকটা ম্লান হতে শুরু করে আর এইজন্য ব্রিটিশ সরকার নীলকরদের সংযত করার চেষ্টা করে। বিদ্রোহ চরমে উঠলে এবং নবাব আব্দুল লতিফের (Nawab Abdul Latif) চাপের মুখে পড়ে সরকার তাই বাধ্য হয়ে পাঁচজন সদস্যকে নিয়ে ১৮৬০ সালের ৩১ মার্চ নীল কমিশন তৈরি করে। এই কমিশন প্রায় ১৩৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে এবং ২৭ আগস্ট রিপোর্ট পেশ করে। ওই রিপোর্টেও নীল চাষিদের করুণ অবস্থার কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তীকালে আইন পাশ হয়, যাতে বলা হয় যে, কোনও কৃষককেই জোর করে নীল চাষ করানো যাবে না। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, এই নীল বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে বাংলায় নীল চাষ ক্রমশ বন্ধ হয়ে গেলেও বিহারে নীলচাষ ও নীলকরদের অত্যাচার চলে প্রায় বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। ১৯১৭ সালে গান্ধীজীর নেতৃত্বে বিহারের চম্পারণে নীলচাষিরা একত্রিত হয় ও বিদ্রোহ করে।

সমগ্র বাংলায় নীল বিদ্রোহ সক্রিয় প্রভাব পড়েছিল। এই আন্দোলনে হিন্দু-মুসলিম ধর্ম নির্বিশেষে সকল কৃষকরা অংশগ্রহণ করে, প্রায় সমগ্র গ্রামীণ সমাজ এই আন্দোলনের পক্ষে একজোট হয়। তবে এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দিক হল যে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী মানুষ, কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজ এমনকি মিশনারিরা পর্যন্ত এই বিদ্রোহকে সমর্থন করে। মূলত এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে গ্রামের সমস্যা নিয়ে শহরের মানুষদের সোচ্চার হতে দেখা যায়। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘হিন্দু প্যাট্রিয়ট’ পত্রিকার মাধ্যমে শহরের মানুষেরা গরিব নীলচাষিদের দুর্দশার কথা জানতে পারে, এমনকি হরিশচন্দ্রের প্রচেষ্টাতেই ‘ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন’ও নীলচাষীদের পক্ষ অবলম্বন করে। এছাড়া তিনি নীল কমিশনের কাছে নীলচাষীদের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আবার শিশিরকুমার ঘোষ যশোর, নদীয়ার গ্রামে ঘুরে, ঘুরে কৃষকদের সংগঠিত করা শুরু করেন। তাছাড়া নীলকরদের অত্যাচার নিয়ন্ত্রিত করার জন্য ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্র রচনা করেন ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি। মাইকেল মধুসুদন দত্ত এই বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ করেন এবং তা ‘দা ইন্ডিগো প্ল্যান্টিং মিরর’(The Indigo Planting Mirror) নামে পাদ্রী জেমস লং সাহেব প্রকাশ করেন। ‘নীলদর্পণ’এর প্রকাশের পর সমগ্র বাংলা জুড়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়। ক্রমেই এই নাটকের মধ্যে দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে নীল বিদ্রোহ। এই উত্তাল পরিস্থিতি সামলানোর জন্য একসময় ব্রিটিশ সরকার ‘নীলদর্পণ’ নাটককে নিষিদ্ধ করে দেয়। এমনকি এই গ্রন্থের ইংরাজি অনুবাদ প্রকাশের অপরাধে লং সাহেবকে এক হাজার টাকা জরিমানাও করা হয় যা কালীপ্রসন্ন সিংহ পরিশোধ করেন।

পরাধীন ভারতবর্ষের অন্যতম এক সফল বিদ্রোহ হল এই নীল বিদ্রোহ। এই আন্দোলনে বাংলার সব স্তরের মানুষ যেভাবে অংশগ্রহণ করেছিল তা যদি সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ত তাহলে হয়ত ব্রিটিশরা এত দ্রুত ভারতীয় উপমহাদেশের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তার করতে পারত না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. https://en.wikipedia.org/
  2. https://www.britannica.com/
  3. ‘নীল বিদ্রোহ ও বাঙালি সমাজ’, প্রমোদ সেনগুপ্ত, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৬০, পৃষ্ঠা- ১-১২৯

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading