বিবিধ

সুশীলা সুন্দরী

শীত পড়লেই কলকাতার মাঠ-ময়দান জুড়ে রঙচঙে তাঁবু পড়ে যেতো সেকালে। শীতের আমেজ কলকাতার বাঙালি উপভোগ করতো এই সব তাঁবুতে এসে হরেক কিসিমের খেলা দেখে। হ্যাঁ, এটাই ছিল সার্কাস। এমন তুঙ্গে ছিল এই সার্কাসের জনপ্রিয়তা যে সার্কাস ময়দান ছিল বলে একসময় একটা বিশেষ অঞ্চলের নামই হয়ে গেল পার্ক সার্কাস। আর সেই সার্কাসে যদি কোনো দুঃসাহসী বাঙালি মহিলা বাঘের মুখে চুমু খান বা বাঘের মুখে মাথা ঢুকিয়ে দেন তাহলে সে তো বাঙালির রাতের ঘুম কাড়বেই। মানুষ আর ঘোড়ার খেলা দেখে অভ্যস্ত বাঙালি সেদিন হঠাৎ মঞ্চে দেখেছিল এই রোমহর্ষক খেলা। বাঘকে নিছক পোষা কুকুর বা বশীভূত সাপের মতো নিয়ন্ত্রণ করছেন এক বাঙালি নারী – অন্তঃপুরবাসিনী পর্দানসীন হিন্দু রমণী নয়, সেকালের প্রেক্ষিতে একেবারে ‘ডেয়ারডেভিল’ কন্যা সুশীলা সুন্দরী (Sushila Sundari)। ভারতের প্রথম মহিলা সুশীলা যিনি বাঘের সঙ্গে খেলা দেখিয়েছিলেন।

সার্কাসের ইতিহাস অনেক পুরনো। নবগোপাল মিত্রের হাত ধরে বাংলায় প্রথম সার্কাস চালু হয় যেখানে ছিল দুটো ঘোড়া আর কয়েকজন জিমন্যাস্ট। তারপর পরম্পরাবাহিত হয়ে এই সার্কাসের ভার হাতে নিয়ে নবগোপাল মিত্রের জামাই রাজেন্দ্রলাল সিংহ এর কিছু অদল-বদল ঘটান। বিদেশি কয়েকজন জিমন্যাস্টকে নিয়ে তিনি শুরু করেন ‘গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাস’। তবে তখনও পর্যন্ত সার্কাসে মানুষ, ঘোড়া, কুকুর ছাড়া কোনো হিংস্র পশুর ব্যবহার হতো না আর দ্বিতীয়ত কোনো বাঙালি মহিলাকে তখনও পর্যন্ত সেই সার্কাসের তাঁবুতে দেখা যায়নি। প্রথম মতিলাল বসুর স্ত্রী রাজবালা ‘বোসের গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এ অংশগ্রহণ করেন। ইতিহাসের বাঁক বদল ঘটে যায়। মতিলাল বসুর হাত থেকে মালিকানা প্রিয়নাথ বসুর কাছে এলে তিনি এর নাম পালটে ফেলেন, ১৯০৯ সালে ‘প্রফেসর বোসেস গ্র্যাণ্ড সার্কাস’ নাম দিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু হয় সেই সার্কাসের। আর বাংলার সার্কাসের ইতিহাসে সবথেকে সফলভাবে নাম করে নেয় এই প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস। এই প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে একদিন চলে আসে লক্ষ্মী-নারায়ণ। অবাক হলেন? ভাবছেন কে এই লক্ষ্মী-নারায়ণ? ঘটনাটা হল ১৮৯৬ সালে প্রিয়নাথ বসুর সার্কাস দেখে খুশি হয়ে রেওয়াদের মহারাজা তাঁকে দুটি বাঘ উপহার দেন – বাঘ জোড়ার নাম লক্ষ্মী ও নারায়ণ। কে জানতো এই বাঘ জোড়ার সঙ্গে একদিন এক দুঃসাহসী বাঙালি নারীর নাম জড়িয়ে যাবে বাংলার সার্কাসের ইতিহাসে! সার্কাসে বাঘ এসে প্রচলিত সার্কাসের চেহারাটাই একেবারে বদলে দিল। জনপ্রিয় হয়ে উঠলো সুশীলা সুন্দরীর বাঘের খেলা। উনিশ শতকের পর্দানসীন ভীরু বাঙালি রমণীদের পিছনে ফেলে তখন প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে বাঘের মুখে মাথা ঢুকিয়ে, বাঘের মুখে চুমু খেয়ে দুঃসাহসী সব খেলা দেখাচ্ছেন সুশীলা সুন্দরী। স্বভাবতই কৌতূহলপ্রিয় বাঙালির মনে প্রশ্ন এলো কে এই সুশীলা সুন্দরী? একসময় যিনি পুরুষদেরকে সমানে সমানে টেক্কা দিয়ে ঘোড়া চালনা, জিমন্যাস্টিক, কুস্তি শিখেছেন তাঁর জন্ম সেকালের কুখ্যাত রেডলাইট এলাকা রামবাগানের জমিদারবাড়িতে ১৮৭৯ সালে। সম্পর্কে মতিলাল বসুর স্ত্রী তিনি, তাঁর পুরো নাম সুশীলা সুন্দরী বসু। বেথুন স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। কলকাতা জুড়ে তখন বাঙালিদের মধ্যে শরীরচর্চার আগ্রহ জন্মেছে, গলিতে গলিতে কুস্তির আখড়া আর সেসব আখড়ার মাটি চষে ফিরছেন সুশীলা সুন্দরী। প্রিয়নাথ বসুর আখড়াতেই সুশীলার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় তাঁর। বোন কুমুদিনীর সঙ্গে আখড়াতে আসতেন সুশীলা। তারপর আখড়ায় কুস্তি করতে করতে সার্কাসে ঢুকে পড়া। ১৯০১ সালে প্রথম সুশীল সুন্দরী আসেন বাঘের খেলা দেখাতে। ভালোমতো প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন তিনি কীভাবে বাঘকে বশ করতে হয়। কাদের বশ করতে চান আসলে সুশীলা? সেই লক্ষ্মী-নারায়ণ। গ্রেট ইণ্ডিয়ান সার্কাসের বাদলচাঁদ তার আগে বাঘের খেলা দেখালেও সে বাঘ থাকতো চেন বাঁধা আর সুশীলা সুন্দরীর সার্কাসে সবথেকে বড়ো চমক রোমহর্ষক মঞ্চের মধ্যে বাঘ থাকতো একেবারে মুক্ত, বাঁধনহীন। বাঘের খাঁচায় নির্ভয়ে ঢুকে পড়তেন সুশীলা আর এরপরে কখনো গায়ে হেলান দিয়ে শোয়া, কখনো নিজের মাথা বাঘের মুখে ঢোকানো আবার কখনো বা বাঘের মুখে চুমু খাওয়া – সার্কাস দেখতে দেখতে বাঙালি দর্শকের পিঠ দিয়ে শীতল শিহরণ খেলে যেতো নিশ্চিত। ১৯১০ সাল নাগাদ বাঘের সঙ্গে খোলা মঞ্চে কুস্তি করতে শুরু করেন সুশীলা। সেই খেলা আরো জনপ্রিয় হয়। প্রিয়নাথ বসুর সার্কাসে সুশীলা সুন্দরীর এই বাঘের খেলা সারা বাংলা এমনকি ভারতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি শুরু হয়ে গেল। শুধু বাঘের খেলা দেখানোর সাহস নয়, প্রবল বাহুবলের জোরও ছিল তাঁর। শোনা যায় সার্কাসে নিজেকে কবর দেওয়ার খেলা দেখাতেন সুশীলা, চমক ছিল সেই কবরের উপর মাটিতে ঘোড়ার খেলা দেখানোর পরও মাটি খোঁড়া হলে সুশীলা অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতেন। এই খেলাই একদিন দেখাতে দেখাতে ঝড়-বৃষ্টির কারণে দর্শকসহ সকল সার্কাসের সদস্য তাঁবু ছেড়ে চলে যায়, এদিকে তখন সুশীলা মাটির নীচে কবরে। তাঁকে তুলে আনার কথা আর কারো মনে ছিল না, প্রিয়নাথ বসুরও না। অনেকক্ষণ পরে নাকি সুশীলা নিজেই মাটি হাত দিয়ে ফুঁড়ে উপরে উঠে এসেছিলেন। যেমন সাহস, তেমনই গায়ের জোর। কিন্তু তবু শেষরক্ষা হল না। একদিন একটি ক্ষুধার্ত বাঘের সঙ্গে খেলা দেখাতে গিয়ে তাঁর থাবায় ভীষণরকম আহত হন সুশীলা। লক্ষ্মী-নারায়ণ তখন মারা গেছে, নতুন একটি বাঘ ‘ফরচুন’কে নিয়ে খেলা দেখাতে গিয়ে তারই আঘাতে মৃত্যু হল সুশীলার। সার্কাস রিং থেকে একেবারে চিরদিনের মতো বিদায় নিলেন তিনি। সময়টা ১৯২৪ সাল। আজ থেকে ১২০ বছর আগে বাঙালি মহিলার এমন দুঃসাহসিক কাজ সার্কাসের জগতে বিরল তো বটেই, একইসঙ্গে বাঙালির ইতিহাসে সুশীলা সুন্দরী এক ছকভাঙা রোমাঞ্চকর জীবনের কারিগর। উনিশ শতকের গোঁড়া রক্ষণশীল সমাজে সুশীলা এক দৃপ্ত প্রতিবাদের নাম।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।