ইতিহাস

কালীপ্রসন্ন সিংহ

বীরসিংহের সিংহ শিশু বলা হয় বিদ্যাসাগরকে। কিন্তু এই বঙ্গ দেশেই এমন এক সিংহ শাবক একদা জন্মেছিলেন যিনি তাঁর মেধার দীপ্তি, অন্তরের প্রজ্ঞায়, হৃদয়ের তেজদীপ্ততায় বাংলা সাহিত্য থেকে বাংলা সমাজ সর্বত্র প্রবহমান অচলায়তনের বিরুদ্ধে এক মূর্তিমান বিদ্রোহ ছিলেন। বাঙালি তাঁকে কেবল ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ আর মহাভারতের বঙ্গানুবাদকারী হিসেবেই চেনে। কিন্তু এই সিংহের বিচরণ ক্ষেত্র আরও সুদূর বিস্তৃত। কালীপ্রসন্ন সিংহ কে নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

জোড়াসাঁকোর বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটের বিখ্যাত ধনী সিংহ পরিবারে ১৮৪০ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন কালীপ্রসন্ন।
বাবা ছিলেন বিখ্যাত ধনী নন্দলাল সিংহ, যিনি সাতুসিংহ নামেই পরিচিত এবং মা ত্রৈলোক্যমোহিনী দাসী।কালীপ্রসন্নের জন্মের বছর ছয়েকের মধ্যেই ১৮৪৬ সালে কলেরায় অত্যন্ত শৌখিন নন্দলালের মৃত্যু হয়। আদালতের হুকুমে ছ’বছরের কালীপ্রসন্নের অভিভাবকত্ব ও তাঁর বিপুল সম্পত্তির দেখভালের দায়িত্ব নেন পারিবারিক বন্ধু বিচারক হরচন্দ্র ঘোষ।

স্বভাবে অত্যন্ত ডানপিটে এবং ডাকাবুকো স্বভাবের ছিলেন বালক কালীপ্রসন্ন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা স্মরণীয়।

একদিন ক্লাস চলছে। সবাই খুব মন দিয়ে স্যারের পড়ানো শুনছে। হঠাৎই একটি ছেলে ক্লাসরুমে তুমুল কান্নাকাটি শুরু করে দিল।

‘‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?’’ জিজ্ঞাসা করলেন স্যার।

‘‘আমাকে কালীপ্রসন্ন মাথায় জোরে চাঁটি মেরেছে’’ বলেই আবার কান্না।

‘‘সে কী! কালী, তুমি ওর মাথায় মেরেছ?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ’’

‘‘আমার কোনও দোষ নেই স্যার’’

‘‘দোষ নেই মানে? ওকে মারলে কেন?’’

‘‘স্যার আমি জাতে সিংহ থাবা দিয়ে শিকার ধরা আমার জাতীয় স্বভাব ছাড়ি কী করে বলুন?’’ গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন কালীপ্রসন্ন।

এ ভাবেই ক্লাস করতে করতে ১৮৫৭ সালে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে দিলেন হিন্দু কলেজের কিছু দিনের ছাত্র কালীপ্রসন্ন। আসলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পক্ষে এ ছেলেকে বেঁধে রাখা সম্ভব ছিল না। তা বলে পড়াশোনা ছাড়লেন না। বাড়িতে মাস্টারমশাই রেখে তাঁকে সংস্কৃত আর ইংরিজি শেখানো শুরু হল। ছোটবেলা থেকেই স্মৃতিধর। প্রখর বুদ্ধি। একবার যা পড়েন বা শোনেন, আর ভোলেন না। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ঠাকুমার কাছে শুনতেন কবিকঙ্কণ, কৃত্তিবাস বা কাশীরামের পয়ার। টোলে পণ্ডিতের কাছে সংস্কৃত, উইলিয়াম কার্কপ্যাট্রিক সাহেবের কাছে ইংরেজি পড়া শুরু হল। দুই ভাষাতেই চোস্ত হয়ে উঠল যুবক কালীপ্রসন্ন। বাংলা ভাষায় কালীপ্রসন্নের দখল গড়ে ওঠে মূলত মা ও ঠাকুমার কাছে নেওয়া বাংলা শিক্ষার মাধ্যমে।বাড়িতে মায়ের কাছে পয়ার মুখস্ত বললেই পুরস্কার ছিল পয়ার পিছু একটি করে সন্দেশ। সেই সন্দেশের লোভে বাংলা পয়ার শিখতে শিখতেই কবে যেন একদিন বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গেলেন।

মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে প্রথমবার বিয়ে করেন বাবু কালীপ্রসন্ন। পাত্রী রঙ্গপুরের সদর আমিন’ বেণীমাধব বসুর কন্যা ভুবনমোহিনী দাসী। কিন্তু বিয়ের কিছু দিন বাদেই ভুবনমোহিনীর মৃত্যু হয়। এরপর আবার বিয়ে করেন কালীপ্রসন্ন। এবার পাত্রী রাজা প্রসন্ননারায়ণ দেবের দৌহিত্রী শরৎকুমার দাসী। এই বিবাহ সম্পর্কে অবশ্য ইতিহাসে বিশেষ নথি পাওয়া যায় না। তবে যেটুকু জানা যায় কালীপ্রসন্নের মৃত্যুর পরে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র বিজয়চন্দ্রকে দত্তক নেন শরৎকুমারী।

কালীপ্রসন্নের চরিত্রের ধরণটি ছিল একেবারে ইস্পাতের মত দৃঢ় কিন্তু  পরিস্থিতি ভেদে নমনীয়।ব্রাহ্মণের ভণ্ডামির শাস্তি স্বরূপ যেমন তার টিকি কেটে নিয়েছেন তেমনি আবার প্রজার অধিকারের পক্ষেও কথা বলেছেন। জমিদার ডাকলেই প্রজাকে আসতে হবে, প্রজার বাড়ি থেকে ধান লুট, এ সবেরও চূড়ান্ত বিরোধিতা শোনা যায় তাঁর কাছ থেকে। বাংলা ভাষা চর্চার জন্য  তৈরি করেন একটি ‘ডিবেটিং ক্লাব’। পরে যা ‘বিদ্যোৎসাহিনী সভা’ নামে পরিচিত হয়। এই সভা থেকেই প্রকাশিত হয় কালীপ্রসন্ন সম্পাদিত ‘বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা’। ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে এই সভা প্রবন্ধ প্রতিযোগিতারও আয়োজন করেছিল। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে মাইকেল মধুসূদনকে প্রকাশ্য সভা করে ঘটা করে সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন যেখানে সমগ্র বঙ্গ সাহিত্য সমাজ ওনাকে একঘরে করে দেন।

কালীপ্রসন্নের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’  বাংলা সাহিত্যের একটি যুগান্তকারী সৃষ্টি এই কারণে যে এতে কলকাতার  নব্য সমাজ এবং তার প্রায় সব ধরনের মানুষের চরিত্র অঙ্কিত হয়েছে নিপুণ দক্ষতায় শ্লেষ মিশ্রিত ভাবে। গ্রন্থে যাদের ব্যঙ্গ করা হয়েছে তারা সবাই লেখকের কালীপ্রসন্নের ও তৎকালীন সমাজের অসাধারণ পরিচিত মানুষজন। তিনি শুধু মহাভারতের বঙ্গানুবাদই করে ক্ষান্ত থাকেননি, মহাভারতের বঙ্গানুবাদ খণ্ডে খণ্ডে জনতাকে বিলিয়েও দেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।কালীপ্রসন্নের অন্যান্য সাহিত্য কর্মের মধ্যে পড়ে বাবু’, ‘মালতী মাধব নাটক’ অনুবাদ, ‘সাবিত্রী সত্যবান’। এছাড়া কালীদাসের ‘বিক্রমোর্ব্বোশী’ নাটকও অনুবাদ করেন। শুধু সাহিত্য নয়, এই অনন্য প্রতিভা তার প্রতিভার স্বাক্ষর সঙ্গীতেও রেখেছেন। কালীপ্রসন্ন এক বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কর্তাও ছিলেন। ভালবাসতেন হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গসংগীতকে। সংগীত সম্পর্কে জ্ঞানও ছিল গভীর। বাড়িতে সঙ্গীতসমাজ নামে একটি সভারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। অজস্র গান লিখেছেন নিজে। আর নিজে যে সব নাটক লিখতেন সে সব নাটকের গানে সুরও বসাতেন নিজেই।

তেইশ বছর বয়সে  অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট ও ‘জাস্টিস অব পিস’ পদটি অলঙ্কৃত করে নিজের স্বকীয়তার পরিচয় রাখতে ভোলেননি এই কাজপাগল মানুষটি। কিন্তু শুধু রায়দান নয়, নিজের রায়ে কোথাও ভুল হলে তা সংশোধন করে নিতেও এই কালীপ্রসন্নের বিন্দুমাত্র সময় লাগত না। আসলে বিচারপতি হিসেবে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করতে চেয়েছেন কালীপ্রসন্ন। জমিদার হিসেবেও তা-ই।দাতাকর্ণ নামে লোকে চিনত তাঁকে। সমাজের কল্যাণে যেখানে যত অর্থ প্রয়োজন হয়েছে অকাতরে দান করেছেন কালীপ্রসন্ন। এর জন্য অবশ্য কম কথা শুনতে হয়নি। কেউ বলেছেন পয়সা ছড়িয়ে নাম কিনতে চাইছেন, কেউ বলেছেন রাজবংশের বখাটে ছোকরা। কান দেননি সে সব কথায়।আসলে সাহিত্য হোক বা সমাজ সংস্কার, কালীপ্রসন্নের যে কোনও কাজে মানুষ’ই ছিল প্রধান লক্ষ্য। আর সেই মানুষের জন্য যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি এই মানুষটির কৃতজ্ঞতার শেষ ছিল না।

বিদ্যাসাগর মশাইকে মানতেন নিজের গুরু হিসেবে। যখনই গুরুদেবের প্রয়োজন হয়েছে  ছুটে গিয়েছেন তিনি নির্দ্বিধায়। অনেক চেষ্টায় বিধবা বিবাহ আইন চালু করলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু বিধবা বিয়ে করার লোক নেই। কালীপ্রসন্ন ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি বিধবা বিবাহ করবেন তাঁকে তিনি এক হাজার টাকা পুরস্কার দেবেন। কৃষি-ব্যবস্থার উন্নতিতে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছিলেন জোড়াসাঁকোর এই জমিদারবাবু। সেই সময়ে দাঁড়িয়েই উপলব্ধি করেছিলেন কৃষি বিদ্যালয়, কৃষি প্রদর্শনী আয়োজন করার। শুধু উপলব্ধিই নয়, সিসিল বিডন যে কৃষি প্রদর্শনীর আয়োজন করলেন, তাতেও বিশেষ সহযোগিতা করেন কালীপ্রসন্ন। বিদ্যোৎসাহিনী পাঠশালা-সহ সাতটি অবৈতনিক স্কুল, চিৎপুরে দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরি, দুর্ভিক্ষে নিজের ‘উত্তরীয় বস্ত্র’টি পর্যন্ত বিলিয়ে দেওয়া, সবেতেই অগ্রণী মানুষটি। উনিশ শতকের মধ্যভাগে এই মহানগরে বিশুদ্ধ পানীয় জলের তেমন কোনও ব্যবস্থা ছিল না। বিষয়টি দেখে ইংল্যান্ড থেকে ২,৯৮৫ টাকায় চারটি ধারাযন্ত্র আনালেন কালীপ্রসন্ন।সেগুলি বসানো হল কলকাতার চার জায়গায়। মাত্র তিরিশ বছর বেঁচে যে কাজ করে গেছেন, যে পাহাড় প্রমাণ সৃষ্টি করে গেছেন কালীপ্রসন্ন তা কল্পনারও অতীত।

সেই সময়ে  আড়াই লক্ষ টাকা খরচ করে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই মহাভারত বিতরণ এই অসামান্য মানুষটিকে একেবারে পথে বসিয়ে দেয়।ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে ওড়িশার জমিদারি, কলকাতার বেঙ্গল ক্লাব, আরও যা যা সম্পত্তি, সব একে একে বিক্রি করে সাথে কুড়িটি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কার্যত কপর্দকশূন্য অবস্থায় ১৮৭০ সালের ২৪ জুলাই বেলা ৩টে নাগাদ ডিসঅর্ডার অব লিভারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩০ বছর পাঁচ মাস বয়সে পরলোক গমন করেন কালীপ্রসন্ন সিংহ।

যদিও কালীপ্রসন্নের শেষ জীবনের অতিরিক্ত মদ্যপানকে অনেকেই নৈতিক অবনতি ও তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে দেখেন কিন্তু তার পরেও কর্মকাণ্ডের জোরেই মদ্যপানের দোষকেও অতিক্রম করে যান কালীপ্রসন্ন। রাজকৃষ্ণ রায় তাই লিখেছিলেন,

“যদিও তোমাতে কিছু দোষ দেখা যায়,

এহেন মহান  গুণে সে দোষ কি আর ধরে কেহ; দোষাকারে যেমতি সুধার

কলঙ্ক ঢাকিয়া করে গুণের প্রচার।”

তথ্যসূত্র


  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Kaliprasanna_Singha
  2. বাংলার সমাজ ও সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহ’: পরেশচন্দ্র দাস।
  3. ‘মহাত্মা কালীপ্রসন্ন সিংহ’: মন্মথনাথ ঘোষ।
  4. ‘সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা’: সম্পাদনা— অরুণ নাগ।
  5.  ‘বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ’: বিনয় ঘোষ।
  6.  ‘দি ইন্ডিয়ান স্টেজ’ (দ্বিতীয় খণ্ড): হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত।
  7. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০শে আগস্ট ২০১৬ সাল।
  8. আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩রা আগস্ট ২০১৯ সাল।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন