লোকসংস্কৃতির মধ্যে লোকনৃত্যের যে ধারাটি, সেই ধারার একটি জনপ্রিয় নৃত্যকলা হল খেমটা নাচ (Khemta Dance)। বাংলার লোকনৃত্যের একটি ধারার অন্তর্ভুক্ত হলেও খেমটা নাচ পরবর্তীকালে বিশেষত উনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতার অভিজাত ও জমিদার সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত আমোদ-প্রমোদের বিনোদন-মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মূলত পৌরাণিক রাধা-কৃষ্ণের কাহিনি গানের মাধ্যমে পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে এই খেমটা নাচ করা হত, অবশ্য পরবর্তীতে অনেক অশ্লীলতা এইসব গানে প্রবেশ করে। খেমটা নাচও সমাজের চোখে খুবই ঘৃণ্য হয়ে ওঠে। খেমটা নর্তক বা নর্তকীদের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি এবং যৌন-আবেদন এই নাচের এক অপরিহার্য অঙ্গ ছিল। দুর্গাপূজা, দোল উৎসবে খেমটা নাচ খুব দেখা যেত, এছাড়াও কোনও অভিজাত ব্যক্তির পারিবারিক অনুষ্ঠানেও এই খেমটা নাচের আয়োজন করা হত। বাঈজীদের নৃত্যের তুলনাতেও খেমটা নাচকে নীচু চোখে দেখা হত। খেমটা নাচকে ভদ্রসমাজ পরিশীলিত রুচির গন্ডি থেকে দূরে রেখেছিল এবং নিজেদের বাসনা চরিতার্থতার একটা উপায় হিসেবেই ব্যবহার করেছিল।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে খেমটা নামে একটি তালের অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। কখনও কখনও এই তালকে দাদরা তালের একটি রূপ হিসেবে মনে করা হয়। যদিও উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই তালটিকে প্রামাণিক তালের মধ্যে গণ্য করা হত না। তবে এই বঙ্গদেশে অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে নয় বরং জনসাধারণের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল এই তাল। এই খেমটা তাল থেকেই এই খেমটা নৃত্যশৈলীর উদ্ভব বলে মনে করা হয়।
১৮৪৭ সালের দিকে ওড়িয়া একজন ফেরিওয়ালা গোপাল উড়ে সেই সময়ে এক যাত্রাদল গঠন করেন এবং বিদ্যাসুন্দর পালার জন্য জনপ্রিয় হয়েছিলেন। একজন বিত্তশালী সঙ্গীত-উৎসাহী রাধামোহন সরকারই গোপাল উড়েকে আবিষ্কার করেছিলেন। রাধামোহনের সঙ্গীত শিক্ষক হরিকিষাণ মিত্রের কাছে গোপাল উড়ে কন্ঠসঙ্গীত বিশেষ করে ঠুমরি অধ্যয়ন করেছিলেন।
মনে করা হয়, কেশে ধোবা (ধোপা) নামের একজনের হাত ধরেই গোপাল উড়ের দলে খেমটা নাচের প্রচলন হয়েছিল। কেশে ধোবা নাকি এই নৃত্যশৈলী চুঁচুড়াতে দেখেছিলেন এবং সেখান থেকে এটিকে কলকাতায় এনেছিলেন। তবে এই বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না কিছু।
১৮৪০ সালের আগেই বাংলায় খেমটা নাচ জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে গোপাল উড়ের গান খেমটা এবং আড় খেমটাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ১৮৫০ এবং ১৮৬০-এর দশকে অধিকাংশ গান এই দুই তালেই বাঁধা হতে থাকে। এমনকি বিনোদনমূলক যেসব রচনা, যাতে সংলাপ এবং এই ধরনের গানের মিশেল থাকত, সেগুলির মধ্যে বিভিন্ন লঘু অশ্লীলতার আশ্রয় নেওয়া হতে থাকে। এমনই একটি রচনা হল ‘রাঁড়, ভাঁড়, মিথ্যা কথা/ তিনে লয়ে কলকাতা’। এছাড়াও ‘মোহন মনোহর’-এর মত সেই সময়ের রচনাগুলিতেও এই খেমটা এবং আড় খেমটা তালের গান ছিল ভরপুর।
বিদ্যাসুন্দর পালায় খেমটা নর্তকীদের কথা থেকে জানা যায় যে, কেবল মেয়েরা নয়, কখনও কখনও যুবা পুরুষরাও মহিলা সেজে নাট্যানুষ্ঠানে খেমটা নাচ নাচতেন। সেই মেয়েলি পুরুষদের অনেকেই নপুংসক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন। বিদ্যাসুন্দর পালার কথা থেকে এও জানা যায় যে, খেমটা নাচ বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে একপ্রকার শৈলীতে নাচা হত। চোখ এবং ভ্রু-এর অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে পায়ের জটিল কলাকৌশল, লাস্যময় দেহভঙ্গি ইত্যাদি খেমটা নাচের প্রধান উপকরণ। রাধা-কৃষ্ণ প্রণয়লীলার পৌরাণিক আখ্যানের সঙ্গেও এই খেমটা নাচ পরিবেশন করা হত। খেমটা নৃত্য সাধারণত দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত হত। আবার কখনও কখনও হয়তো একজন নর্তক বা নর্তকী এসে নেচে যাওয়ার পর সারিতে অপেক্ষারত নর্তকীরা একজন করে এসে নৃত্য করে যেতেন। খেমটা নাচের সঙ্গে খোল-করতাল, তবলা, সারেঙ্গি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রেরও ব্যবহার হত। পরবর্তীকালে হারমোনিয়ামও যুক্ত হয়েছিল। খেমটা নর্তকীদের পোশাকের মধ্যে সাধারণত সুন্দর শাড়ি, চুড়ি, নেকলেস, কানের দুল মাথা জুড়ে গহনা ইত্যাদি লক্ষ করা যেত।
তবে সময় যত এগিয়েছে ততই অশ্লীলতা একে গ্রাস করেছে। রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলাও আর বিশুদ্ধ পবিত্রতার দ্বারা উপস্থাপন করা হত না। বাবুদের ব্যক্তিগত পরিসরে পৌরাণিক কাহিনির মোড়কটুকুও সম্ভবত সরে গিয়েছিল। এই খেমটা নাচই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে নাচনিতে রূপান্তরিত হয়েছে বলে গবেষকেরা মনে করেন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম পেঁচার নকশা’তেও খেমটা নাচের প্রসঙ্গ রয়েছে এবং উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই নাচকে শহরের অভিজাত মহল কীভাবে ব্যবহার করত তারও খুব স্পষ্ট দৃষ্টান্ত সেই উপন্যাসটিতে পাওয়া যায়। সেখানে এমন ছবি রয়েছে, যেখানে দেখা যায় রাস্তার পাশে একটি বাড়িতে খেমটা নৃত্যের মহড়া চলছিল এবং রাস্তা থেকেই নূপুর এবং করতালের শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে এও জানা যায়, শহরের বাবুরা সাধারণত রবিবার তাদের বাগানবাড়িতে খেমটা নাচের আসর বসাতেন এবং দিনটি সেই আমোদ-আহ্লাদেই কাটাতেন। ছেলে, ভাগ্নে, জামাই সমবেতভাবে খেমটা নাচ উপভোগ করতেন। এমনকি বাবুদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নাকি খেমটা নর্তকীকে উলঙ্গ করে নাচতেও বাধ্য করেছিলেন। সুমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো গবেষক এই নাচকে কামোত্তেজক নাচ বলে মনে করেছেন। অতএব বোঝাই যাচ্ছে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিই কেবল নয়, যৌন-আচরণের সরাসরি সংযোগও ছিল। আবার বাবুর ব্যক্তিগত আমোদের জন্য আয়োজিত নাট্যের আসরেও খেমটা নর্তকীদের নাচের অংশ থাকত। অতএব কখনও বাবুদের বাগানবাড়িতে নিছক আমোদের আসরে বা নাট্য ও যাত্রার আসরে খেমটা নাচ দেখা যেত। অবশ্য দুর্গাপূজা, দোলযাত্রা ইত্যাদি উৎসবের সময়তেও খেমটা নাচের আয়োজন করা হত।
অনেকে খেমটা নাচকে শহুরে বাইজীদের নৃত্যের গ্রামীণ সংস্করণ বলেছেন। আসলে বাইজীদের থেকেও খেমটা নর্তকীদের নীচু চোখে দেখা হত। প্রথমত বাইজীরা যেখানে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ঘরানার গান গাইতেন, সেখানে খেমটাওয়ালিদের গান ছিল লঘু অশ্লীলতায় ভরা অস্বস্তিকর গান। এছাড়াও বাইজীরা কেবল সঙ্গীতের মাধ্যমেই বিনোদন দিতেন কিন্তু খেমটা নর্তকীদের গান ও নাচের পাশাপাশি যৌনতার সংযোগের দিকটিও ছিল। এসব কারণের জন্যই স্বীকৃতির দিক দিয়ে অন্তত বাইজীরা খেমটা নর্তকীদের উপরে অবস্থান করতেন।
প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কোথাও কোথাও আজও খেমটা নাচের চল থাকলেও আজ এই নৃত্য-ঘরানা অন্তত শহর থেকে বিলুপ্তই হয়ে গেছে বলা চলে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান