সববাংলায়

বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলন | অ্যান্টি-অ্যাপারথেড মুভমেন্ট

ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্দোলনগুলির মধ্যে একটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলন (Anti-Apartheid Movement)। এই আন্দোলনের সূত্রপাত দক্ষিণ আফ্রিকাতে হলেও তা ক্রমশ যুক্তরাজ্য হয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এক আন্তর্জাতিক আন্দোলনে পরিণত হয়। এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর উপর আরোপিত বৈষম্য, নিপীড়ন, রাজনৈতিক দমন–পীড়ন ও নাগরিক অধিকারবঞ্চনার অবসান ঘটানো। এই আন্দোলন ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, যা গান্ধীজীর অহিংস নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। আর এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে মানুষটির নাম সর্বপ্রথমে আসে তিনি হলেন নেলসন ম্যান্ডেলা (Nelson Mandela)।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলন প্রথম শুরু করেন মূলত ওই দেশের কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা। তাঁরা ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকার ও তাদের বর্ণবৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন।

মূলত ডাচ এবং ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের দক্ষিণ আফ্রিকায় আগমনের ফলে ওই দেশে প্রথম বর্ণবাদের সূচনা হয়। তবে ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত জাতীয় দল (National Party) ক্ষমতায় আসার পর বর্ণবাদ সরকারী নীতিতে পরিণত হয়ে যায়। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বেশিরভাগ জমি শ্বেতাঙ্গদের দখলে ছিল আর আফ্রিকানদের সঙ্কীর্ণ মাতৃভূমিতে (Homeland) সীমাবদ্ধ থাকতে হত, তাদের সম্পত্তি কেনার অনুমতি দেওয়া হত না। আবার অনেক শ্বেতাঙ্গ মানুষ আফ্রিকানদের তাদের বাড়িঘর এবং জমি থেকে তাড়িয়ে দিয়ে ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য করত। ওই নগণ্য মজুরি কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের জীবন নির্বাহের জন্য যথেষ্ট ছিল না। এছাড়া শ্বেতাঙ্গ এলাকার ভিতরে প্রবেশের জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের “পাসবুক” (passbook) বহন বাধ্যতামূলক ছিল—যেখানে কাজ, পরিচয় ও অনুমতির তথ্য উল্লেখ থাকত।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল সুবিধাবঞ্চিত। আবার শ্বেতাঙ্গরা ভাল স্বাস্থ্য পরিষেবার পাশাপাশি সর্বোত্তম শিক্ষাও পেত, যদিও কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হত। ১৯৫৩ সালের বান্টু শিক্ষা আইনের (Bantu Education Act) মাধ্যমে আইনত শিক্ষা ব্যবস্থায় জাতিগত বিচ্ছিন্নতা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের শিক্ষার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল। এছাড়া বর্ণবাদ ব্যবস্থার ফলে আন্তঃজাতিগত বিবাহও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত। এদিকে দুটি ভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহের উপর নিষেধাজ্ঞা জনসংখ্যার উপর বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। তাছাড়া শ্বেতাঙ্গদের পাশাপাশি পুলিশও কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের উপর নির্মম আচরণ করত। এককথায় বলা যায় যে, দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা সবকিছুর উপর কর্তৃত্ব করে নানা সুযোগ-সুবিধা নিজে ভোগ করত। আর ত্বকের রং হিসাবে শ্রেণীবিভাগ করার ফলে জনগণের মধ্যে বৈষম্য এবং ঘৃণার অনুভূতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, যা দক্ষিণ আফ্রিকানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।

১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেস (African National Congress বা ANC) দেশের বেশিরভাগ অ-ইউরোপীয় জনসংখ্যার উপর বর্ণবাদ ব্যবস্থার নিপীড়নের বিরোধিতা করে প্রথম প্রতিবাদ শুরু করে। তবে পরবর্তীকালে এই আন্দোলনে আন্দোলনকারীরা যুক্তরাজ্য থেকে নানা রকমের সাহায্য পেত। ১৯৫৯ সালে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন’ (Anti-Apartheid Movement) নামক সংগঠন যার মধ্যে দিয়ে বর্ণ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন প্রথম সংগঠিত রূপ লাভ করে।

বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় মূলত বয়কট আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। এই আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ১৯৫৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য আন্তর্জাতিকভাবে বয়কটের দাবিতে একটি সভার আয়োজন করেছিল, যেখানে প্রধান বক্তা ছিলেন জুলিয়াস নাইরেরে (Julius Nyerere)। এছাড়া এই সভায় প্রায় ৮ হাজারেরও বেশি মানুষ একত্রিত হয়ে বয়কট আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল। এই বয়কট ছাত্র ট্রেড ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট দলগুলি থেকেও সমর্থন লাভ করেছিল। এরপর যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য কিনতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন আশা করা হয়েছিল যে এই আন্দোলন অনেক বেশি তীব্র হবে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ অর্থনীতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তারা বয়কট আন্দোলনকে অসমর্থন করে, আর এই কারণেই বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নীতিগুলিকে ব্রিটেনের সরকার ক্রমশ বাধা দিতে থাকে। তবে নানারকম বাধা সত্বেও এই বয়কট আন্দোলনই ক্রমশ সুসংগঠিত বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার কর্তৃক প্রণীত পাস আইনের বিরুদ্ধে ১৯৬০ সালের ২১শে মার্চ শার্পভিলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পুলিশের গুলি চালনায় ৬৯ জন নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী মৃত্যু হয় ও ২৩৮ জন আহত হন, এই ঘটনা শার্পভিল গণহত্যা (Sharpeville massacre) নামে পরিচিত। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয় ও সমগ্র বিশ্বে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে। শার্পভিলের ঘটনার পর সরকার ANC-কে নিষিদ্ধ করে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু হয়। এ সময়ই আন্দোলনের একটি অংশ, যেমন ANC-এর সশস্ত্র শাখা উম্‌খোন্তো বে সিজবে (Umkhonto we Sizwe), সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করে।

এরপর, বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীরা পণ্য বর্জনের পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্পকলা এবং শিক্ষাক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার আহ্বান জানায়। ১৯৬১ সালে চাপের মুখে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কমনওয়েলথ গেমস ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীদের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ জয় হিসেবে মনে করা হয়। এই সময় দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দল আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসকে তৎকালীন সরকার নিষিদ্ধ করে। এরপর ১৯৬২ সালে সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে সাহায্য করা ও শ্রমিক ধর্মঘটে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে নেলসন ম্যান্ডেলাকে গ্রেপ্তার করা হয় যা তাঁর ২৭ বছরের দীর্ঘ কারাবাসের সূচনা করেছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা ছাড়াও এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ভেলা পিলে (Vella Pillay) , আব্দুল মিন্টি (Abdul Minty) প্রমুখ ব্যক্তি। এছাড়া মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহ নীতি বিশ্বজুড়ে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

এরপর ১৯৬৩ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আংশিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে জাতিসংঘ অন্যান্য দেশকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে যেকোনো ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক যান বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ করার আহ্বান জানায়।

বিভিন্ন সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনকারীরা ইংল্যান্ড থেকে নানা সাহায্য পেলেও ১৯৬৪ সালের ইংল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনের জন্য বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন এক নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত হয়। তবে নির্বাচনে লেবার পার্টির জয়ের পর বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার আর থাকে না। যদিও ১৯৭০-এর দশক ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ একটি দশক। ১৯৭০ সালে বর্ণবাদের সহায়তা করার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে অলিম্পিক থেকে বহিষ্কার করা হয়। ওই দশকের গোড়ার দিকে প্রচুর সংখ্যক বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি কিছু বন্দীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। ১৯৭৭ সালে স্টিভ বিকো (Steve Biko) নামক এক প্রতিবাদীকে পুলিশি হেফাজতে হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ শুরু হয়। এছাড়া ১৯৭৯ সালে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সলোমন মাহলাঙ্গুকে (Solomon Mahalangu) ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

ক্রমশ নিজের দেশে ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোণঠাসা হয়ে ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি এফডব্লিউ ডি ক্লার্ক (F.W.de Klerk) সব রাজনৈতিক দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার মধ্যে দিয়ে বর্ণ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের অবসানের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি বর্ণবাদ সমর্থনকারী সকল আইন বাতিল করে দেন। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের জন্য আলোচনার পথ উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৩ সালে একটি নতুন সংবিধান গৃহীত হয়, যা কৃষ্ণাঙ্গসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগুলিকে ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেস জয় লাভ করে। এই নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠিত হওয়ার পর দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার এই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে সমস্ত জাতি ভোট দিতে পেরেছিল, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় দৃষ্টান্ত হয়ে রয়ে গেছে। এই নির্বাচনের পর যুক্তরাজ্যের বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নাম পরিবর্তিত করে রাখা হয় অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা ( Action for Southern Africa)। পরবর্তীকালে এই সংস্থাটি দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে সহযোগিতা ও সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

১৯৯৪ সালে সরকার গঠনের পর আইন প্রণয়ন করে বর্ণবাদ বিলুপ্ত করা হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণবাদের প্রভাব এখনও বিদ্যমান। নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সমগ্র বিশ্বে জনপ্রিয় নেতা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য বিরোধী একটি বহুজাতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নেলসন ম্যান্ডেলা ও এফডব্লিউ ডি ক্লার্ককে ১৯৯৩ সালে নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রদান করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading