হুমায়ুন আহমেদ

হুমায়ুন আহমেদ

বাংলাদেশের এক অতি জনপ্রিয় এবং খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক তথা চলচ্চিত্র-নির্মাতা হলেন হুমায়ুন আহমেদ (Huamyun Ahmed)। এখনও পর্যন্ত তাঁকেই বাংলা ভাষার রচনাকারদের মধ্যে সর্বাধিক ধনী লেখক বলে মনে করা হয়। তাঁর লেখা এমন কোনো উপন্যাস নেই যা বাংলাদেশের কোনো তরুণ-তরুণী বা কিশোর-কিশোরীরা পড়েননি। বাংলাদেশের সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরে হুমায়ুন আহমেদকেই সবথেকে বেশি রচনা সবথেকে বেশি খ্যাতির দাবিদার বলে থাকেন সকলে। ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস দিয়ে তাঁর লেখকজীবনের যাত্রাপথ শুরু হয়। তারপর দুশোটিরও বেশি উপন্যাস লেখা হয়ে গেছে তাঁর। হাজারখানেক ছোটোগল্প, বহু চিত্রনাট্য এবং থিয়েটার মঞ্চের জন্য বহু নাটকও লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ। মৃত্যুর পরেও তিনিই একমাত্র বাংলাদেশের বেস্টসেলার লেখক। ১৯৮১ সালে তাঁকে ‘বাংলা অ্যাকাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় এবং বাংলা সাহিত্যে বিরাট অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘একুশে পদক’-এর সম্মান। তাঁর নিজের লেখা কাহিনীর উপর ভিত্তি করেই মোট আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন হুমায়ুন আহমেদ। ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রের জন্য বিভিন্ন শ্রেণিতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলায় নেত্রকোণা মহকুমার অন্তর্গত কুতুবপুর গ্রামে হুমায়ুন আহমেদের জন্ম হয়। বর্তমানে এই জায়গাটি নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার অন্তর্গত। তাঁর বাবা ফয়েজুর রহমান আহমেদ পীরোজপুর জেলায় সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার ছিলেন এবং তাঁর মা আয়েশা ফয়েজ ছিলেন গৃহকর্ত্রী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা মারা যান। হুমায়ুন আহমেদের এক ভাই মহম্মদ জাফর ইকবালও একজন খ্যাতনাম কল্পবিজ্ঞান কাহিনীর লেখক ও শিক্ষাবিদ এবং আরেক ভাই আহসান হাবিব পেশায় ব্যঙ্গচিত্রী। তাঁর তিন বোনের নাম যথাক্রমে সুফিয়া হায়দার, মমতাজ সাহিদ এবং রুখসানা আহমেদ। হুমায়ুনের ডাকনাম ছিল কাজল। শৈশবে তাঁর বাবার বদলির চাকরির কারণে বাংলাদেশের শ্রীহট্ট, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বগরা, দিনাজপুর, পঞ্চগড় প্রভৃতি নানা জায়গায় থেকেছেন হুমায়ুন। শোনা যায়, তাঁর বাবা পুলিশের চাকরি করলেও আদপে এক খেয়ালি মানুষ ছিলেন। হুমায়ুনের শৈশবের অনেকটাই তাঁর দাদু-দিদার কাছে কেটেছে। বদলির চাকরির কারণে দিনাজপুরের জগদ্দলে এসে কিছুদিন ছিলেন হুমায়ুন আর এই জায়গাটাই তাঁর সবথেকে বেশি ভালো লাগতো। জগদ্দলের জঙ্গল, নদী এ সবই তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

দিনাজপুরের জগদ্দলে থাকাকালীনই সেখানকার স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হন হুমায়ুন আহমেদ। পড়াশোনার প্রতি তখনও প্রবল অমনযোগী ছিলেন তিনি। তার পর চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হন তিনি এবং পুনরায় বদলির কারণে বগরা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হুমায়ুন আহমেদ। তারপর ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্র বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

স্নাতকোত্তর পাশ করার পরে প্রথমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার পদে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন হুমায়ুন আহমেদ এবং পরবর্তীকালে অধ্যাপনার সূত্রে নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার কেমিস্ট্রি বিষয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি অর্জন করেন তিনি। গবেষণা শেষ করে দেশে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনায় যোগ দেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বাবা মারা গেলে প্রবল আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েন তিনি। বাবার সঞ্চিত সম্পদ প্রায় কিছুই ছিল না। পুলিশ প্রশাসনের অধিকর্তার তরফ থেকে হুমায়ুন আহমেদের মাকে জানানো হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটা বাড়ি দেওয়া হবে এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মহম্মদপুরের বাবর রোডে তাঁদের একটি বাড়ি ও মোটা অঙ্কের টাকার একটি চেক দেওয়া হয় সরকারি তরফে। সেখানেই কোনোমতে থাকতেন হুমায়ুন আর তাঁর ভাই-বোনেরা। তখনো চাকরি পাননি হুমায়ুন আহমেদ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়েই তিনি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। তখনও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিখ্যাত লেখক আহমেদ ছফার আনুকূল্যে সেই বইটি ১৯৭২ সালে প্রকাশ পায়। কিন্তু বই প্রকাশ পেলেও বইয়ের বিক্রি সেভাবে না থাকায় প্রকাশক কিছুতেই রয়্যালটি দিতে চাননি। বাংলাদেশের সাহিত্য-অঙ্গনে নবাগত হুমায়ুন আহমেদের লেখা কেই বা পড়বেন! এর পরে দ্বিতীয় উপন্যাসও তাঁর লেখা হয়ে যায় ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নামে। প্রথম উপন্যাস থেকেই দেখা যায় হুমায়ুন আহমেদের লেখায় ফুটে উঠতো গড়পড়তা শহুরে মধ্যবিত্তদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের খতিয়ান। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করার সময় ক্লাসের ফাঁকে তিনি চলে যেতেন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার অফিসে। পত্রিকার সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরীর অনুরোধে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যার জন্য প্রথম ফরমায়েশি লেখা শুরু করেন হুমায়ুন আহমেদ। সেই সংখ্যায় তিনি লিখেছিলেন ‘অচিনপুর’ নামে একটি উপন্যাস আর সম্মান-দক্ষিণা বাবদ পেয়েছিলেন ৩৫০ টাকা। এর সঙ্গেই তাঁর প্রকাশিত দুটি উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ এবং ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এর রয়্যালটি বাবদ ৪০০ টাকা হুমায়ুন আহমেদকে দিয়েছিলেন প্রকাশক। রচনাকালের দিক থেকে হুমায়ুন আহমেদের লেখা প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং তার পরেই তিনি ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। এরপর থেকে নিয়মিত উপন্যাস লেখার অনুরোধ আসতে থাকে তাঁর কাছে। এরপর একে একে হুমায়ুন লিখে ফেলেন ‘আমার আছে জল’ (১৯৮৫), ‘ফেরা’ (১৯৮৬), ‘প্রিয়তমেষু’ (১৯৮৮), ‘ফেরা’ (১৯৮৬), ‘আকাশজোড়া মেঘ’ (১৯৮৮), ‘এইসব দিনরাত্রি’ (১৯৯০), ‘অন্ধকারের গান’ (১৯৯০), ‘বহুব্রীহি’ (১৯৯০) ইত্যাদি বিখ্যাত সব উপন্যাস।

উপন্যাস লেখার পাশাপাশি নওয়াজিশ আলি খানের অনুরোধে তিনি টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখতে শুরু করেন। তাঁর লেখা প্রথম টেলিভিশন নাটক হল ‘প্রথম প্রহর’ যা ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর লেখা ‘বহুব্রীহি’ উপন্যাস অবলম্বনে নওয়াজিশ আলি খানের প্রযোজনায় হুমায়ুন আহমেদ টেলিভিশনের জন্য নির্মাণ করেন প্রথম ধারাবাহিক। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছিলেন হুমায়ুন আহমেদ যার মধ্যে ‘সৌরভ’ (১৯৮৪), ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৮৬), ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (১৯৯২), ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ (২০০৪), ‘দেয়াল’ (২০১৩) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এরপরে বেশ কিছু চরিত্রভিত্তিক আখ্যানও নির্মাণও করেছেন তিনি। ‘হিমু’ হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টি একটি স্মরণীয় চরিত্র। এই হিমুকে নিয়ে তিনি মোট ২১টি উপন্যাস লিখেছেন। তাছাড়া রয়েছে মিসির আলি এবং শুভ্র। মিসির আলি এক শখের গোয়েন্দা যাকে নিয়ে লেখা হয়েছে ২০টি উপন্যাস এবং শুভ্রকে কেন্দ্র করে ৬টি উপন্যাস লিখেছেন হুমায়ুন আহমেদ। এই চরিত্রগুলি ছাড়া বাকের ভাই, টুনি এদের অবলম্বনেও মাঝেমধ্যে কিছু কিছু কাহিনী রচনা করেছেন তিনি। হিমুকে নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ময়ূরাক্ষী’ প্রকাশ পায় ১৯৯০ সালে। মিসির আলিকে কেন্দ্র করে লেখা ‘দেবী’, ‘নিশীথিনী’, ‘অন্য ভুবন’, ‘বৃহন্নলা’, ‘ভয়’ ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয় ও বহুচর্চিত কাহিনী। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগতেও তিনি ছিলেন অনন্য। ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি’, ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’, ‘কুহক’, ‘শূন্য’ ইত্যাদি কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাসে বাংলাদেশের সাহিত্যে তিনি নতুন দিশার উন্মোচন ঘটান। হুমায়ুন আহমেদের লেখা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’, ‘তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে’ এইসব রোমান্টিক উপন্যাসগুলি আপামর বাঙালি তরুণ-তরুণীর কাছে খুব প্রিয়। শিশুসাহিত্যেও তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ।

টেলিভিশন ও ফিল্মের দুনিয়ায় পরপর বেশ কিছু ধারাবাহিক নাটক পরিচালনা করেন হুমায়ুন আহমেদ যার মধ্যে ‘আজ রবিবার’ (১৯৯৯), ‘নক্ষত্রের রাত’ (১৯৯৬), ‘কোথাও কেউ নেই’ (১৯৯০) ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল এবং দর্শক আনকূল্য লাভ করেছিল। তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘আগুনের পরশমণি’ (১৯৯৪) ১৯তম বাংলাদেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এছাড়াও তাঁর পরিচালিত শ্যামল ছায়া ও ঘেটুপুত্র কমলা নামের ছবি দুটি যথাক্রমে ২০০৬ ও ২০১২ সালে ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফর দ্য বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম’ পুরস্কারে ভূষিত হয়। বলাই বাহুল্য টেলিভিশন ধারাবাহিক হোক, নাটকই হোক বা পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র হুমায়ুন আহমেদ সর্বদা নিজের লেখা কাহিনীকেই বেছে নিতেন। সেইসব চলচ্চিত্রের জন্য বা ধারাবাহিকের জন্য গানও লিখতেন তিনি নিজে। উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতের প্রভূত প্রভাব লক্ষ করা যায় তাঁর গানে। প্রায় ৪০টিরও বেশি গান লিখেছেন তিনি।

১৯৮৭ সালে বাংলাদেশের গাজীপুর জেলায় পীরজুয়ালি গ্রামে হুমায়ুন আহমেদ তাঁর পুত্র নুহাশের নামে একটি বিরাট এস্টেট গড়ে তোলেন যার নাম দেন তিনি ‘নুহাশ পল্লী’। এছাড়াও জানা যায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপে তিনি একটি বাড়িও নির্মাণ করেছিলেন।

১৯৮১ সালে তাঁকে ‘বাংলা অ্যাকাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয় এবং বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে তাঁকে দেওয়া হয় ‘একুশে পদক’-এর সম্মান। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরো অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন হুমায়ুন আহমেদ।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই কোলন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যু হয়।

আপনার মতামত জানান