খেলা

মেরি ডিসুজা

অলিম্পিকের ট্র্যাক অ্যাণ্ড ফিল্ড প্রতিযোগিতায় এবং ফিল্ড হকিতে অংশগ্রহণকারী প্রথম ভারতীয় মহিলা মেরি ডিসুজা সেকুইরা (Mary D’Souza Sequeira)। তবে শুধু হকিই নয়, ১৯৫২ সালে ফিনল্যাণ্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে আয়োজিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে একশো মিটার ও দুশো মিটার দৌড়ে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন মেরি ডিসুজা। নিউ দিল্লিতে আয়োজিত ভারতের প্রথম এশিয়ান গেমসে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৪ × ১০০ মিটার রিলে দৌড় এবং ২০০ মিটার দৌড়ে যথাক্রমে রৌপ্য পদক এবং ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন তিনি। তাছাড়া ১৯৫৪ সালের এশিয়ান গেমসে তিনিই ছিলেন স্বর্ণপদকজয়ী প্রথম ভারতীয় মহিলা অ্যাথলিট। হকিতে তিনি পেয়েছেন দেশের প্রথম মহিলা ডাবল্‌স ইন্টারন্যাশনালের সম্মান। ২০১৩ সালে ক্রীড়াক্ষেত্রে দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য ভারত সরকার ধ্যানচাঁদ পুরস্কারে ভূষিত করে মেরি ডিসুজাকে।

১৯৩১ সালের ১৮ জুলাই বম্বের (অধুনা মুম্বাই) বান্দ্রায় মেরি ডিসুজা সেকুইরার জন্ম হয়। তাঁর বাবা-মা উভয়েই খুবই পরিশ্রমী ছিলেন। বারোটি সন্তানের অন্নসংস্থানের জন্য তাঁর বাবাকে ওভার-টাইম খাটতে হতো আর অন্যদিকে তাঁর মা দিনের বেশিরভাগ সময়টাই ব্যস্ত থাকতেন রান্নায় এবং ঘরকন্নার কাজে। মধ্যবিত্ত পরিবারে বারোটি ভাইবোনের সঙ্গে বড়ো হওয়ায় ছোটোবেলায় খেলাধূলার চর্চা তাঁর কাছে বিলাসিতা ছিল। কিন্তু খেলার প্রতি প্রবল ইচ্ছা তিনি নিজের অন্তরে পোষণ করে চলেছেন সবসময়। তাছাড়া সেসময় ক্রীড়াক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই দুঃসাধ্য ছিল।

সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট গার্লস স্কুলে মেরি ডিসুজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। সেই স্কুলে তখন খেলাধূলার বিশেষ পরিসর ছিল না। খেলা বলতে ঐ স্কুলে বস্তা দৌড়, ব্যাঙ দৌড় বা বুক ব্যালান্সিং ইত্যাদির প্রচলন ছিল। মেরি তাঁর ভাইদের কাছ থেকে প্রথম হকি খেলা শেখেন এবং তাতে উৎসাহিত হয়ে তিনি পুরোপুরি হকি শেখার জন্য স্থানীয় ‘সুবারব্যানেলেস’ নামের একটি হকি দলে খেলতে শুরু করেন। এমিলি ডিসুজার সহায়তায় তিনি ঐ দলে সুযোগ পান এবং মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের প্রতিযোগিতাগুলিতে ছেলেদের সঙ্গেই হকি খেলতে শুরু করেন মেরি। এইরকম হকি খেলতে খেলতে মেরির খুড়তুতো ভাই একদিন লক্ষ করেন যে তাঁর দৌড়োনোর গতি অসম্ভব ভালো এবং তারপর স্থানীয় একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় মেরি নাম নথিভুক্ত করে দেয় তাঁর সেই ভাই। শুরু হয় দৌড়োনোর অভ্যাস। প্রায়দিনই স্কুল থেকে পালিয়ে মেরি সেন্ট অ্যাণ্ড্রুজ রয়েজ স্কুলের পাঁচিল টপকে ট্র্যাকে চলে আসতেন দৌড় অভ্যাসের জন্য।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


মেরি ডিসুজার পেশাদারি ক্রীড়াজীবন শুরু হয় ১৯৫১ সালের দিল্লি এশিয়ান গেমসের মধ্য দিয়ে। সেটা ছিল দিল্লিতে আয়োজিত প্রথম এশিয়ান গেমস। এই প্রতিযোগিতায় ৪ ১০০ মিটার রিলে দৌড়ে রৌপ্য পদক এবং ২০০ মিটার দৌড়ে তিনি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। এশিয়ান গেমসে সে বছরই প্রথম কোনো ভারতীয় মহিলা দল যোগ দেয়। এরপর তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ এবং প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মেরি ডিসুজার, ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ এশিয়ান গেমসের সেই মহিলা-দলকে সম্মাননা জ্ঞাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে মেরি জানিয়েছেন, সেই এশিয়ান গেমসে জয়লাভ করার পরে পুরস্কারের কোনো অর্থমূল্য পাননি তিনি, এমনকি তাঁকে ঘিরে কোনো অভ্যর্ত্থনা সভাও আয়োজিত হয়নি। প্রাপ্তি বলতে নেহেরুর সই করা একটি ছবি এবং লেডি মাউন্টব্যাটেনের একটি ছবি পেয়েছিলেন মেরি ডিসুজা। এশিয়ান গেমসে নির্বাচিত হওয়ার পরে ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে জয় পর্দিওয়ালা তাঁকে অন্য রিলে-প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ দিতেন। তার আগে কোনো প্রকার প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছিল না তাঁর। এরপর ১৯৫২ সালেই মাদ্রাজে জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ২০০ মিটার দৌড় এবং ১০০ মিটার দৌড়ে নতুন রেকর্ড গড়েন মেরি আর তার ফলেই ঐ বছর হেলসিঙ্কিতে আয়োজিত অলিম্পিকে যোগদানের জন্য নির্বাচিত হন মেরি ডিসুজা সেকুইরা। অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত দলকে প্রথমে হিমাচল প্রদেশের কসৌলিতে পাঠানো হয় প্রশিক্ষণের জন্য। কসৌলির মিলিটারি বেসে শীতের মধ্যে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল হেলসিঙ্কির পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা। কিন্তু শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই চলবে না, অর্থের আশু প্রয়োজন। হেলসিঙ্কিতে থাকা, যাতায়াত ইত্যাদির জন্য অর্থের সংকুলান করা মেরির পক্ষে অসম্ভব ছিল। সব মিলিয়ে প্রায় হাজার পাঁচেক টাকার দরকার ছিল। সেই সময় সেন্ট জোসেফ স্কুলেই ক্রীড়া-শিক্ষক হিসেবে কাজ করার দরুণ মাসিক আশি টাকা বেতন পেতেন মেরি যার মধ্যে সত্তর টাকাই সংসারে মায়ের হাতে তুলে দিতেন মেরি। ফলে দেশের হয়ে অলিম্পিকে যোগদানের জন্য নির্বাচিত হতে পারা যেমন তাঁর কাছে বা তাঁর পরিবারের কাছে অত্যন্ত গর্বের ছিল, অন্যদিকে অলিম্পিকে পাঠানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য ছিল না তাঁর পরিবারের। আর সেসময় বম্বের মুখ্যমন্ত্রী মোরারজি দেশাই খাশাবা যাদব বা মেরি ডিসুজা কারো জন্যেই অলিম্পিক-যাত্রার অর্থকরী সাহায্য দিতে পারেননি। কিন্তু পরে ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য ভারত সরকারের তরফে অর্থ-সাহায্য পাওয়া যায় আর মেরির অলিম্পিকে যোগদান বাস্তবায়িত হয় অবশেষে। কোপেনহেগেনে ভারতীয় মহিলা দলের দশ দিনের একটা প্রশিক্ষণ চলে। মাত্র একুশ বছর বয়সে অলিম্পিকের ট্র্যাকে পা রাখলেন মেরি। মাত্র ১৩.১ সেকেণ্ডে ১০০ মিটার দৌড় এবং ২৬.৩ সেকেণ্ডে ২০০ মিটার দৌড় শেষ করেন মেরি ডিসুজা, যদিও অন্যান্য অ্যাথলিটদের তুলনায় এই সময় অনেকটাই বেশি ছিল। এরপরে দেশে ফিরে আসেন মেরি। কিন্তু তাঁর দৌড় থামে না। ১৯৫৪ সালে ম্যানিলায় দ্বিতীয় এশিয়ান গেমস আয়োজিত হলে যোগ দেন মেরি এবং ৪ ১০০ মিটার রিলে দৌড়ে স্বর্ণপদক লাভ করেন মেরি। সেটাই ছিল প্রথম কোনো ভারতীয় মহিলার স্বর্ণপদক জয়ের স্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৭ সালের মধ্যে ১০০ মিটার, ২০০ মিটার সাধারণ দৌড় এবং ৮০ মিটার হার্ডলসে তিনি পরপর রেকর্ড গড়েছেন। ইতিমধ্যে ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিক এসে গেল। সেই সময় তিনি অস্ট্রেলিয়াতেই ছিলেন, সিডনিতে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড কাপ ফিল্ড হকি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। একজন ট্র্যাক অ্যাণ্ড ফিল্ড অলিম্পিয়ানকে হকির মাঠে দেখে অনেকেই স্তম্ভিত হয়েছিলেন এবং সাংবাদিকরা তাঁকে পুনরায় ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে দেখতে চান। কিন্তু শুধুমাত্র ভারতীয় আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চক্রান্তে অলিম্পিকে যোগ দিতে পারেননি মেরি ডিসুজা। ল্যাভি পিন্টো, ভায়োলেট পিটারস, ম্যারি লীলা রাও সহ আরো অনেককে নিয়ে ট্রেনে করে তাঁরা অলিম্পিকে যোগদানের উদ্দেশ্যে প্রথমে সেজোশ্লোভাকিয়াতে যান এবং সেখান থেকে লণ্ডনে যান প্রশিক্ষণের জন্য। সেখানে ভারতীয় দলের ব্যবস্থাপক তাঁকে বলেন যে, সেই বছর কোনো ভারতীয় মহিলা দলকে মেলবোর্ন অলিম্পিকে যোগ দিতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু মেরি ফিরলেন না লণ্ডন থেকে। অন্যদিকে ম্যারি লীলা রাও তাঁর বাবার নির্দেশ ফিরে গেলেন এবং মেরি ডিসুজার অনুপস্থিতিতে ম্যারি লীলা রাওকেই একমাত্র মহিলা অ্যাথলিট হিসেবে পাঠানো হয় মেলবোর্ন অলিম্পিকে। লীলা রাওয়ের বাবা ছিলেন প্রভাবশালী অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান। অনেকগুলি এশিয়ান রেকর্ড, জাতীয় রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও মেরির অলিম্পিকে যোগ দেওয়া হল না সেবার। এদিকে লণ্ডনে কোনো টিভি না থাকায় ভারতের খবর পাচ্ছিলেন না তিনি, ভারতীয় দলের ব্যবস্থাপক তাঁকে সম্পূর্ণ মিথ্যে বলেছিলেন।

১৯৬৩ সালে ইউরোপে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ওমেন্স ফিল্ড হকি ওয়ার্ল্ড টুর্নামেন্ট-এ যোগ দেন মেরি ডিসুজা। দুইবার অলিম্পিকে যোগদানের স্বপ্নপূরণ না হলেও মেরি ১৯৬১ সালে প্রাইম মিনিস্টারস ডিফেন্স ফাণ্ড ফিল্ড হকি ট্যুরে অংশ নেন এবং ভারত বনাম শ্রীলঙ্কা আর ভারত বনাম জাপান হকি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ভারতীয় রেলওয়ের ক্রীড়া-অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন মেরি যার তত্ত্বাবধানে ভারতীয় রেলের দলে খেলোয়াড় এবং দক্ষ অ্যাথলিটরা যোগ দিতেন এবং তাঁরই পরিচালনায় রেলওয়ে টুর্নামেন্ট আয়োজিত হতো। গার্ল গাইড হিসাবে তিনি জেলা কমিশনারের পদেও কাজ করেছিলেন। তাঁর কন্যা ম্যারিসা সেকুইরা সম্পূর্ণ বিশদ বিবরণ সহ মেরি ডিসুজার জীবনী লিখেছেন ‘ইউ কান্ট ইট ইয়োর ফেম’ নামে।

২০১৩ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তিনি ধ্যানচাঁদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

বর্তমানে ৯০ বছর বয়সে আধুনিক অ্যাথলিটদের অনুপ্রাণিত করে চলেছেন মেরি ডিসুজা সেকুইরা।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও