রাজা রবি বর্মা

রাজা রবি বর্মা

ভারতীয় চিত্রশিল্পের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন চিত্রশিল্পী রাজা রবি বর্মা (Raja Ravi Varma)। মূলত পৌরাণিক কাহিনী এবং রামায়ণ, মহাভারতের মত ভারতীয় আদি মহাকাব্যকে ঘিরেই তাঁর চিত্রকর্মের প্রেক্ষাপট রচিত হত। ইউরোপীয় চিত্রশিল্প ধারার কৌশলের সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী কৌশলের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন রাজা রবি বর্মা। তাঁর দক্ষতা ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের কারণে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় চিত্রকলার রীতি। তাঁর ছবিতে প্রায়ই উঠে আসে দক্ষিণ ভারতীয় নারীর অতুলনীয় সৌন্দর্য। ভারতের নিম্নবর্ণের বহু মানুষের কাছে রবি বর্মার আঁকা দেব-দেবীর ছবিই মূর্তিসম আরাধ্য হয়ে উঠেছিল। মন্দিরে প্রবেশের অধিকার ছিল না যে সম্প্রদায়ের মানুষের, তাদের কাছে রবি বর্মার এই ছবিগুলিই ঈশ্বরের প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছিল। ভারতবাসীর শৈল্পিক জ্ঞান বৃদ্ধিতে এবং শিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে ভারতবাসীকে সচেতন করে তুলতে তাঁর অবদান কম নয়। সাশ্রয়ী লিথোগ্রাফ যন্ত্র তৈরির মধ্য দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও শিল্পকে সহজসাধ্য করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয়তা ও শৈল্পিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ভারতের তৎকালীন ভাইসর‍য় লর্ড কার্জন রাজা রবি বর্মাকে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদকে সম্মানিত করেন।

১৮৪৮ সালের ২৯ এপ্রিল দেশীয় রাজন্যবর্গ শাসিত রাজ্য ত্রিবাঙ্কুরের (অধুনা কেরালা) কিলিমান্নুর প্রাসাদে কোয়েল থাম্পুরান নামে এক অভিজাত পরিবারে রাজা রবি বর্মার জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মহারাজা রাজ্যশ্রী রবি বর্মা। তাঁর বাবার নাম ছিল এজুমাভিল নীলাকান্থান ভট্টাত্রিপাদ এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল উমা অম্বাবাঈ থাম্পুরাত্তি। প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর পরিবারের পুরুষদের সঙ্গে ত্রিবাঙ্কুরের রাজ পরিবারের মেয়েদের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে আসছে। রবি বর্মার মা-ও ছিলেন ত্রিবাঙ্কুরের রাজ পরিবারের কন্যা। ভারতের ভাইসরয় তথা গভর্নর জেনারেল তাঁদের এই ‘রাজা’ উপাধিটি দিয়েছিলেন। তাঁর মা কিছু কবিতাও লিখেছিলেন, তাঁর লেখা একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘পার্বতী স্বয়ম্বরম’ পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশ করেছিলেন রাজা রবি বর্মা। তাঁর বাবা ছিলেন সংস্কৃত ও আয়ুর্বেদশাস্ত্রের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল কেরালার এর্নাকুলামে। রবি বর্মার এক বোন মঙ্গলা বাঈ এবং এক ভাই রাজা বর্মা। তাঁর ভাইও পরবর্তীকালে একজন চিত্রশিল্পী হন এবং রবি বর্মার সঙ্গে আজীবন তিনি কাজ করে গিয়েছেন। ১৮৬৬ সালে ১৮ বছর বয়সে রাজা রবি বর্মা ত্রিবাঙ্কুরের মাভেলিক্কার রাজপরিবারের দ্বাদশ বর্ষীয়া কন্যা নাল ভাগীরথী বাঈকে বিবাহ করেন। ভাগীরথীর সঙ্গে বিবাহের ফলে রাজ-পরিবারের সঙ্গে রবি বর্মার সংযোগ আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। তাঁদের দুই পুত্র ও তিন কন্যা জন্ম নেয়। তাঁদের বড় ছেলে কেরালা বর্মা কোনওদিনও বিবাহ করেননি এবং ১৯১২ সালে তিনি ঘর ছেড়ে চলে যান আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য। অন্যদিকে রবি বর্মার ছোট ছেলে রাম বর্মা বাবার মতই শৈল্পিক দক্ষতা লাভ করেছিলেন এবং মুম্বাইয়ের জে জে স্কুল অফ আর্টসে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। পরে গৌরী কুঞ্জাম্মার সঙ্গে বিবাহের পর তাঁদের সাত সন্তানের জন্ম হয়। রবি বর্মা এবং ভাগীরথী বাঈয়ের তিন কন্যার নাম যথাক্রমে মহাপ্রভা আম্মা, উমা আম্মা এবং চেরিয়া কোচাম্মা। পরবর্তীকালে রাজা রবি বর্মার দুই নাতনিকে ত্রিবাঙ্কুরের রাজ পরিবার দত্তক নিয়েছিল এবং আত্তিঙ্গালের বড় রানি ও ছোট রানির পদে বসিয়েছিল।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে রাজা রবি বর্মা ত্রিবাঙ্কুরের আয়িলিয়াম থিরুনাল মহারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় চিত্রকলার পাঠ গ্রহণ করতে শুরু করেন। মাদুরাইতে থাকার সময়ই চিত্রশিল্পের প্রাথমিক খুঁটিনাটি অধ্যয়ন করেছিলেন তিনি। প্রথমে রাজপ্রাসাদের চিত্রশিল্পী রমা স্বামী নাইডুর কাছ থেকে জল রঙে ছবি আঁকার পাঠ গ্রহণ করেন তিনি। তারপরে জনৈক ওলন্দাজ চিত্রশিল্পী থিওডর জেনসনের কাছ থেকে তৈলচিত্র আঁকা শেখেন রবি বর্মা।

খুব অল্প বয়সেই চিত্রশিল্পে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি। ১৮৭৩ সালে ভিয়েনার একটি বিশেষ প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্মগুলি প্রদর্শিত হয়েছিল এবং একইসঙ্গে ঐ ছবিগুলির জন্য পুরস্কারও জিতেছিলেন তিনি। তারপরেও তাঁর আঁকা ছবির জন্য তিনটি স্বর্ণপদক লাভ করেন রাজা রবি বর্মা। ১৮৯৩ সালে বিশ্ব কলম্বিয়ান এক্সপোজিশনে প্রদর্শনের জন্য শিকাগোতে তাঁর ছবিগুলি পাঠানো হয়েছিল এবং এই কাজে সাহায্য করেছিলেন ব্রিটিশ প্রশাসক এডগার থার্স্টন। সমগ্র জীবন জুড়ে ছবি আঁকার বিষয় খোঁজার জন্য সারা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। দক্ষিণ ভারতের নারীদের মনোমুগ্ধকর ছবি আঁকার জন্য বিশেষ মনোনিবেশ করেন তিনি। তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের ছবিও এঁকেছেন তিনি এবং অদ্ভুতভাবে তাঁর আঁকা ছবির মধ্য দিয়েই তাঁরা বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে। তাঁর নিজের কন্যা মহাপ্রভা এবং তাঁর ভগ্নীপতি ভারানি থিরুনাল লক্ষ্মীবাঈকেও চিত্রিত করে তুলেছিলেন রবি বর্মা। লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদে থাকার সময় রাজা রবি বর্মা সেই প্রাসাদের স্টুডিওটি ব্যবহার করেছিলেন। ব্রিটিশ প্রশাসক এডিগার থার্স্টন রাজা রবি বর্মা ও তাঁর ভাইয়ের চিত্রশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। সুশ্রী ভারতীয় নারীদের মডেল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁদের উপর হিন্দু দেব-দেবীর প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। মহাভারতের শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের গল্প, নল ও দময়ন্তীর গল্পকেও রঙে, রেখায় চিত্রিত করেছিলেন রাজা রবি বর্মা। তাঁর অনেক ছবিই শালীনতা ও আবেগপ্রবণতার মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে এই মর্মে সমালোচিত হয়েছে। ভাদোদরার লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদে তাঁর আঁকা বহু ছবি আজও অক্ষত রয়েছে। তাঁর আঁকা ছবিগুলিকে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেখা যেতে পারে। প্রথমত প্রতিকৃতি, প্রতিকৃতি ভিত্তিক অন্য ছবি এবং ভারতীয় পুরাণ ও মহাকাব্যের কাহিনীর উপর আঁকা নাট্যগুণান্বিত চিত্র। এই তৃতীয় শ্রেণির ছবি আঁকার জন্যেই রাজা রবি বর্মা আজও বিখ্যাত। ভগবান রামের বিজয়, জটায়ুর ডানা কাটার সময় বরুণ ও রাবণের অহঙ্কার প্রকাশ ইত্যাদি তাঁর শিল্পিত ভঙ্গিতে অসামান্য রূপে ফুটে উঠেছে।

ত্রিবাঙ্কুরের তৎকালীন দেওয়ান টি. মাধব রাও-এর পরামর্শে ১৮৯৪ সালে রাজা রবি বর্মা মুম্বাইয়ের ঘাটকোপারে একটি লিথোগ্রাফিক প্রিন্টিং প্রেস তৈরি করেন এবং পরে ১৮৯৯ সালে এই প্রেসটি মহারাষ্ট্রের লোনাভালার কাছে মালাভলিতে স্থানান্তরিত হয়। মহাভারত, রামায়ণ ও পুরাণ থেকে গৃহীত দেব-দেবীর দৃশ্যগুলিই তিনি এই প্রেসে ওলিওগ্রাফের আকারে মুদ্রণ করতেন। এই ওলিওগ্রাফগুলি এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে রবি বর্মার মৃত্যুর পরেও এই প্রেস থেকে তা ছাপা হতে থাকে। সেই সময় সমগ্র ভারতের মধ্যে রাজা রবি বর্মা প্রেসই একমাত্র উন্নতমানের, অভিনব এবং আয়তনে বৃহৎ প্রেস ছিল। রবি বর্মার ভাই রাজা বর্মা এই প্রেসটি দেখাশোনা করতেন। কিন্তু তাঁদের ব্যবসায়িক দক্ষতা না থাকার কারণে প্রেসটি বাণিজ্যিকভাবে অসফল হয়। ১৮৯৯ সালে প্রেসটি প্রচুর দেনায় ডুবে যায় এবং ১৯০১ সালে রবি বর্মার মুদ্রণ সহকারী ও প্রকৌশলী জার্মান ফ্রিৎজ শ্লেইচারকে প্রেসটি বিক্রি করে দেন তিনি। শ্লেইচার এর পরে বেশ কিছুদিন যাবৎ এই প্রেস থেকে রাজা রবি বর্মার ছবিগুলি ছেপেছিল। কিন্তু তাঁর অধীনে খুব একটা দক্ষ কারিগর ছিল না। শ্লেইচার এই প্রেস থেকে পরবর্তীকালে বাণিজ্যিক ও বিজ্ঞাপনের নানা পোস্টারও ছাপতে শুরু করেন। শ্লেইচার ও তাঁর অধীনস্থ কর্মীদের প্রচেষ্টায় ভালোভাবেই প্রেসটি চলতে থাকে, কিন্তু ১৯৭২ সালে এক বিধ্বংসী অগ্নিকান্ডে পুরো প্রেসটিই পুড়ে যায়। রবি বর্মার আসল কিছু লিথোগ্রাফিক প্লেটও সেই আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

১৯০৪ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিভূ হিসেবে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন তাঁকে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন। কেরালার মাভেলিকারায় তাঁর সম্মানে একটি চারুকলার প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলা হয়েছিল। কিলিমান্নুরে তাঁর নামে একটি সড়কপথ নামাঙ্কিত হয়েছে রাজা রবি বর্মা হাই নামে। ২০১৩ সালে বুধ গ্রহের একটি গহ্বরও তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে ‘ক্রেটার ভার্মা’ হিসেবে। শিল্প ও সংস্কৃতির জগতে প্রত্যেক বছর যে সকল ব্যক্তি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন তাঁদের সম্মানে কেরালা সরকার রাজা রবি বর্মা পুরস্কার প্রদান চালু করেছে।

রাজা রবি বর্মার কিছু উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে মোহিনীর বল খেলা, যশোদা ও কৃষ্ণ, দময়ন্তী ও রাজহাঁস, অর্জুন ও সুভদ্রা, শকুন্তলা, জটায়ুর ডানা ছেদনে রাবণ, ইন্দ্রজিতের জয়, মিথুনরত দম্পতি, শান্তনু ও মৎস্যগন্ধা ইত্যাদি।

১৯০৬ সালের ২ অক্টোবর ৫৮ বছর বয়সে ত্রিবাঙ্কুরের আত্তিঙ্গালে রাজা রবি বর্মার মৃত্যু হয়।     

আপনার মতামত জানান