সববাংলায়

সত্যরঞ্জন বক্সী

বিভাগঃ ,

বাংলার বিপ্লবী অভ্যুত্থান এবং বৃহত্তর ক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অঘোষিত কিংবদন্তী বিপ্লবী ছিলেন সত্যরঞ্জন বক্সী (Satya Ranjan Bakshi)। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ পলায়নের পরিকল্পনা পুরোটাই জানতেন তিনি। আর তাই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নেতাজির প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থেকেছেন সত্যরঞ্জন। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুতে ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার সম্পাদনা, বাঙালি জনমানসে বৈপ্লবিক চেতনা প্রসারের লক্ষ্যে ‘বাংলার কথা’ ও ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সেকালে ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকায় বিপ্লবী লেখা প্রকাশের অপরাধে তিন বছরের কারাবাস এবং দেড় লক্ষ টাকার জরিমানা হয় সত্যরঞ্জন বক্সীর। বাংলায় বিপ্লবের যুগে সুভাষচন্দ্র এবং সত্যরঞ্জন ছিলেন একই পথের পথিক।

১৮৯৭ সালের ১৬ জুলাই পূর্ববঙ্গের বরিশাল জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে সত্যরঞ্জন বক্সীর জন্ম হয়। তাঁর মামা ছিলেন বিখ্যাত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলের নেতা হেমচন্দ্র ঘোষ। মামার প্রভাব, অনুপ্রেরণা আর পারিবারিক পরিমণ্ডলেই সত্যরঞ্জন গুপ্ত বিপ্লবী সমিতির কর্মকাণ্ডে যোগ দেন।

সত্যরঞ্জন বক্সীর প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পূর্ণ হয় তাঁর গ্রামের বিদ্যালয়েই। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এখান থেকেই ১৯১৯ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও ১৯২০ সালে আইনশাস্ত্রে বি.এল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি।

১৯২৩ সালের ১৩ নভেম্বর চিত্তরঞ্জন দাশের সান্নিধ্যে এসে প্রথম ‘এশিয়াটিক ফেডারেশন’ (Asiatic Federation) নামে একটি প্রবন্ধ লিখে তাঁকে বিস্মিত করেছিলেন সত্যরঞ্জন। তখন থেকেই চিত্তরঞ্জন দাশের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি আর এভাবেই কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। বলা যায়, স্বাধীনতা আন্দোলনের মহৎ কর্মকাণ্ডই ছিল তাঁর কর্মজীবনের অঙ্গ। মামা হেমচন্দ্র ঘোষের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ঘটে গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন মুক্তিসঙ্ঘে। এরপরে ভাগ্নে সত্যরঞ্জনের কাজের খোঁজে হেমচন্দ্র ঘোষই তাঁকে চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে নিয়ে আসেন এবং বি.এল পরীক্ষায় ভালো ফল করা সত্যরঞ্জনের জন্য একটি কাজ খুঁজে দিতে বলেন। ঠিক এই সময়েই ঐ প্রবন্ধ লিখে প্রথম দিনেই চিত্তরঞ্জন দাশের মন জয় করে ফেলেছিলেন তিনি। তখন ‘স্বরাজ্য দল’-এর নেতা ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ স্বয়ং, কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে মতিলাল নেহেরু সেই পদ অধিকার করেন। আর সত্যরঞ্জন বক্সীর কাঁধে সমগ্র ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার সম্পাদনার ভার এসে পড়ে। ধীরে ধীরে সত্যরঞ্জনের কর্মজীবনের পরিচয় হয়ে উঠল ‘ফরওয়ার্ড’, ‘বাংলার কথা’, ‘আত্মশক্তি’ ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনা আর সাংবাদিকতা। শোনা যায়, তৎকালীন বড়লাট লর্ড লিটন সাহেবও অসংখ্য সাধারণ মানুষের মতো তাঁর লেখা পড়তেন মন দিয়ে। ১৯২৭ সালে ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার সম্পাদকীয় অংশে ‘অ্যানার্কি ইন পাবনা’, ‘ইউনিফর্মড’ ইত্যাদি ব্রিটিশ-বিরোধী নিবন্ধ লিখলেন সত্যরঞ্জন বক্সী। ব্রিটিশ সরকার তাঁর উপর ক্ষুব্ধ হলে, তিনি পুনরায় সংবাদপত্রের পাতায় অভিযোগ জানান যে ব্রিটিশ সরকার একপ্রকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র এই ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ কথাটি ব্যবহারের জন্য হাইকোর্টে সাত বছরের কারাদণ্ড ঘোষিত হয়েছিল সত্যরঞ্জনের কিন্তু আইনজীবী তুলসী গোস্বামীর সওয়াল-জবাবে তা কমে তিন বছর হয়। সত্যরঞ্জন মামলা চলাকালীন আদালতে হাজির না হওয়ার ফলে তাঁর এবং ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকার প্রকাশকের উপর দেড় লক্ষ টাকার জরিমানা ধার্য করা হয়। ততদিনে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়ে গেছে। ফলে এত বিশাল অঙ্কের জরিমানার কারণে ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকা বন্ধ করে দিতে হয়।

পরবর্তীকালে অদম্য শক্তিতে সত্যরঞ্জন বক্সী ‘লিবার্টি’ নামে আরেকটি পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন এবং এর সঙ্গেই বাঙালি জনমানসে বৈপ্লবিক কর্মযজ্ঞের আঁচ পৌঁছে দিতে প্রকাশ করেন ‘বাংলার কথা’ আর ‘আত্মশক্তি’ নামে আরো দুটি পত্রিকার মাধ্যমে। ‘লিবার্টি’ পত্রিকার জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে ইংরেজ সরকার আবার সত্যরঞ্জনকে কারাবন্দি করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৩১ সালে পরপর তিনটি ব্রিটিশ-বিরোধী নিবন্ধ প্রকাশিত হয় এই পত্রিকায় – ১০ ডিসেম্বর তারিখে ছাপা হয় ‘ফেয়ারওয়েল অ্যাণ্ড বিওয়্যার’, ১২ ডিসেম্বর প্রকাশ পায় ‘বেঙ্গলিস্‌ ডিউটি’ আর সবশেষে ১৪ ডিসেম্বর ছাপা হয় ‘বেঙ্গলস্‌ ডিউটি’। এই লেখাগুলিতে পূর্বে ঘটে যাওয়া হিজলি, ঢাকা আর চট্টগ্রামের আন্দোলনকে সমর্থন করে বলা হয়েছিল যে এই আন্দোলনই বিপ্লবীদের পথ দেখাবে। ফলে এই তিনটি সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী নিবন্ধ প্রকাশের অপরাধে ‘লিবার্টি’ পত্রিকার সম্পাদক সত্যরঞ্জন বক্সী আর প্রকাশক পুলিনবিহারী ধরকে আটক করা হয় এবং সত্যরঞ্জনকে দেড় বছরের এবং পুলিনবিহারী ধরকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪-এ ধারায় জনমানসে সন্ত্রাস ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এরপর নানা মিথ্যে অভিযোগে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তাঁকে দেউলি আর বক্সা জেলে বন্দি করে রাখে। ১৯৩৪ সালে জেল থেকে ছাড়া পেলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে সত্যরঞ্জনের আলাপ নিকটতর হয়। সুভাষচন্দ্র বসু এবং সত্যরঞ্জন বক্সী উভয়েই পরস্পরের বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন। প্রথমবার হরিপুরা কংগ্রেস এবং পরে ত্রিপুরা কংগ্রেসে পরপর সুভাষচন্দ্রের জয়লাভের পিছনে সত্যরঞ্জনের সাংগাঠনিক অবদান ছিল অনস্বীকার্য। বিশ্বযুদ্ধের আবহাওয়ায় সুভাষচন্দ্র সহিংস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের কথা ভাবলে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবর্গের সঙ্গে মতবিরোধ ঘটে এবং কংগ্রেস ত্যাগ করেন তিনি। ফরওয়ার্ড ব্লক প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রচার ও প্রসারের অধিকাংশ দায়ভারই সামলেছেন সত্যরঞ্জন নিজে। তারপরই নেতাজির ঐতিহাসিক অন্তর্ধান ঘটলে সত্যরঞ্জনকেই ব্রিটিশ পুলিশ নানাভাবে জেরা করে, অকথ্য অত্যাচার চালায়। এমনকি লালকেল্লার ভূগর্ভস্থ জেলেও তাঁকে বেশ কয়েক বছর আটক করে রাখা হয়। আসলে সত্যরঞ্জন সত্যই নেতাজির এই অন্তর্ধানের পরিকল্পনার কথা সম্পূর্ণভাবে জানতেন। ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে গোয়েন্দা পরেশ রায়ের সহায়তায় সত্যরঞ্জন বক্সী লালবাজার পুলিশের গুপ্তচরদের উপর নজর রাখতেন। সাতদিন টানা এই কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করার পরে সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর পলায়নের পরিকল্পনা স্থির করেন। ফলে বোঝাই যায় সত্যরঞ্জন বক্সীর সহায়তাতেই পুলিশের কার্যকলাপ সম্পর্কে আগাম ধারণা পেতেন সুভাষচন্দ্র যা তাঁকে যথেষ্ট সহায়তা করেছিল। ভবানীপুরে ১৬ বি, প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের বাড়িতে থাকতেন সত্যরঞ্জন বক্সী আর এই বাড়িতেই সুভাষচন্দ্রের প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষায় আমৃত্যু দিন অতিবাহিত করেছেন তিনি। ১৯৪৬ সালে লালকেল্লার জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তখনো থেমে থাকেননি তিনি। পুনরায় ১৯৪৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘দ্য নেশন’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়ভার নিয়ে কলম ধরলেন। সুভাষচন্দ্রের দাদা শরৎচন্দ্র বসু ছিলেন এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। দেশ স্বাধীন হয়েছে ততদিনে, কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতে বীর বিপ্লবী সুভাষের ফেরার আশা নিয়ে তিনি গৃহবন্দি হয়ে থেকেছেন কারণ নেতাজি তাঁকে বলেছিলেন, ‘We shall live together, die together.’ তাঁর রচনাগুলির মধ্যে নেতাজিকে কেন্দ্র করে লেখা ‘অ্যান অ্যাডভেঞ্চার ইন লাইফ’ খুবই বিখ্যাত।

১৯৮৩ সালের ৮ জানুয়ারি সত্যরঞ্জন বক্সীর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading