ভূগোল

জয়নগর মজিলপুর

মোয়ার শহর জয়নগর পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার অন্তর্গত এই শহরতলিটি বৃহত্তর কলকাতারই একটি অংশবিশেষ। জয়নগর ও মজিলপুর পাশাপাশি অবস্থিত দুটি শহর যার মধ্যে কায়স্থদের বাস বেশি জয়নগরে এবং তুলনামূলকভাবে এটিই বেশি প্রাচীন। অন্যদিকে বয়সে নবীন মজিলপুরে ব্রাহ্মণদের বাস বেশি।জয়নগর মজিলপুরের ভৌগোলিক অবস্থান  ২২.১৭৭২° উত্তর ৮৮.৪২৫৮° পূর্ব । প্রায় ৫.৮৫ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত জয়পুর-মজিলপুরের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায় জনপদ হিসেবে জয়নগরের প্রাচীনত্ব বেশ সুপ্রাচীন। এমনকি ষোড়শ - সপ্তদশ শতকের মঙ্গলকাব্যগুলিতে জয়নগরের উল্লেখ দেখা যায়।

জনশ্রুতি অনুযায়ী জয়নগর নামটির উৎপত্তি হয়েছে স্থানীয় দেবী জয়চণ্ডীর নাম থেকে।কথিত আছে, সপ্তদশ শতকে  কলকাতার বাগবাজারের মতিলালবংশের পূর্বপুরুষ ছিলেন গুণানন্দ মতিলাল। তার প্রায় চার হাজার সৈন্য, ও দশখানা যুদ্ধ জাহাজ ছিল। তিনিই প্রথম এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। একবার ব্যবসায়িক কাজে আদিগঙ্গা ধরে যেতে যেতে কিছু দূরে এক বাদাম গাছের কাছে নোঙর করেন; রাতে গঙ্গার কিছু দূরে এক জনশূন্য নির্জন স্থানে আশ্চর্য এক আলো দেখতে পান। সেই রাতে দেবী জয়চণ্ডী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে  স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন উনি যেন মাটি খুঁড়ে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন। পরদিন গুণানন্দ মাটি খুঁড়ে একটি পাথর টুকরো পান এবং সেই পাথরখণ্ডকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। আজও দেবী এখানে পূজিতা এবং প্রতি জৈষ্ঠ্যপূর্ণিমায় দেবীর প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে মেলা বসে। মতিলালবংশের পর পরবর্তীকালে এখানে কায়স্থ সেন এবং বড়িশার মিত্রবংশ বসবাস শুরু করেন। মিত্রপরিবারের প্রতিষ্ঠিত রাধাবল্লভ মন্দির ও দোলমঞ্চ এখানে এখনো বর্তমান। এছাড়া, মিত্র-গঙ্গা দীঘির পাশে পোড়ামাটির ভাস্কর্যের দ্বাদশ শিব মন্দির বর্তমান; এগুলির প্রতিষ্ঠাকাল ১৭৫৫ খ্রিঃ থেকে ১৭৯৯ খ্রিঃ। এরপাশেই  রয়েছে দেবতা 'দক্ষিণের ক্ষেত্রপাল' ; মূর্তি নেই, শুধু আছে পাথরের প্রাচীন মন্দিরের দরজার বা স্তম্ভের ভগ্নাংশ। জয়নগর শহরের রক্তাখাঁ পাড়ায় লোকদেবতা বৃষভবাহন পঞ্চানন ও বনবিবির থান রয়েছে। রক্তাখাঁ পীর বড়খাঁ গাজীর নামান্তর বলে মনে করা হয়।

অষ্টাদশ শতকের  গাঙ্গেয় বদ্বীপের মানচিত্রে দেখা যায়, আজ যেখানে মজিলপুর  এক সময় এর পশ্চিম দিক বরাবর  আদি গঙ্গার প্রবাহিত হত।পরবর্তীকালে  আদিগঙ্গার প্রবাহ মজে গিয়ে নতুন যে বসতির উৎপত্তি হয় তাই আজকের 'মজিলপুর'।আদিগঙ্গার মজাগর্ভ থেকে উৎপত্তি বলেই এই জনপদের নাম  'মজিলপুর' বলে মনে করা হয়ে থাকে। মন্দির সমৃদ্ধ প্রাচীন মজিলপুর শহরে শিক্ষার জন্য অনেক চতুষ্পাঠী ছিল এবং সেগুলি জমিদার ও ধনী ব্যক্তিদের বৃত্তি  থেকে পরিচালিত হত।এখানকার ধন্বন্তরী কালীবাড়ি একটি প্রাচীন শক্তিপীঠ। সপ্তদশ শতকে এক সিদ্ধতান্ত্রিক ভৈরবানন্দ আদিগঙ্গার তীরে ধন্বন্তরী কালী বিগ্রহ খুঁজে পান ও কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের গর্ভগৃহে কাঠের তৈরী কারুকার্যময় রথসিংহাসনে পদ্মের ওপর শায়িত শিব বিগ্রহের বুকের ওপর দন্ডায়মানা  দক্ষিণাকালী বিগ্রহ অবস্থিত। মজিলপুর শহরের উল্লেখযোগ্য লোকদেবতা হলেন পণ্ডিতপাড়া ও কয়েলপাড়ার পঞ্চানন ঠাকুর। কয়েলপাড়ার পঞ্চানন বিগ্রহের পাশে  শীতলা দেবীর ও বাবাঠাকুরের (দক্ষিণরায়) মূর্তি আছে। পণ্ডিতপাড়ার পঞ্চানন ও শীতলা সাধারণ ইটের ঘরে পাশাপাশি বিরাজিত; এদের সামনে বাবাঠাকুর, জরাসুর ও বসন্ত রায়ের ছোট ছোট মূর্তি রয়েছে।

জয়নগর মজিলপুর শহরের একটি স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসন সংস্থা হল জয়নগর মজিলপুর পৌরসভা। জয়নগর মজিলপুর শহরের ৫.৮৫ বর্গকিলোমিটার (২.২৬ মা) অঞ্চলের পৌর পরিষেবা দেওয়া ও নগরাঞ্চলের উন্নয়ন এই পৌরসভার প্রাথমিক দায়িত্ব। এটি একটি বিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থা। ১৮৬৯ সালের ১ লা এপ্রিল জয়নগর, মজিলপুর ও আরও ৪-৫টি ছোটো ছোটো অঞ্চল (চাঁপাতলা, হাসানপুর, গহেরপুর, ইত্যাদি) নিয়ে এই পৌরসভাটি গঠিত হয়েছিল। এটি সারা দেশের প্রাচীনতম পৌরসভাগুলির মধ্যে অন্যতম।১৮৬৯ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপাল অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে জয়নগর মজিলপুর পৌরসভা গঠিত ও অনুমোদিত হয়। তার আগে ১৮৬৪ সালে যে জয়নগর টাউন কমিটি গড়ে উঠেছিল, তার সভাপতি ছিলেন বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর (১৮৪৭-১৯১৯) পিতা ও তৎকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাপ্তাহিক পত্রিকা 'সোমপ্রকাশ'এর সম্পাদক পণ্ডিত দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের (১৮১৯-১৮৮৬) ভগ্নীপতি পণ্ডিত হরানন্দ বিদ্যাসাগর (১৮২৭-১৯১২)। ১৮৬৯ সালে সদ্যগঠিত পৌরসভার পৌরপ্রধানের পদও তিনি অলঙ্কৃত করেন

জয়নগর মজিলপুর শহরে পরিবহন ব্যবস্থার প্রাথমিক মাধ্যম হল রেলপথ। এই রেলওয়ে স্টেশনটি শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৪৯ কিলোমিটার (৩০ মা) দক্ষিণে শিয়ালদহ–নামখানা লাইনে অবস্থিত।সড়কপথে জয়নগর মজিলপুর শহরটি ১ নং রাজ্য সড়ক দ্বারা কলকাতা ও বাংলার অন্যান্য শহরগুলির সঙ্গে সংযুক্ত।

এই এলাকার গুণীজনদের মধ্যে পড়েন

  • শিবনাথ শাস্ত্রী
  • উমেশচন্দ্র দত্ত
  • কানাইলাল ভট্টাচার্য
  • ভূতনাথ ভট্টাচার্য
  • শক্তি চট্টোপাধ্যায়
  • কালীনাথ দত্ত
  • নীলরতন সরকার
  • যোগীন্দ্রনাথ সরকার
  • হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
  • নির্মলা মিশ্র

সারা বিশ্বে জয়নগরের খ্যাতি তার জগদ্বিখ্যাত মোয়ার জন্য হলেও আরও একটি কারণে জয়নগর যে সারা বিশ্বে যথেষ্ট সমাদৃত তা কিন্তু অনেকেই জানেন না। সেটা তার পোড়া মাটির পুতুল। টানা চোখ, গোলগাল গড়নের এই পুতুল ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে আমেরিকার স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট কিংবা ভারতীয় সংগ্রহালয় থেকে দিল্লির জাতীয় সংগ্রহালয়ে সর্বত্র স্থান পেয়েছে।কিন্তু যথেষ্ট প্রচার এবং অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর অভাব বর্তমানে এই শিল্পকে বিপন্ন করে তুলেছে।প্রায় ২৫০ বছর আগে  কালীচরণ পেয়াদাকে যশোহর থেকে জয়নগরে এনেছিলেন এখানকার দত্ত-জমিদাররা।শোনা যায় কালীচরণ নাকি মাটি দিয়ে ‘টেপা পুতুল’ তৈরি করতেন। তাঁর ছেলে জানকীনাথ দাস জয়নগরে এই পুতুল তৈরি শুরু করেন।মন্মথনাথ দাস এই পেশার সবথেকে বিখ্যাত শিল্পী।পুতুল দু’প্রকার। হাতে তৈরি এবং ছাঁচের। প্রচলিত দেবদেবীর পাশাপাশি তৈরি হয় নানা লৌকিক দেবদেবীর মূর্তি। হাতে তৈরি পুতুলের মধ্যে নারায়ণী, শীতলা, বনবিবি, দক্ষিণরায়, পঞ্চানন, মানিকপীর, আটেশ্বর, দক্ষিণেশ্বর উল্লেখযোগ্য। আর ছাঁচের পুতুলের মধ্যে রয়েছে গণেশজননী, জগদ্ধাত্রী, রাধাকৃষ্ণ, কালিয়দমন, ষড়ভূজচৈতন্য, কলকাতার বাবু, গয়লা-বৌ, কৃষক ইত্যাদি।প্রয়াত লোকশিল্প গবেষক তারাপদ সাঁতরা ‘পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পী সমাজ’ গ্রন্থে জয়নগর-মজিলপুরের পুতুলের কথা উল্লেখ করেছেন।

এখানকার অন্যতম দেখার জায়গার মধ্যে পড়ে- নিমপীঠে অবস্থিত রামকৃষ্ণ আশ্রম৷স্বামী বুদ্ধানন্দ মহারাজ এই আশ্রমটি প্রতিষ্ঠা করেন৷ এছাড়াও রয়েছে বিবেকানন্দ ইন্সটিটিউট অফ বায়োটেকনলোজি  ও কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, ইন্দিরা কমিউনিটি হল ইত্যাদি।

এছাড়াও জয়নগরে এক সময় ঘরে ঘরে চশমার লেন্স তৈরির কাজ হত। কাচের লেন্স তৈরির প্রচুর কারখানা ছিল এলাকায় কিন্তু বর্তমানে এই শিল্পের কদর বলতে গেলে নেইই। কাচের লেন্সের বদলে এখন ফাইবারের ব্যবহার এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন এই শিল্পে যুক্ত শিল্পীরা।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!