ইতিহাস

শিবনাথ শাস্ত্রী

শিবনাথ শাস্ত্রী

শিবনাথ শাস্ত্রী (Shivanath Sastri)উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ইতিহাসে একজন আধ্যাত্মিক সংস্কারক, চিন্তক এবং লেখক হিসেবে বাংলার ইতিহাসে এক অত্যন্ত সুপরিচিত নাম। কেশবচন্দ্র সেনের প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ থেকে বেরিয়ে গিয়ে ১৮৭৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। নারীশিক্ষার প্রসারের জন্য নীতিবিদ্যালয় স্থাপন এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সিটি স্কুল ও স্টুডেন্টস সোসাইটি স্থাপনের পাশাপাশি লেখক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল সুদূরপ্রসারী। ভারতের প্রথম কিশোর মাসিক পত্রিকা ‘সখা’তে নিয়মিত লিখতেন শিবনাথ শাস্ত্রী। এছাড়া তাঁর নিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘সোমপ্রকাশ’, ‘সমদর্শী’, ‘তত্ত্বকৌমুদী’, ‘মুকুল’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব পত্রিকা। ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকে তিনিই বাল্যবিবাহ রদ এবং বিধবাবিবাহের পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৮৭২ সালে মেয়েদের বিবাহের বয়স ন্যূনতম ১৪ বছর নির্ধারিত হয়। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আত্মচরিত’ এবং ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ উনিশ শতকের কলকাতার সমাজ-রাজনৈতিক জীবনের এক জীবন্ত দলিল।

১৮৪৭ সালের ৩১ জানুয়ারি ২৪ পরগণা জেলার চিংড়িপোতা গ্রামে মামার বাড়িতে শিবনাথ শাস্ত্রীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা হরানন্দ ভট্টাচার্য ২৪ পরগণা জেলার মজিলপুর গ্রামের পৌরপ্রধান ছিলেন। তাঁদের আদি নিবাস ছিল উড়িষ্যার জাজপুরে, সেখান থেকে তাঁরা ২৪ পরগণার মজিলপুরে এসে ওঠেন। বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্মে আদ্যন্ত বিশ্বাসী এক পরিবারে জন্ম হয় শিবনাথের। তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই পৌরোহিত্যের মাধ্যমে উপার্জন করতেন। যদিও তাঁর পরিবারে দারিদ্র্য ছিল আজীবন। শৈশবে তিনি লক্ষ করেছিলেন তাঁর গ্রামের ব্রজনাথ দত্ত এবং তাঁর পুত্র শিবচন্দ্র দত্ত ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’-র গ্রাহক ছিলেন এবং সেই পত্রিকা ক্রয়ের জন্য অন্যান্য গ্রামবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতেন। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজের প্রতি আকর্ষণের মূল উৎস হয়তো এটাই।

স্থানীয় পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় শিবনাথ শাস্ত্রীর। স্থানীয় জমিদারের আনুকূল্যে মজিলপুরে একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল চালু হলে শিবনাথ সেই স্কুলে ভর্তি হন। নয় বছর বয়সে তিনি কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। তাঁর মামা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ সংস্কৃত কলেজে পড়াতেন এবং তাঁর সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল, প্রায়ই পরস্পর পরস্পরের বাড়িতে যাতায়াত ছিল। ১৮৬৬ সালে সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন শিবনাথ এবং ঐ কলেজ থেকে ১৮৬৮তে এফ.এ এবং ১৮৭২ সালে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজের পাঠ শেষ হলে ব্যতিক্রমী ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে তাঁকে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি দেওয়া হয়। ছাত্রাবস্থায় থাকাকালীনই ১৮৬৯ সালে কেশবচন্দ্র সেন, আনন্দমোহন বসু, কৃষ্ণবিহারী সেন এবং রজনী নাথ রায়ের সংস্পর্শে এসে ব্রাহ্মধর্মের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ক্রমশ হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন শিবনাথ শাস্ত্রী। এই নিয়ে তাঁর বাড়িতে প্রবল পারিবারিক অশান্তির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। শোনা যায় পৌত্তলিকতা বিরোধী হয়ে মূর্তিপূজা বন্ধ করতেও অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। পুত্রের এই কাজে আঘাত পেয়ে তাঁর মা অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং তাঁর বাবা হরানন্দ তাঁকে লাঠি হাতে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন। শিবনাথকে গায়ের জোরে ঠাকুরঘরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তাঁর বাবা। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি। উপায়ান্তর না দেখে হরানন্দ পুত্র শিবনাথের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ত্যাগ করেন। ১৮৬৯ সালের ২২ আগস্ট ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেন শিবনাথ শাস্ত্রী। অবিচল আদর্শ, সুমিষ্ট ব্যবহার এবং প্রতিশ্রুতিপরায়ণতার জন্য বন্ধু ও আত্মীয়দের মধ্যে শিবনাথ শাস্ত্রী বেশ সম্মানিত হতেন। কলেজ পাশ করার সময়েই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় রামতনু লাহিড়ী ও দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির যাঁদের প্রভাব তাঁর জীবনে গভীরভাবে পড়েছিল।

১৮৭২ সালে কেশব সেন ‘ভারত আশ্রম’ নির্মাণ করলে পাকাপাকিভাবে সেখানে থাকতে শুরু করেন শিবনাথ। ঠিক তাঁর পরের বছর ১৮৭৩ সালে তাঁর মামা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে বাধ্য হয়ে মামারবাড়িতে ফিরে গিয়ে একইসঙ্গে ‘সোমপ্রকাশ’ পত্রিকার সম্পাদনা, মজিলপুর স্কুলের দায়িত্ব এবং স্থাবর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করতে শুরু করেন। এই সময়েই হরিনাভি ব্রাহ্মসমাজ এবং হরিনাভি বিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন শিবনাথ শাস্ত্রী। মজিলপুরের নিকটস্থ গ্রাম হরিনাভিতে তাঁর বন্ধু প্রকাশ চন্দ্র রায়কে হরিনাভি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন তিনি। ১৮৭৪ সালে সাউথ সুবার্বন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে আসীন হন শিবনাথ। আর এর দুই বছর পরে ১৮৭৬-এ হেয়ার স্কুলের হেডপণ্ডিত পদে উত্তীর্ণ হন তিনি। কিন্তু বেশিদিন এই পদে আসীন ছিলেন না তিনি, কিছুদিন পরে সমস্ত সরকারি পদ ত্যাগ করে ব্রাহ্মসমাজের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন শিবনাথ শাস্ত্রী। ক্রমে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে কেশব সেন এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বাধে মতাদর্শগত কারণে। মেয়েদের ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশের অধিকার থাকলেও তাঁদের বসতে হতো পর্দার আড়ালে। এই পর্দাপ্রথার বিরোধিতা করেছিলেন শিবনাথ। এই বিরোধ চরমে ওঠে যখন কেশব চন্দ্রের কন্যা কোচবিহারের মহারাজকে বিবাহ করেন। সেই সময়ই ব্রাহ্মসমাজে ভাঙন ধরে এবং ১৮৭৮ সালে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ’ স্থাপিত হলে শিবনাথ সেখানকার আজীবন সদস্যপদ গ্রহণ করেন। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রধান পাঁচ জন সদস্য ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, কেদারনাথ রায়, নগেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, কালীনাথ দত্ত এবং উমেশচন্দ্র দত্ত যাদের একত্রে ‘পঞ্চপ্রদীপ’ বলা হতো। ‘ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত’ বইতে শিবনাথ শাস্ত্রী জানাচ্ছেন যে আনন্দমোহন বসু, শিবচন্দ্র দেব এবং উমেশচন্দ্র দত্তের অবদান সবথেকে বেশি ছিল সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে। সমাজের পক্ষ থেকে প্রথম প্রচারক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, রামকুমার বিদ্যারত্ন এবং শিবনাথ শাস্ত্রী। ভারতের দিকে দিকে ব্রাহ্মধর্মের প্রচারে অগ্রণী হয়েছিলেন তাঁরা। আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে একত্রে সিটি স্কুল, সিটি কলেজ স্থাপন করেন তিনি এবং এই সংস্থার প্রথম সম্পাদক হন। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র হিসেবে তাঁর সম্পাদনায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হতে থাকে ‘তত্ত্বকৌমুদী’ পত্রিকা। ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বীদের মতামত ও ভাবধারা প্রচারে এই পত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ‘ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়’ স্থাপনে সহায়তা করেছিলেন শিবনাথ এবং পরে এর সম্পাদক পদেও আসীন হন তিনি। পাটনায় ‘রামমোহন রায় সেমিনারি’ স্থাপন করার পাশাপাশি কলকাতায় তিনি গড়ে তোলেন ‘সাধন আশ্রম’ যেখানে আধ্যাত্মিক সাধনা এবং মিশনের কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হতো। আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নেন তিনি। মিশনারী হিসেবে ভারতের বহু জায়গায় ঘুরেছেন তিনি। ১৮৭৯ সালে আগ্রা এবং লাহোর ভ্রমণকালে শিবনারায়ণ অগ্নিহোত্রী এবং সর্দার দয়াল সিং-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তাঁর। তারপর মুলতান এবং হায়দ্রাবাদে থাকাকালীন নাভালরাও শৌকিরাম আডবাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় শিবনাথের। এরপর জাহাজে চড়ে তিনি মুম্বাইতে আসেন যেখানে তিনি পরিচিত হন বাল মঙ্গেশ ওয়াগলে, নারায়ণ মহাদেব পরমানন্দ, রামকৃষ্ণ গোপাল ভাণ্ডারকর, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে এবং আরো অনেকের সঙ্গে। কোয়েম্বাটোর ভ্রমণের সময় চেন্নাই ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক রঙ্গনাথন মুদালিয়রের সঙ্গে তিনি আলোচনা করে ধর্ম বিষয়ে। ১৮৭৫ সালে দক্ষিণেশ্বরে প্রথম রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে শিবনাথ শাস্ত্রীর। ১৯১৯ সালে মর্ডাণ রিভিউ পত্রিকায় রামকৃষ্ণকে নিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

শুধুই সমাজসংস্কার নয়, বরং লেখালিখির ক্ষেত্রেও একজন দক্ষ প্রাবন্ধিক এবং মরমী কবি হিসেবে শিবনাথ শাস্ত্রী বেশ খ্যাতিমান ছিলেন। তাঁর লেখা ‘শ্রমজীবি’ নামের একটি কবিতা ১৮৭৪ সালের ভারত শ্রমজীবি নামের একটি পত্রিকায় প্রকাশ পায়। সমালোচকদের মতে, শ্রমজীবী সম্প্রদায়কে নিয়ে লেখা প্রথম বাংলা কবিতা এটাই। এছাড়াও ‘পুষ্পমাল্য’, ‘পুষ্পাঞ্জলি’, ‘নির্বাসিতের বিলাপ’, ‘হিমাদ্রিকুসুম’ ইত্যাদি শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তিনি উপন্যাসও লিখেছিলেন বেশ কয়েকটি যার মধ্যে মেজবৌ, যুগান্তর, নয়নতারা, উপকথা, বিধবার ছেলে উল্লেখযোগ্য। শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বইটি প্রকাশ পায় ১৯০৪ সালে যা উনিশ শতকের কলকাতার সমাজ-রাজনৈতিক অবস্থার এক জীবন্ত দলিল। ‘আত্মচরিত’ নামে তিনি একটি আত্মজীবনী লেখেন ১৯১৮ সালে। ‘হিস্ট্রি অফ ব্রাহ্মসমাজ’ শিবনাথ শাস্ত্রীর লেখা একটি গবেষণামূলক আকরগ্রন্থ।

শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বাংলার এক অন্যতম প্রধান শিশু-কিশোরদের পত্রিকা ‘মুকুল’। তাছাড়া ‘সমদর্শী’ ও ‘সমালোচক’ নামে দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি।

১৯১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শিবনাথ শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

3 Comments

3 Comments

  1. Pingback: উমেশচন্দ্র দত্ত | সববাংলায়

  2. Pingback: নবীনচন্দ্র সেন | সববাংলায়

  3. Pingback: সুন্দরী মোহন দাস | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়