ইতিহাস

আলফ্রেড লর্ড টেনিসন

ইংরেজি সাহিত্যে রোম্যান্টিক যুগ অবসানের পরে সূচিত হয়েছিল ভিক্টোরীয় যুগ আর এই ভিক্টোরীয় যুগের প্রতিনিধিস্থানীয় কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসন (Alfred Lord Tennyson)। তাঁর লেখা বিখ্যাত ‘টিম্বাক্টু’ (Timbuktu) কবিতার জন্য চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেলে ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। গীতিকবিতার ধারায় টেনিসন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর লেখা ‘ইন মেমোরিয়াম’ ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে একাধারে এক নির্লিপ্ত শোকগাথা এবং মগ্ন গীতিকবিতা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ‘ইউলিসিস’, ‘দ্য প্রিন্সেস’, ‘দ্য লেডি অফ শ্যালট’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি ‘কুইন ম্যারি’ নামে একটি কাব্যনাট্য অ্যালফ্রেড টেনিসনের লেখা উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকীর্তি।

১৮০৯ সালের ৬ আগস্ট ইংল্যাণ্ডের লিঙ্কনশায়ারের সমারস্‌বিতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জর্জ ক্লেটন টেনিসন একজন ধর্মযাজক হিসেবে সমারস্‌বি, বেনিওর্থ, ব্যাগ এণ্ডারবিতে নিযুক্ত ছিলেন এবং তাঁর মা এলিজাবেথ ফিচি। স্থাপত্য, চিত্রকলা, সঙ্গীত, কবিতা ইত্যাদি চারুকলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেনিসনের বাবা স্বচ্ছন্দ এবং দক্ষ ছিলেন কিন্তু তাঁর উপার্জিত অর্থের তুলনায় পরিবারের চাহিদা ছিল অনেকটাই বেশি। ফলে আর্থিক সচ্ছলতা কোনোদিনই পাননি টেনিসন। দুই দাদা, চার ভাই এবং চার বোনের সঙ্গে টেনিসন শৈশবে বড়ো হয়েছেন। কিন্তু শৈশবের অভিজ্ঞতা টেনিসনের মোটেও সুখকর ছিল না। তাঁর বাবা অত্যধিক মদ্যপান এবং মাদকাসক্তির কারণে পরিবারের সদস্যদের উপর অত্যাচার করতেন। এর মধ্যেই মাত্র আট বছর বয়স থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন টেনিসন, এমনকি তাঁর দাদা বা বোনেরাও তাঁরই মতো বই পড়তে, কবিতা লিখতে খুবই পছন্দ করতো। সতেরো বছর বয়সে কিশোর টেনিসন এবং তাঁর দুই দাদা মিলে একত্রে একটি কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছিলেন যার নাম ‘পোয়েমস বাই টু ব্রাদারস’।

টেনিসনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ইংল্যাণ্ডের লাউথে ‘কিং এডওয়ার্ড সিক্স গ্রামার স্কুল’-এ। ১৮১৬ সাল থেকে ১৮২০ সাল পর্যন্ত পড়ার পর স্কুল ছাড়তে হয় টেনিসনকে। তারপর বাবার কাছেই মাঝে মাঝে কিছু কিছু বিদ্যাচর্চা করেছিলেন তিনি। পরে ১৮২৭ সালে টেনিসন ভর্তি হন কেম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। এখানেই তিনি ‘কেমব্রিজ অ্যাপোসেলস’ নামে একটি গুপ্ত সংগঠনে যুক্ত হন। এই কলেজেই টেনিসনের সঙ্গে আলাপ হয় আর্থার হ্যালাম এবং উইলিয়াম হেনরি ব্রুকফিল্ডের। এই সময় তাঁর কবিতাচর্চা স্থগিত হয়নি। ১৮২৯ সালে তাঁর লেখা ‘টিম্বাক্টু’ (Timbuktu) কবিতার জন্য চ্যান্সেলর’স গোল্ড মেডেল পান অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসন আর এর পরের বছর ১৮৩০ সালে টেনিসনের প্রথম একক কবিতার বই প্রকাশ পায় ‘পোয়েমস, চিফলি লিরিক্যাল’। পরবর্তীকালে টেনিসনের ক্ল্যারিবেল এবং মারিয়ানা নামে যে দুটি কবিতা জনপ্রিয় হয়েছিল, সে দুটি এই কাব্যগ্রন্থেই প্রথম সংকলিত হয়। আর এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরেই বিখ্যাত ইংরেজ কবি মহলে টেনিসনের পরিচিতি বাড়তে শুরু করে, এমনকি বিখ্যাত ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ তাঁর কবিতা পড়তে শুরু করেন। এইসময় ১৮৩১ সালে তাঁর বাবা মারা গেলে পরিবারের আর্থিক সংস্থানের চাপে তাঁর পড়াশোনা শেষ করা হয়নি। ডিগ্রি না নিয়েই ট্রিনিটি কলেজ ছাড়তে হয় তাঁকে। বাবার মতোই কোনো একটি গির্জায় চাকরি নিতে বলা হয় টেনিসনকে। কিন্তু তাঁর মন পড়েছিল কবিতা চর্চার দিকে। গির্জায় যাজকের কাজ নিয়ে থাকতে শুরু করেন টেনিসন এবং তাঁর সঙ্গে এসে থাকতেন আর্থার হ্যালাম। ১৮৩২ সালে হ্যালামের সঙ্গেই তিনি মহাদেশীয় সফরে বেরিয়েছিলেন কিন্তু অভাবিতভাবে পরের বছর অর্থাৎ ১৮৩৩ সালে হ্যালামের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে যান টেনিসন। তাঁর স্মরণেই দীর্ঘ এক শোক-কবিতা লিখে ফেলেন টেনিসন যার নাম ‘ইন মেমোরিয়াম’। কিন্তু ঐ বছরই এই লেখাটি প্রকাশ পায়নি। বরং ১৮৩৩ সালে টেনিসনের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য লেডি অফ শ্যালট’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই বইটির বিরূপ সমালোচনা এত প্রবল হয় যে এর পরের দীর্ঘ দশ বছর তিনি কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেননি, যদিও তাঁর লেখা থেমে থাকেনি কখনো। ১৮৩৬ সাল নাগাদ টেনিসন তাঁর ভ্রাতৃবধূর বোন এমিলি সেলউডের প্রেমে পড়েন। কিন্তু টেনিসন যখন জানতে পারেন যে তাঁর পরিবারে কুষ্ঠ রোগের এক পুরনো ইতিহাস রয়েছে এবং সর্বোপরি তাঁর অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে ১৮৪০ সালে তিনি সম্পর্কে ছেদ ঘটান। ১৮৪২ সালে টেনিসনের দুই খণ্ডের একটি কবিতার সংকলন প্রকাশ পায় ‘পোয়েমস’ নামে যেখানে দ্য লেডি অফ শ্যালট, লক্সলি হল, মর্ট ডি আর্থার, ইউলিসিস ইত্যাদি বিখ্যাত সব কবিতা অন্তর্ভূক্ত ছিল। দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই বছরই জন ক্লেয়ার নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং ক্লেয়ারের কাঠ-কাটার ব্যবসায় অনেকগুলি টাকা ঢেলে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন টেনিসন। ব্যবসা ভালো চলবে, সেখান থেকে কিছু লাভের আশায় টাকা দিলেও ব্যবসা একেবারেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তাঁর এক বন্ধুর করানো বীমার দাক্ষিণ্যে তিনি সে যাত্রায় কিছু টাকা ফেরত পেয়েছিলেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


কবিতা লেখাই তাঁর কর্মজীবনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। এরপর তাঁর আরেকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৮৪৭ সালে ‘দ্য প্রিন্সেস’ নামে। কিন্তু নারীশিক্ষার অধিকার নিয়ে লেখা এই দীর্ঘ বর্ণমামূলক কাব্যগ্রন্থের পরে ইংরেজি সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে ওঠেন টেনিসন ১৮৫০ সালে সেই বহু আগে লেখা ‘ইন মেমোরিয়াম’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ করার পরে। বন্ধু আর্থার হ্যালামের মৃত্যুতে গভীর শোকগ্রস্ত টেনিসনের এক করুণ আর্তি ফুটে উঠেছে এই লেখায় যা আজও পাঠককে মোহিত করে। এই কাব্যগ্রন্থের একশো একত্রিশটি লিরিক মৃত্যু, মানব নিয়তি, জগৎ-জীবন-জিজ্ঞাসার এক দার্শনিক আখ্যান যা সর্বদাই বিজ্ঞান ও ধর্মভাবনার দ্বন্দ্বে দীর্ণ। দ্য প্রিন্সেস কাব্যগ্রন্থে ‘টিয়ারস’, ‘আইডল টিয়ারস’, ‘দ্য স্প্লেণ্ডার ফলস অন ক্যাস্‌ল ওয়াল’ ইত্যাদি কবিতাগুলিতে ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ বা ‘মুক্তক’ ছন্দের যে ব্যতিক্রমী প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন তা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ গীতিকবিতার ঘরানায় টেনিসন লিখেছিলেন ‘ইন মেমোরিয়াম’ যাকে কখনোই প্রকৃত এলিজি বা শোক-কবিতা বলা যায় না। এই সময় তিনি চার্লস লিয়েলের ‘প্রিন্সিপালস অফ জিওলজি’ বইটি পড়ে বাইবেল কথিত পৃথিবীর জন্ম-ইতিহাস সম্পর্কে বিরূপ মত পোষণ করেন এবং এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের অনিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তিত হন যা তাঁর ‘ইন মেমোরিয়াম’ কাব্যগ্রন্থেও প্রকাশ পেয়েছে। ১৮৫৫ সালে টেনিসনের ‘মড’ নামে আরেকটি কাব্য প্রকাশ পায় আর এরপর রাজা আর্থার ও তাঁর গোল টেবিলকে ঘিরে বারোটি গাথা রচনা করেন তিনি। ভিভিয়েন, ইনিড, ইলেইন, গুয়েনভিয়ার, দ্য কামিং অফ আর্থার, দ্য হোলি গ্রেল, দ্য পাসিং অফ আর্থার, বালিন অ্যাণ্ড বালান ইত্যাদি নামে ১৮৫৯ সাল থেকে ১৮৮৫ সাল পর্যন্ত লেখা মোট বারোটি কবিতার একটি সংকলন প্রকাশ করেন টেনিসন ‘দ্য ইড্‌লস অফ দ্য কিং’ নামে। এই কাব্যগ্রন্থটি প্রায় মহাকাব্যের মতো সুসংবদ্ধ এবং রূপকাশ্রয়ী। ১৮৬৪ সালে তাঁর এক চিত্রকর বন্ধুর গল্প অবলম্বনে একটি জনপ্রিয় কাহিনি-কাব্য লেখেন অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসন যার নাম ‘এনোক আর্ডেন’ যা প্রথম প্রকাশেই প্রায় সতেরো হাজার কপি বিক্রি হয়। শুধুই কবিতা নয়, তাঁর লেখা প্রথম নাটক ‘কুইন ম্যারি’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৫ সালে। এরপর অনেকগুলি নাটক লিখেছিলেন টেনিসন যার মধ্যে ১৮৭৫ সালেই ‘হ্যারল্ড’, ১৮৮৩ সালে ‘দ্য কাপ’, ১৮৮৪ সালে ‘দ্য ফ্যালকন’ এবং ‘বেকেট’ এবং ১৮৯২ সালে ‘দ্য ফোরস্টারস’ খুবই উল্লেখযোগ্য।

তাঁর কবিতা ক্রমশ জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমেই আলফ্রেড লর্ড টেনিসন অর্থোপার্জন করতে থাকেন, যশ-খ্যাতিও বাড়তে থাকে টেনিসনের। ১৮৬১ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্ট মারা গেলে টেনিসনের লেখা ‘ইন মেমোরিয়াম’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। রোমান্টিক কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের মৃত্যুতে তিনি ‘পোয়েট লরিয়েট’ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন এবং ১৮৮৩ সাল নাগাদ রানির অনুমোদনে অল্ডওয়ার্থ ও ফ্রেসওয়াটারের ব্যারনেটের পদ লাভ করেন। তখন থেকেই তাঁর নামে ‘লর্ড’ উপাধিটি যুক্ত হয়।

পূর্বে উল্লিখিত কাব্যগ্রন্থগুলি ছাড়াও অ্যালফ্রেড লর্ড টেনিসনের লেখা অন্যান্য বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলি হল – ‘ব্যালাডস অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস’ (১৮৮০), ‘টাইরেসিয়াস অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস’ (১৮৮৫), ‘দ্য ডেথ অফ ওনোন, আকবরস্‌ ড্রিম অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস’ (১৮৯২) ইত্যাদি।

১৮৯২ সালের ৬ অক্টোবর ৮৩ বছর বয়সে আলফ্রেড লর্ড টেনিসন -এর মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

তথ্যসূত্র


  1. ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, কুন্তল চট্টোপাধ্যায়,রত্নাবলী প্রকাশনী , ৫ম সংস্করণ , ২০১২, পৃ ২৪৭-২৫১
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.poetryfoundation.org/
  4. https://www.biography.com/
  5. https://www.britannica.com/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও