সববাংলায়

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

বিভাগঃ ,

কলকাতা শহরের চিত্ররূপ কল্পনা করলে যে ছবিগুলো মাথায় আসে, তার মধ্যে অন্যতম হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি ব্রিটিশ শাসনকালের স্মৃতি বহন করে এবং একই সঙ্গে আধুনিক ভারতের পর্যটন মানচিত্রে কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত। সাদা মার্বেলের বিশাল গম্বুজ, বিস্তৃত উদ্যান আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতির আভিজাত্য – সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং কলকাতার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল। প্রতি বছর লক্ষাধিক দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে আসেন, যা এটিকে কলকাতার পর্যটন অর্থনীতির একটি প্রধান স্তম্ভে পরিণত করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতা শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। প্রশাসনিকভাবে এটি কলকাতা জেলার অন্তর্গত এবং এর চারপাশে রয়েছে ময়দান এলাকা, যা কলকাতার “ফুসফুস” নামে পরিচিত। এই বিস্তৃত সবুজ পরিসরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল শহরের দৃশ্যপটকে এক স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। কাছাকাছি রয়েছে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল, রেসকোর্স গ্রাউন্ড, আলিপুর রোড এবং একাধিক প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

১৯০১ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দীর্ঘকালীন শাসক রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল ভারতের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সময়. এই সময়েই ব্রিটিশ শাসন সুসংহত হয় এবং কলকাতা হয়ে ওঠে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। রানি ভিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ প্রশাসনের তরফে একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাব ওঠে। এই প্রস্তাবের নেপথ্যে শুধু শোকজ্ঞাপন নয়, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহিমা ও স্থায়িত্ব প্রদর্শনের একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায়ও কাজ করছিল। সেই সময় ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড কার্জন। তিনিই এই প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁর উদ্যোগেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পায়। কার্জনের ধারণা ছিল – এটি এমন একটি স্মৃতিস্তম্ভ হবে, যা শুধু একটি সমাধিস্তম্ভের মতো নীরব স্মারক নয়, বরং একটি জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে, যেখানে ব্রিটিশ শাসনকালের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ, নকশা নির্বাচন এবং তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। নির্মাণের জন্য স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কলকাতার ময়দান সংলগ্ন এলাকা, যা সেই সময় শহরের অন্যতম বৃহৎ অঞ্চল ছিল। এই জমির একটি অংশ আগে বেলভেডিয়ার এস্টেট নামে পরিচিত ছিল, যেখানে ব্রিটিশ শাসনামলের কিছু সরকারি ভবন ও আবাসন ছিল। সেগুলি ভেঙে ফেলে জায়গাটি নতুনভাবে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯০৬ সালে। এই বিশাল প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন একাধিক প্রকৌশলী, স্থপতি এবং নির্মাণ সংস্থা। মূল নকশার দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্রিটিশ স্থপতি স্যার উইলিয়াম এমারসনকে, যিনি এর আগে একাধিক ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর নকশায় ইউরোপীয় ধ্রুপদি রীতির সঙ্গে ভারতীয় স্থাপত্যের উপাদানের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে এটি স্থানীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও মানানসই হয়। নির্মাণে বিপুল পরিমাণ মার্বেল ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহৃত হয়, যার বেশিরভাগই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে নানা কারণে এর নির্মাণপর্ব দীর্ঘায়িত হয়। প্রথমত, প্রকল্পটির আকার ও জটিলতা ছিল বিপুল। দ্বিতীয়ত, অর্থায়নের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সরকারি তহবিলের উপর নির্ভরশীল ছিল না। ভারতের বিভিন্ন রাজন্যবর্গ, জমিদার এবং ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছিল। এই অনুদান সংগ্রহের প্রক্রিয়াটিও সময়সাপেক্ষ ছিল। তৃতীয়ত, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাবেও নির্মাণকাজে ধীরগতি আসে। যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক চাপ এবং উপকরণের ঘাটতি প্রকল্পের সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়।

এই সব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে এবং অবশেষে ১৯২১ সালে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হল রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত হলেও তিনি নিজে কখনও এই স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে পাননি, কারণ তাঁর মৃত্যুর দুই দশক পর এটি সম্পূর্ণ হয়।

স্বাধীনতার আগে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মূলত একটি ঔপনিবেশিক স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবেই পরিচিত ছিল, যেখানে ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস, সামরিক কৃতিত্ব এবং প্রশাসনিক নথি সংরক্ষিত হত। এটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ও স্থায়িত্বের প্রতীক। কিন্তু ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর এই স্থাপত্যের তাৎপর্য ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। ঔপনিবেশিক শাসনের স্মারক হিসেবে এটিকে ভেঙে ফেলার বা অবহেলা করার বদলে, ভারত সরকার এটিকে একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্নির্ধারণ করে। স্বাধীনতার পর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একটি ট্রাস্টের হাতে দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে সংরক্ষিত প্রদর্শনীর চরিত্রও বদলাতে থাকে। ব্রিটিশ শাসনকালের সামরিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাংলার নবজাগরণ এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা দিক এখানে যুক্ত করা হয়।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল মূলত ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে ইউরোপীয় ধ্রুপদি স্থাপত্যরীতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী নকশার সমন্বয় ঘটেছে। পুরো কাঠামোটি সাদা মার্বেলে নির্মিত, যা এর আভিজাত্য ও স্থায়িত্ব- দুটিকেই একসঙ্গে প্রকাশ করে। এই মার্বেল রাজস্থানের মাকরানা অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল, যা তাজমহলের মার্বেলের সঙ্গেও তুলনীয়। মার্বেলের উজ্জ্বলতা ও মসৃণতা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে দিনের আলোয় শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ, আবার সন্ধ্যার আলোকসজ্জায় রাজকীয় আবহ প্রদান করে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নকশা অত্যন্ত সুবিন্যস্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ। কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি বিশাল গম্বুজ, যার চারপাশে ছোট ছোট গম্বুজ ও অলংকৃত মিনারসদৃশ উপাদান যুক্ত হয়েছে। এই গম্বুজটি রেনেসাঁস ও মুঘল স্থাপত্যের প্রভাব বহন করে, যা পুরো কাঠামোর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে। মূল ভবনের চারদিকে প্রশস্ত বারান্দা ও স্তম্ভযুক্ত করিডোর রয়েছে, যা ভবনের আকার ও উচ্চতাকে আরও মহিমান্বিত করে তুলেছে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের প্রবেশপথগুলিতে খিলানযুক্ত দরজা, অলংকৃত স্তম্ভ ও সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। এই অলংকরণে ফুলের নকশা, জ্যামিতিক মোটিফ এবং ইউরোপীয় অলংকরণরীতির ছাপ স্পষ্ট। স্থাপত্যের প্রতিটি অংশে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—কোথাও অতিরিক্ত ভারী বা দৃষ্টিকটু উপাদান নেই, আবার কোথাও একেবারে অনাড়ম্বরও নয়। এই সামঞ্জস্যই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের নান্দনিক সৌন্দর্যের মূল শক্তি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই স্থাপত্যটি বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের প্রকৌশল দক্ষতার পরিচয় দেয়। বিশাল মার্বেল ব্লক স্থাপন, ভারী গম্বুজের ভারবহন ব্যবস্থা এবং বিস্তৃত ছাদের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য যে কাঠামোগত সমাধান ব্যবহার করা হয়েছিল, তা সেই সময়ের হিসাবে অত্যন্ত উন্নত ছিল। আধুনিক যন্ত্রপাতির সীমিত ব্যবহারের মধ্যেও এত বৃহৎ ও সূক্ষ্ম নির্মাণ সম্পন্ন করা প্রকৌশলগত দৃষ্টিতে এক বিরাট সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের অভ্যন্তরীণ স্থাপত্যও বহিরাঙ্গের মতোই সুপরিকল্পিত। প্রশস্ত গ্যালারি, উঁচু ছাদ, প্রশস্ত জানালা এবং আলো-বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা এটিকে একটি আরামদায়ক জাদুঘর পরিসরে পরিণত করেছে। এই অভ্যন্তরীণ বিন্যাস দর্শনার্থীদের চলাচলকে সহজ করে এবং প্রদর্শনীগুলিকে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়।

আজ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কলকাতার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য বা জাদুঘর নয়, বরং শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অবসর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন – কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ অবসর কাটাতে, কেউ শুধু সবুজ উদ্যানে হাঁটতে। এর বিস্তৃত উদ্যান এলাকা শহরের কোলাহলের মাঝে এক শান্ত আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। পর্যটনের ক্ষেত্রে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষাধিক পর্যটক এই স্মৃতিস্তম্ভ দেখতে আসেন। এর ফলে স্থানীয় গাইড, দোকানদার, আলোকচিত্রী, পরিবহনকর্মী এবং হস্তশিল্প বিক্রেতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হন। পর্যটনকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন পরিষেবা গড়ে উঠেছে, যা শহরের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কলকাতার পরিচিতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। শহরের নাম উচ্চারিত হলেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা গম্বুজের ছবি মানুষের মনে ভেসে ওঠে। সরকারি প্রচার, পর্যটন বিজ্ঞাপন, পোস্টকার্ড, চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রে এটি নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকে। বহু চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্মে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল কলকাতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করেছে।

ভারতের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে যেমন স্বাধীনতা দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবসের সময় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ইতিহাসভিত্তিক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়, যা এই স্থাপত্যকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিণত করেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading