লাভপুর

লাভপুর

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত বীরভূম জেলার একটি অন্যতম প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিজড়িত জনপদ হল লাভপুর (Labpur)। বোলপুর সাব ডিভিশনের অন্তর্গত লাভপুর সম্প্রদায় উন্নয়ন ব্লকের অধীনে এই লাভপুর জনপদটি গড়ে উঠেছে।

ভৌগলিক অবস্থানের বিচারে লাভপুর ২৩.৮৩০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৭.৮২০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। সমুদ্রতল থেকে এর উচ্চতা ১১৫ ফুট। ময়ূরাক্ষী নদীর প্লাবনভূমির মধ্যেই এই জনপদটি অবস্থিত। ফলে ম্যাসাঞ্জোর এবং তিলপাড়া বাঁধ থেকে যখন বহুল মাত্রায় জল ছাড়া হয়, সেই সময় সম্পূর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ২০০৬ সালে শুধুমাত্র এই বাঁধের জল ছাড়ার কারণে সংঘটিত বন্যায় লাভপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ জলে ডুবে মারা গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। শুধুমাত্র ময়ূরাক্ষী নদীই নয়, এর বুক চিরে বয়ে গেছে অজয় নদ। লাভপুরের উত্তরে ময়ূরেশ্বর এবং বারোয়ান, দক্ষিণে নানুড়, পূর্ব দিকে কেতুগ্রাম এবং পশ্চিমে রয়েছে বোলপুর শান্তিনিকেতন। সমগ্র জনপদটি উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঢালু।

ঐতিহাসিকদের মতে, লাভপুরের আগের নাম ছিল সামলাবাদ। বণিকদের মুখে মুখে এই অঞ্চলের বন্দর পরিচিত হয়েছিল ‘লা-ঘাটা’ বন্দর নামে। কীভাবে এই সামলাবাদ তথা লা-ঘাটা থেকে জনপদটি লাভপুর নামে পরিচিত হল, তার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সুপ্রাচীনকালে সামলাবাদ ছিল দীনবন্ধু মিশ্র বাহাদুরের রাজত্বের অন্তর্গত এবং বর্তমান লাভপুরের সংলগ্ন অট্টহাস, ফুলিয়ানগর, সভ্রাজপুর, কর্ম্মাবাজ, শ্রীবাকুল, গণেশপুর ইত্যাদি বহু অঞ্চলে দীনবন্ধু মিশ্রের শাসনই কায়েম ছিল। ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন বাংলায় বর্মণদের শাসনকালে রাজা সামল বর্মার অনুগ্রহে দীনবন্ধু মিশ্র এই জনপদ পেয়েছিলেন বলে রাজার নামানুসারে এই জনপদের নাম তিনি রেখেছিলেন সামলাবাদ। এক সময় নাকি মহম্মদ বিন তুঘলকের এক তুর্কী সৈনিক ওসমানের সঙ্গে যুদ্ধে সামলাবাদ রাজ্যের পতন হয়েছিল।

সুলতান মামুদ যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন মিথিলা থেকে একদল বেদানুসারী ব্রাহ্মণ বিতাড়িত হয়ে বর্মণ রাজ হরি বর্মার অনুমতিক্রমে মহা সন্ধিবিগ্রহিক ভবদেব ভট্ট তাঁদেরকে দেবী ফুল্লরার পূজার জন্য নিয়ে আসেন শিতলগ্রামে। সেই সময় এই গ্রামের নাম ছিল সিদ্ধলগ্রাম। এই ফুল্লরার মন্দিরের নিকটবর্তী ফুলিয়ানগর, বাকুল ও অট্টহাস অঞ্চলে তাঁরা বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই ব্রাহ্মণদের মধ্যেই দীনবন্ধু মিশ্র পরবর্তীকালে বর্মণ রাজা হন এবং ‘বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন। তখন ফুল্লরা মন্দিরের কাছেই দীনবন্ধু মিশ্রের রাজধানী গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিচার-বিশ্লেষণ করে বলেন যে মোট সাতটি জনপদ নিয়ে এই সামলাবাদ রাজ্য গড়ে উঠেছিল। ভবদেব ভট্ট যে ব্রাহ্মণদের নিয়ে এসেছিলেন আজও নাকি তাঁদেরই বংশধরেরা এখানকার ফুল্লরা মন্দিরে পূজা করে আসছেন। সামলাবাদে তুর্কী সৈনিক ওসমানের সঙ্গে যে যুদ্ধ হয়েছিল তার সাক্ষ্য বহন করে এখানকার ‘লড়িয়ে’ পুকুরটি। ঐ পুকুর থেকেই একটি বাসুদেব মূর্তি উদ্ধার হওয়ায় স্থানীয় জমিদার যাদবলালা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পুকুরের নাম দেন গোবিন্দসায়র। আজও এখানে ওসমানের গড়ের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। ১৯১৭ সালে লাভপুরে ম্যাকলয়েড অ্যান্ড রাসেলস কোম্পানির উদ্যোগে আমোদপুর-কাটোয়া রেলপথ স্থাপিত হয়। এই রেলপথই স্থানীয় মানুষদের মুখে মুখে ‘ছোট রেললাইন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিল।

এই লাভপুরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে ফুল্লরা সতীপীঠের নামও। স্থানীয়দের জনশ্রুতি অনুসারে, কাশীর মণিকর্ণিকা ঘাটে সাধনারত কৃষ্ণানন্দ গিরি এক স্বপ্নাদেশ পেয়ে লাভপুরে এসে দেবীকে ফুল্লরা রূপে পূজা করেছিলেন। মাঘী পূর্ণিমার দিনে তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন, তাই আজও এই স্মৃতিকে মনে রেখে ফুল্লরা সতীপীঠের প্রাঙ্গণে ও তৎসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘ দশ-বারো দিন ধরে মেলা বসে। ভবদেব ভট্ট যে ব্রাহ্মণদের এই অঞ্চলে নিয়ে এসেছিলেন, তারও আগে ভবদেবের পূর্বপুরুষ অট্টহাস এই অঞ্চলের প্রথম সাধকের মর্যাদা পেয়েছিলেন। অট্টহাসের বাবা বশিষ্ঠ সেই সময়কার বাংলার রাজা আদিশুরের কাছ থেকে শীতলগ্রাম বা সিদ্ধলগ্রাম পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।  

লাভপুর বললেই দৃশ্যপটে প্রথমে ভেসে ওঠে বরেণ্য কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। এই লাভপুরেই তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ১৯৯৮ সালের ২৮ জুলাই তারাশঙ্কর লাভপুরে জন্মেছিলেন। এই লাভপুরেরই দুই চিকিৎসক বঙ্কিম মুখোপাধ্যায় এবং সুকুমার চন্দ্রের আদলে তারাশঙ্কর তাঁর ‘হাঁসুলীবাঁকের উপকথা’ উপন্যাসে ফটিক ও বিশু ডাক্তারের চরিত্র অঙ্কন করেছিলেন। লাভপুরের অনতিদূরেই ছিল এই হাঁসুলী বাঁক। মূলত কোপাই নদীরই একটি অংশ ছিল এই বাঁকটি। শুধু এই উপন্যাসটিই নয়, তারাশঙ্করের অন্যান্য আরো কয়েকটি উপন্যাস এবং ছোটগল্পে লাভপুরের প্রকৃতি ও মানুষজনের ছায়াপাত ঘটেছে। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের জন্ম হয়েছিল লাভপুরের কাছেই দাঁড়কায়।

লাভপুরের সাক্ষরতার হার অনেকটাই বেশি, প্রায় ৮৪.২৬ শতাংশ। এই অঞ্চলের শিক্ষার মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে লাভপুরের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। লাভপুরের শম্ভুনাথ কলেজ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। এই কলেজটিই এখানকার সুপ্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য এবং কলকাতা উচ্চ আদালতের বিচারপতি শম্ভুনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে এই কলেজের নামকরণ করা হয়। এই কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন ড. কে. ডি রায় এবং লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের জন্যও এই প্রতিষ্ঠান গৌরবান্বিত হয়েছে। তাছাড়া শিক্ষক-শিক্ষণের জন্য আরো দুটি কলেজে এখানে স্থাপিত হয়েছে – লাভপুর টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (বি. এড) এবং লাভপুর টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ডি. এল. এড)। লাভপুরের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী স্কুলগুলির মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ্য ১৯০১ সালে স্থাপিত লাভপুর যাদবলাল উচ্চ বিদ্যালয় (উ: মা:)। অন্যান্য স্কুলগুলির মধ্যে রয়েছে সত্যনারায়ণ শিক্ষানিকেতন গার্লস হাই স্কুল (১৯৫৮), গোপালপুরের জওহর নবোদয় বিদ্যালয় (২০০৭), লাভপুর জুনিয়র হাই মাদ্রাসা (১৯৭৭), লা ঘাটায় সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুল (২০০৫) এবং জাকির হোসেন মাইনরিটি এডুকেশন সোসাইটি। ১৯৪৬ সালে লাভপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় জগদম্বা জুনিয়র বেসিক স্কুল। এই অঞ্চলের প্রাচীনতম প্রাথমিক বিদ্যালয় এটি। অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সন্দীপন পাঠশালা’ (১৯৮৩), শম্ভু মুখার্জী স্মৃতি প্রামাণিক বিদ্যালয় (১৯৯৯), বিশ্বেশ্বরী স্মৃতি শিশু শিক্ষা মন্দির (১৯৭৭), ভাস্বতী বিদ্যাপীঠ (২০০৫) ইত্যাদি। এখানকার ‘সন্দীপন পাঠশালা’র নামে আদপেই তারাশঙ্করের একটি উপন্যাস নামাঙ্কিত।

লাভপুর মূলত দুর্গাপূজার জন্যেই অধিক পরিচিত। তবে এখানকার জগদ্ধাত্রী পূজা এবং রাসযাত্রার জনপ্রিয়তাও কম নয়। প্রায় ২০০ বছর ধরে লাভপুরের ব্যানার্জী পরিবার এখানে জগদ্ধাত্রী পূজার আয়োজন করে আসছে। জগদ্ধাত্রী পুজোর কয়েক দিন পরে রাসযাত্রার দিনে ঠাকুরবাড়ি থেকে রথতলা পর্যন্ত এক বিরাট বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরোয়। এই রাসযাত্রাকে ঘিরেই প্রতি বছর কৃষ্ণপূজার আসর বসে। অন্য জনপ্রিয় উৎসবের মধ্যে রয়েছে ফুল্লরা মেলা। প্রত্যেক মাঘী পূর্ণিমায় এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তাছাড়া লক্ষ্মীপূজা, রক্ষাকালীর পূজা, মহাশিবরাত্রির পাশাপাশি ঈদুজ্জোহা কিংবা মহরমও জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হয় লাভপুর জুড়ে।

বীরভূমের লোকসংস্কৃতির এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বোলান, আলকাপ বা বহুরূপী সাজার রীতি-রেওয়াজ আজও লাভপুরের মাটিতে টিকে রয়েছে। প্রায় বছরই এখানে স্থানীয় লোকসংস্কৃতিকে বাঁচাতে আয়োজিত হয় ‘লোকসংস্কৃতি মেলা’। এখানকার ‘বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী’ স্থানীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক রূপে কাজ করে আসছে।

লাভপুরের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ‘ধাত্রীদেবতা’ নামাঙ্কিত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িটি। তাছাড়া রয়েছে অন্যতম বিখ্যাত ফুল্লরা সতীপীঠ, বাবুপাড়ার ব্যানার্জীদের জগদ্ধাত্রী মন্দির, গোবিন্দসায়র এবং ঠাকুরবাড়ি। লাভপুর রেল স্টেশন থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ঠাকুরবাড়ি মার্বেল পাথরে নির্মিত এক সুপ্রাচীন মন্দির যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সত্যনারায়ণ ব্যানার্জী। বিখ্যাত রাসযাত্রা আয়োজিত হয় এখানেই। তারাশঙ্করের পঞ্চগ্রাম, গণদেবতা, হাঁসুলীবাঁকের উপকথা কিংবা সন্দীপন পাঠশালা পড়লে যে রুক্ষ ধূসর বালুময় ভূমিরূপের ছবি পাই, তা লাভপুরেরই প্রতিচ্ছবি। বহু রাজা-রাজড়াদের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও লাভপুর প্রগতির পথে বহমান।

আপনার মতামত জানান