ইতিহাস

প্রণব কুমার মুখার্জী

প্রণব কুমার মুখার্জী ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি। তিনি ২০১২ – ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। এর আগে প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম একজন নেতা হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি ভারত সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি পদে নিযুক্তির পূর্বে প্রণব মুখার্জী ২০০৯ – ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁকে ২০০৮ সালে ‘পদ্মবিভূষণ’ ও ২০১৯ সালে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়। তিনি ষষ্ঠ বাঙালি যিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন উপাধি পান।

প্রণব মুখার্জী ১৯৩৫ সালের ১১ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মিরাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম কামদা কিঙ্কর মুখার্জী ও মায়ের নাম রাজলক্ষ্মী মুখার্জী। প্রণব মুখার্জীর বাবা কিঙ্কর মুখার্জী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৫২ – ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ আইন পরিষদে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

প্রণব মুখার্জী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়য়ের অধীনে থাকা বীরভূমের ‘সিউরি বিদ্যাসাগর কলেজ’-এ সান্মানিক স্তরের পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রি এবং এল.এল.বি ডিগ্রি লাভ করেন।

প্রণব মুখার্জীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬৩ সালে কলকাতায় ডেপুটি অ্যাকাউনট্যান্ট-জেনারেলের অফিসে একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিসেবে। এরপর তিনি কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে অ্যাসিট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে নিযুক্ত হন। রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশের পূর্বে তিনি বেশ কিছুদিন ‘দেশের ডাক’ শীর্ষক বাংলা সংবাদপত্রে সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করেছিলেন।

প্রণব মুখার্জীর রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ ১৯৬৯ সালে। ওই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সহায়তায় প্রণব মুখার্জী রাজ্যসভায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান। এরপরে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার সামলেছেন। ১৯৭৮ সালে তিনি রাজ্যসভায় ভারতীয় জাতীয় কগ্রেসের ডেপুটি লিডার হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপরে ১৯৮০ সালে রাজ্যসভায় ‘লিডার অফ হাউস’-এর পদ-ও সামলান।

১৯৮২ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সময়কালে তিনি প্রথম কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময়কালে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলির উন্নতিসাধন ও উপযুক্ত নীতি প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ‘ইন্টারন্যাশানাল মানিটারি ফান্ড’ (IMF) থেকে নেওয়া ভারতের প্রথম লোনের অন্তিম কিস্তিটি সুষ্ঠুভাবে মেটানোর ব্যবস্থা করা। ১৯৯১ সালে তাঁকে প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই পদে আসীন থাকাকালীন ভারতের অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে নতুনভাবে সাজানোর ক্ষেত্রে প্রণব মুখার্জীর বিশেষ অবদান রয়েছে।

১৯৯৫ সালে পি.ভি নরসিংমা রাও-এর নেতৃত্বাধীন সরকারে প্রণব মুখার্জী প্রথমবারের জন্য পররাষ্ট্র দফতরের দায়িত্ব পেয়ে দক্ষতার সঙ্গে তা সামলান।এরপর প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা (২০০৪ – ২০০৬), পররাষ্ট্র নীতি (২০০৬ – ২০০৯) ও অর্থমন্ত্রক (২০০৯ – ২০১২) -এর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলিও তিনি সামলেছেন। ২০০৯ – ২০১২ সময়কালে অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল ‘জওহরলাল নেহেরু ন্যাশানাল আরবান রিনিউয়াল মিশন’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনায় তহবিল (funding) বৃদ্ধি করা। এর পাশাপাশি ২০০৪ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য লোকসভায় ‘লিডার অফ হাউস’-এর পদ অলংকৃত করেন।

প্রণব মুখার্জীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ২০১২ – ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়কালকে। ২০১২ সালে তিনি ভারতের ত্রয়োদশ তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদকে অলংকৃত করেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ২০১৩ সালে ‘ক্রিমিনাল ল সংশোধন বিল’-এ সম্মতি প্রদান করা।

প্রণব মুখার্জী ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই শুভ্রা মুখার্জীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুভ্রা মুখার্জী পরলোক গমন করেন। তাঁদের দুই সন্তান – এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে অভিজিৎ মুখার্জী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ও পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে দু’বার বিজয়ী হয়েছেন। মেয়ে শর্মিষ্ঠা একজন কত্থক নৃত্যশিল্পী।

রাজনীতিতে সক্রিয় ভুমিকা পালনের পাশাপাশি প্রণব মুখার্জী রাজনীতি সম্পর্কিত একাধিক বই-ও লিখেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হল ‘দ্য ডরামাটিক ডেকেডঃ দ্য ইন্দিরা গান্ধী ইয়ারস’, ‘দ্য কোয়ালিশান ইয়ারস’ ইত্যাদি। ২০০৮ সালে তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়। ২০১০ সালে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ও ইন্টারন্যাশানাল মানিটারি ফান্ডের দৈনিক সংবাদপত্র ‘ইমারজিং মার্কেটস’ তাঁকে ‘ফিন্যান্স মিনিস্টার অফ দ্য ইয়ার ফর এশিয়া’ সম্মানে ভূষিত করে। ভারতীয় রাজনীতিতে ও ভারতের সামগ্রিক বিকাশে প্রণব মুখার্জীর সারা জীবনব্যাপী বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাঁকে ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!