ইতিহাস

বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী

বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী (Bijoy Krishna Goswami) ইংরেজ শাসন কালের একজন প্রখ্যাত হিন্দু সমাজ সংস্কারক ও বৈষ্ণব সাধকপুরুষ ছিলেন। তিনি আদি ব্রাহ্মসমাজ ও কেশবচন্দ্র সেন স্থাপিত নববিধান ব্রাহ্মসমাজের সর্বময় আচার্য পদেও আসীন ছিলেন। বিদ্যাসাগরের সাথে তিনিও স্ত্রী শিক্ষা প্রবর্তন ও বাল্য বিবাহ রদের জন্য লড়াই করেছেন একসময়ে।

১৮৪১ সালের ২ আগস্ট অধুনা নদীয়া জেলার শিকারপুরে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী -র জন্ম হয়। তাঁর বাবা আনন্দ কিশোর গোস্বামী এবং স্বর্ণময়ী দেবীর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। কথিত আছে, আনন্দ কিশোর স্বপ্নে জগন্নাথদেবের দর্শন পেয়েছিলেন এবং জগন্নাথদেব তাঁর ঘরে জন্ম নেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। বৈষ্ণব গুরু অদ্বৈত আচার্যের দশম বংশধর ছিলেন বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী। আনন্দ কিশোরের পরিবারে শ্যামসুন্দরের বিগ্রহের নিত‍্য পুজা হত। বিজয়কৃষ্ণ তাঁর শৈশব কালে শ্যামসুন্দরকে প্রত‍্যক্ষ দেখতে পেতেন ও তাঁর সাথে গোলা খেলায় মেতে উঠতেন। শ্যামসুন্দরের প্রতি এই সখ‍্য ভাব তাঁর আজীবনের সঙ্গী ছিল। ১৮৪৪ সালে বিজয় কৃষ্ণের যখন মাত্র তিন বছর বয়স শ্রীমদ্ভাগবত আবৃত্তি কালে আনন্দ কিশোরের ভাবসমাধির মধ্যেই মৃত্যু ঘটে। বিজয়কৃষ্ণের সাথে যোগমায়াদেবীর বিবাহ হয়েছিল।

বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর বিদ্যাশিক্ষা শুরু হয় ১৮৫০ সালে শিকারপুরের ভগবান সরকারের সংস্কৃত স্কুলে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন, ফলে অন্যান্য ছাত্রের তুলনায় পাঠ্যক্রম তাঁর তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে যেত। বিজয়কৃষ্ণ শান্তিপুরে গোবিন্দ গোস্বামীর বিদ্যালয়েও শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। বিদ্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত হলে ১৮৫৯ সালে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে বিজয় কৃষ্ণ ভর্তি হন। এই সময়ে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী কলকাতা মেডিকেল কলেজে মেডিসিন নিয়েও পড়াশোনা করেন। এখানে পড়াকালীন সময়ে এক ব্রিটিশ অধ্যাপকের বর্ণ বৈষম্যমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ভারতে ধর্মঘটের ডাক দেন। পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ায়, শেষে বিদ্যাসাগরের মধ্যস্থতায় এর নিষ্পত্তি ঘটে। কলেজে পড়াকালীন বেদান্ত পড়তে গিয়ে এই দিকে তাঁর প্রবল উৎসাহ গড়ে ওঠে এবং অচিরেই তিনি তাঁর চিকিৎসক হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। মেডিকেল কলেজ ছেড়ে তিনি হোমিওপ্যাথি নিয়ে পড়াশোনা করে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে অনুমোদন বা স্বীকৃতি লাভ করেন।

তিনি এরপরে নদীয়ার শান্তিপুরে ফিরে এসে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ক্লিনিক (clinic) খোলেন এবং নামমাত্র পয়সার বিনিময়ে রোগী দেখতে শুরু করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা পয়সায়ও চিকিৎসা করতেন তিনি। গরীব দুঃখীর কষ্টে তিনি সর্বদাই বিচলিত হয়ে পড়তেন। একবার এক রোগীকে ওষুধ দেওয়ার পর, ঠিক মত তাঁর খবর না পেয়ে অস্থির বিজয় কৃষ্ণ তাঁর ক্লিনিক বন্ধ করে দূরান্তে সেই রোগীর বাড়ি যাওয়া সাব্যস্ত করেন। প্রচন্ড বৃষ্টি ও দুর্যোগের মধ্যে কোন নৌকা না পেয়ে কাচের পাত্রে ওষুধগুলি বেঁধে নিয়ে, নিজের মাথার পাগড়ির সঙ্গে বেঁধে, সাঁতরে নদী পেরিয়ে রোগীর বাড়ি পৌঁছান তিনি। ঐ রোগী সেরে না ওঠা পর্যন্ত তিনি তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে গেছিলেন।চিকিৎসা চালিয়ে যাবার সাথে সাথেই উপনিষদের প্রতি প্রবল অনুরক্ত হয়ে ওঠেন তিনি। এর সাথে শঙ্করাচার্য নির্দেশিত একেশ্বরবাদের প্রতিও তিনি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

কলকাতায় থাকার সময় থেকেই ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে বিজয়কৃষ্ণের যোগাযোগ তৈরি হয়। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও তাঁর একান্ত নৈকট্য ছিল। ১৮৬৪ সালে বিজয়কৃষ্ণ ব্রাহ্মসমাজের আচার্য পদ গ্রহণ করে নানান স্থান ভ্রমণ করে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। এই সময়ে তিনি কখনো বা আশ্রয়হীন কখনো বা খাদ্য বিহীন হয়ে বাঘ, সাপ ও ম্যালেরিয়া সঙ্গে লড়াই করে অজ্ঞ মানুষের মধ্যে পরম সত্যের বার্তা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। হিন্দু ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে চলে যাওয়ার কারণে তাঁকে পৈত্রিক ভিটে ছাড়তে হয়।

কলকাতায় থাকাকালীন বিজয়কৃষ্ণ নব্য ব্রাহ্মসমাজের (কেশবচন্দ্র সেন প্রবর্তিত) আচার্য হন এবং বিভিন্ন পত্র পত্রিকাতে সমাজ সংস্কারমূলক প্রবন্ধ লিখতে থাকেন। উমেশ চন্দ্র দত্ত সম্পাদিত ব্রহ্মবোধিনী পত্রিকায় তিনি ‘আশাবাতি’ ছদ্মনামে লিখতে থাকেন পরে যেগুলি ‘আশাবাতির উপাখ্যান’ নামে একটি বই হয়ে প্রকাশিত হয়। তাছাড়াও তত্ত্ববোধিনী ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতি পত্রিকাতেও তাঁর বিভিন্ন লেখা বেরোয় । বিজয়কৃষ্ণের প্রচেষ্টায় ১৮৭৪ সালে ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে সংকীর্তন আন্দোলন ঘটে। তিনি এই সময়ে বেশকিছু ব্রহ্মসংগীত রচনা করেন। তিনি বিহার, উত্তর প্রদেশ,আসাম ও পাঞ্জাবের নানা স্থানে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারে গেছিলেন। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ বিভাজিত হয়ে যায়- সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ এবং নববিধান ব্রাহ্ম সমাজ এই দুই গোষ্ঠীতে। নববিধান ব্রাহ্ম সমাজের নেতা হন কেশব চন্দ্র সেন। এই বিভাজন তাঁকে প্রবল দ্বিধার মধ্যে ফেলে দেয়। তাঁর মনে হয় ব্রাহ্মধর্মে ঈশ্বরের উপলব্ধি সম্পূর্ণ হয় না। তখনই তিনি গুরুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাঁর অস্থির আত্মা এই রকম নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অন্যান্য ধর্মের পথের খোঁজ করেও তৃপ্ত হয় না। ব্রহ্মানন্দ পরমহংস তখন তাঁকে পথ দেখান। তিনি বলেন যে একজন সদ্গুরুর সংস্পর্শে না এলে কখনোই ধর্মীয় আত্মোপলব্ধি সম্ভব নয়। বিজয়কৃষ্ণ তাঁকে নিজের গুরু হতে বলায় ব্রহ্মানন্দ তাঁকে বলেন ঈশ্বরের নির্দেশ না এলে গুরু হওয়া যায়না। এই কথা শুনে অস্থির বিজয়কৃষ্ণ কিছুদিনের ছুটি নিয়ে সদ্গুরুর খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। সর্বত্র সকল সাধুরাই তাঁকে বলেন যে বিজয়কৃষ্ণের সদ্গুরু তাঁরই অপেক্ষায় আছেন। তিনি হিমালয়ের পাদদেশে জঙ্গলে জঙ্গলে,গঙ্গার ধারে, নর্মদার তীরে ঘুরে বেড়ান। সেখানে বাউল, কবীর, লামা, রামাইৎ, যোগী, তান্ত্রিক, অঘোরী সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসেন কিন্তু তাঁর গুরু অধরাই থেকে যায়। কাশীতে গিয়ে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁর কাছে শিবমন্ত্র গ্রহণ করলেও ত্রৈলঙ্গ স্বামীর আচার আচরণে তাঁকে তিনি মনে প্রানে গুরু স্বীকার করতে দ্বিধা বোধ করেন। এরপরে তিনি গয়া গিয়ে রামাইৎ সাধু রঘুবর দাস বাবাজীর আশ্রমে থাকেন। একদিন তিনি পাহাড়ের উপরে তাঁর পরম আরাধ্য ব্রহ্মানন্দ পরমহংসকে যোগসমাধিস্থ অবস্থায় দেখতে পান ও তাঁর কাছে যান। সদ্গুরু তাঁকে আলিঙ্গন করেন এবং শক্তিশালী মন্ত্রোচ্চারণ করেন। মন্ত্র শুনে বিজয়কৃষ্ণ সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন এবং টানা এগারো দিন সমাধিস্থ থাকেন। চরম ঈশ্বরোপলব্ধি ঘটে তাঁর। গুরুর আদেশে মানুষকে এই চেতনার সন্ধান দেওয়া শুরু করেন তিনি।

প্রবল ভাববাদ একদিকে, অন্যদিকে নিরাকার উপাসনা এই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে বিজয়কৃষ্ণ ঈশ্বরোপলব্ধিতে দ্বিধাদীর্ণ হয়ে ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচার থেকে সরে আসেন,এবং পরবর্তীকালে সাধন ভজনেই তিনি আত্মসমাহিত হন। ঢাকার গেণ্ডারিয়াতে
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর শিষ‍্যরা তাঁর সাধন আশ্রম তৈরি করে দেন যেখানে তিনি সপরিবারে এবং সশিষ‍্য বাস করেন। এখানেও তিনি তাঁর ধর্মতত্ত্ব প্রচার করতে থাকেন। তিনি এইসময় থেকে ‘আকাশ বৃত্তি’ গ্রহণ করেন ও কোন ভাবে কোন কিছুর আশা করা বন্ধ করে দেন। তিনি এইসময় ‘অজপা সাধনা’য় মনোনিবেশ করেন।

শেষ জীবনে বিজয়কৃষ্ণ পুরীতে যান সেখানে তাঁকে জাটিয়া বাবা বলে অভিহিত করা হয়। ১৮৯৯ সালে পুরীতে তাঁর মৃত্যু হয় এবং এখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ষট পঞ্চমী ব্রত



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন