বিজ্ঞান

সাপ আমাদের উপকার করে কীভাবে

প্রকৃতিতে প্রত্যেক প্রাণী এবং উদ্ভিদেরই কোন না কোন অবদান রয়েছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এককোষী জীব থেকে বিশাল বড় গাছ বা হাতি, সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সাপের বিষ মানুষকে মেরে ফেলে তাই সাপ সংক্রান্ত নানা ভীতি কম বেশি সমাজের সকল স্তরের মানুষের মধ্যেই রয়েছে। অনেকেই মনে করেন আমাদের জীবনে সাপের কোন উপকারিতা নেই। সেই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমরা এখানে সাপ আমাদের উপকার করে কীভাবে তা জানবো।

সাপ বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের খাদক, অর্থাৎ সাপ অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণী যেমন ইঁদুর, ব্যাঙ, খরগোশ ইত্যাদি খেয়ে থাকে। একটু বড় সাপ যেমন অজগর বা অ্যানাকন্ডা অনেক সময় বড় আয়তনের বন্যপ্রাণী যেমন হরিণ, শুকর ইত্যাদি খায়। অর্থাৎ সাপ না থাকলে এই সব প্রাণীদের সংখ্যা অত্যাধিক বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। তখন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে সাপের সংখ্যা কমে গেলে সেখানে ফসলের জন্য ক্ষতিকারক জীবজন্তু যেমন ইঁদুরের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। প্রখ্যাত সংবাদপত্র দ্যা গার্ডিয়ান (The Guardian)-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০০৮ সালে ভারতের মিজোরামে এক প্রজাতির বাঁশগাছে প্রায় ৪৮ বছর পর ফল আসার জন্য ইঁদুরের খাদ্যের প্রাচুর্য দেখা দেয় এবং তাদের অত্যাধিক হারে বংশবৃদ্ধি ঘটে। এরপর সেই বাঁশগাছের ফল ইঁদুররা খেয়ে শেষ করে ফেললে তাদের খাদ্যাভাব দেখা দেয়, এবং তারা চাষের জমির ফসল খেয়ে নষ্ট করতে থাকে। এতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ সেই বছর দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়। অর্থাৎ ইঁদুরের সংখ্যা বেড়ে গেলে সেটা মানুষের খাদ্যাভাবের কারণ হয়। সাপ ইঁদুরের সংখ্যা কমিয়ে আমাদের খাদ্যের অভাব হতে দেয় না।

যেসব সাপ মাটির নীচে গর্ত বানিয়ে থাকে তারা চাষের জমির মাটির ভিতর বায়ু প্রবেশ করিয়ে গাছের শিকড়ের বৃদ্ধি বজায় রাখে। জমি যত বায়ুপূর্ণ হয়, গাছের শিকড় তত ভালো বাড়তে পারে।

সাপের যে শুধু কৃষিকাজে সাহায্য করে তাই নয়, বিষাক্ত সাপের বিষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধও পাওয়া যায়। টক্সিনস (Toxins) জার্নালে বেরনো গবেষণাপত্র থেকে জানা যায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের food and drug administration (FDA) ইতিমধ্যেই সাপের বিষ থেকে তৈরি বেশ কিছু ওষুধের ব্যবহারে সম্মতি দিয়েছে। এই ওষুধগুলোর মধ্যে অন্যতম হল Captopril, Integrilin, Aggrastat ইত্যাদি। অর্থাৎ সাপের বিষ শুধুমাত্র মানুষ মারে – এই কথাটা ঠিক নয়, সেটা থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধও তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশের প্রাচীন চিকিৎসাপদ্ধতিতে সাপের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং বিষের বহুল ব্যবহার প্রচলিত আছে। আয়ুর্বেদের একটা শাখার নামই “বিষচিকিৎসা”। চীন দেশেও প্রাচীনকাল থেকে সাপ ও তার বিষের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। চর্মরোগ, বাতের ব্যাথায় সাপের বিষ ব্যবহারের লিখিত প্রমাণ আছে।

চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে সাপ বহুল প্রচলিত খাদ্যের মধ্যে অন্যতম। এমনকি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জনজাতি এবং আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যেও সাপ খাওয়ার চল রয়েছে। সাপের মাংস তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রোটিনের অন্যতম উৎস। থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে মৃত সাপে ভেজানো ওয়াইন স্বাস্থ্যবর্ধক হিসাবে পান করা হয়।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে সাপ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায়, ক্ষতিকারক জীবজন্তুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, বেশ কিছু দেশে সাপ বহুল প্রচলিত খাদ্যও বটে। এছাড়াও সাপের বিষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধও তৈরি হয়। অর্থাৎ সাপ আমাদের শত্রু নয়, বন্ধু। বাস্তুতন্ত্রের রক্ষাসহ নিজেদের বিভিন্ন উপকারের জন্যই সাপকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। সাপ আমাদের উপকার করে কীভাবে জানার পরও অনেকের মনে সাপ নিয়ে কিছু ভয় থাকেই য অমূলক নয়। তাই সাপ সংক্রান্ত ভীতি কাটানোর জন্য সাপের কামড় এড়িয়ে চলবেন কীভাবে এখানে ক্লিক করে জেনে নিন এবং তারপরেও যদি সাপ একান্তই কামড়ায় তাহলে কী করবেন সেই বিষয়ে এখানে ক্লিক করে জেনে রাখুন। সাপ সংক্রান্ত নানা তথ্য যদি আগে থেকে জেনে রাখেন তাহলে সাপ সম্পর্কিত ভীতি কেটে যাবে এবং এদের রক্ষায় সচেষ্ট হবেন।

তথ্যসূত্র


  1. https://savethesnakes.org/
  2. https://www.theguardian.com/
  3. http://www.itmonline.org/
  4. https://en.m.wikipedia.org/
  5. El-Aziz et al, 2019. Snake Venoms in Drug Discovery: Valuable Therapeutic Tools for Life Saving. Toxins (Basel); 11(10):564.

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: সাপ কীভাবে আমাদের উপকার করে – সহজ বিজ্ঞান

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন