ইতিহাস

আলি আকবর খান

আলি আকবর খান

ভারতের বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে অন্যতমএক নাম ওস্তাদ আলি আকবর খান (Ali Akbar Khan)। মূলত মাইহার ঘরানার হিন্দুস্তানি ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারার এক অত্যন্ত গুণী সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি অসাধারণ সরোদ বাজাতে পারতেন। তাঁর বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কাছ থেকেই তিনি মূলত সঙ্গীতের তালিম নেন এবং পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলি আকবর কলেজ অফ মিউজিক’। পাশ্চাত্যে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য আলি আকবর খানের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। সান্তা ক্রুজের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সঙ্গীতের অধ্যাপনাও করেছেন।

১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শিবপুর গ্রামে আলি আকবর খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা আলাউদ্দিন খান একজন স্বনামধন্য সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল মদিনা বেগম। আলি আকবর খানের জন্মের পরেই তাঁদের পরিবার অধুনা মধ্যপ্রদেশের মাইহারে চলে আসে। সেখানে তাঁর বাবা আলাউদ্দিন খান যোধপুরের মহারাজার দরবারি সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। প্রথমে জুবেদা বেগমের সঙ্গে আলি আকবর খানের বিবাহ হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এরপরে তিনি রাজদুলারী খান সাহিবা এবং সবশেষে মেরি খানকে বিবাহ করেন। তাঁর সন্তানদের মধ্যে ছয়জন এবং এক নাতি পরবর্তীকালে বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী হন। তাঁর সেই ছয় সন্তানের নাম হল যথাক্রমে আশীষ খান দেবশর্ম্মা, ধ্যানেশ খান, আমীনা পেরেরা, প্রাণেশ খান, রাজেশ খান, আলম খান এবং মানিক খান এবং তাঁর নাতির নাম সিরাজ আলি খান।  

মাত্র তিন বছর বয়সেই তাঁর বাবার কাছে কন্ঠসঙ্গীতে হাতেখড়ি হয় তাঁর। উত্তর ভারতের ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারা সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে প্রাচীন এবং সেই ঐতিহ্যবাহী ধারার এক অন্যতম জনপ্রিয় ও গুণী শিল্পী ছিলেন তাঁর বাবা আলাউদ্দিন খান। ষোড়শ শতাব্দীর ভারতে মোগল সম্রাট আকবরের দরবারি সঙ্গীতশিল্পী তানসেনের সময় থেকে রামপুর রাজ্যের দরবারি শিল্পী মহম্মদ ওয়াজির খান পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ ঘরানার সঙ্গ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন আলি আকবর খান এবং তাঁর বাবা। তাঁর বাবার কাছেই আলি আকবর খান বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও শিখেছিলেন। পরে যদিও তিনি সরোদ বাদনের প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রতিদিন ভোর হওয়ার আগে থেকেই আলাউদ্দিন তাঁর পুত্র আলি আকবরের তালিম শুরু করতেন এবং দিনে প্রায় ১৮ ঘন্টা পর্যন্ত রেওয়াজ করতেন আলি আকবর খান। কাকা আফতাবউদ্দিন খানের কাছ থেকে তিনি তবলা ও পাখোয়াজ বাজানোও শিখেছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই সরোদ-বাদক তিমিরবরণ এবং বাঁশিবাদক পান্নালাল ঘোষের মত বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা সকলেই আলি আকবরের বাবার কাছে সঙ্গীতের তালিম নিতে আসতেন একসময়। পরে আলি আকবরের বোন অন্নপূর্ণা দেবীও তাঁরই সঙ্গে এই রেওয়াজে অংশ নিতেন  এবং তাঁদের সহপাঠী ছিলেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। পরে ১৯৪১ সালে রবিশঙ্করের সঙ্গেই অন্নপূর্ণা দেবীর বিবাহ হয়।

১৩ বছর বয়সে ১৯৩৬ সালে এলাহাবাদে একটি সঙ্গীত সম্মেলনের মঞ্চে প্রথম জনসমক্ষে সঙ্গীত পরিবেশন করেন আলি আকবর খান। এর ঠিক তিন বছর পরেই ১৯৩৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে একত্রে সরোদ বাজান মঞ্চে। ঐ সম্মেলনে এই পরিবেশনই ছিল তাঁদের প্রথম যুগল উপস্থাপন। ১৯৩৮ সালে বম্বের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে প্রথম কণ্ঠ সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেন আলি আকবর এবং ১৯৪০ সাল থেকে প্রতি মাসেই লক্ষ্ণৌয়ের ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’-তে একটি করে গান গাইতেন তিনি। অবশেষে ১৯৪৪ সালে নিজেদের পেশাদারি সঙ্গীত-জীবন শুরু করার জন্য রবিশঙ্কর এবং আলি আকবর দুজনেই মাইহার ত্যাগ করেন। রবিশঙ্কর সেই সময় বম্বে চলে যান এবং আলি আকবর খান লক্ষ্ণৌয়ের অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কনিষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের কাজে যুক্ত হন। বেতার অর্কেস্ট্রার জন্য মাঝেমধ্যেই একক সঙ্গীত পরিবেশন এবং গানে সুরারোপ করতেন তিনি। ১৯৪৩ সালে তাঁর বাবার সুপারিশে যোধপুরের মহারাজা উমেদ সিং-এর জন্য একজন দরবারি সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত হন আলি আকবর খান। সেখানে তিনি আবৃত্তির পাশাপাশি সঙ্গীত শিক্ষা ও সঙ্গীতে সুরারোপ ও সঙ্গীত রচনা করতেও শুরু করেন, যোধপুরের মহারাজা তাঁকে ‘ওস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যগুলি বিধ্বস্ত হলে এবং ১৯৫২ সালে মহারাজা হনবন্ত সিং একটি বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে আলি আকবর খান বম্বেতে চলে যান। বম্বেতে চেতন আনন্দ পরিচালিত ‘আঁধিয়ান’ (১৯৫২) ছবিতে সুরকার হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। সেই ছবিতে তাঁর সুরে গান গেয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর। এরপরে সত্যজিৎ রায়ের ‘দেবী’, মার্চেন্ট আইভরির ‘দ্য হাউসহোল্ডার’ এবং তপন সিন্‌হার ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ইত্যাদি ছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ করার জন্য তিনি বর্ষসেরা সঙ্গীতশিল্পীর সম্মান অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে ‘সীমা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের গানে সরোদও বাজিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিচালক বার্তোলুচ্চির ছবি ‘লিটল বুদ্ধ’র জন্যও সঙ্গীত-আবহ নির্মাণ করেছিলেন আলি আকবর খান। ১৯৪৫ সালের শুরুতে বম্বের এইচএমভি স্টুডিও থেকে গান রেকর্ড করা শুরু করেন তিনি। এর জন্য তিনি সান্ধ্য রাগ, মালকোষ, চন্দ্রকোশ, নন্দকৌন এবং কৌশী কানাড়ার মিশ্রণে একটি নতুন রাগ নির্মাণ করেন যার নাম দেন আলি আকবর ‘চন্দ্রানন্দন’। সমগ্র ভারতে এই রেকর্ডটি সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের শুরুতে যদিও ‘মাস্টার মিউজিশিয়ান ফর ইন্ডিয়া এলপি’-র জন্য তিনি এই রাগের উপর আরেকটি গান রেকর্ড করেছিলেন।

ভারতের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের দেশগুলিতেও প্রচুর সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সালে আলি আকবর খান কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলি আকবর কলেজ অফ মিউজিক’। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখানো এবং তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিপুলভাবে ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৬৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে একই নামে তিনি আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন যা পরে ক্যালিফোর্নিয়ার সান রাফায়েলে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সালে পিবডি মেসন কনসার্ট (Peabody Mason Concert) সিরিজের জন্য বোস্টনে তিনি শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে একত্রে সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৯৮৫ সালে সুইজারল্যান্ডের বাসেলে এই আলি আকবর কলেজের আরেকটি নতুন শাখা গড়ে তোলেন তিনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম তিনিই একজন ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের একটি এলপি রেকর্ড তৈরি করতে সক্ষম হন। এছাড়াও আমেরিকান টেলিভিশনে তিনিই প্রথম সরোদ বাজানোর সুযোগ পান। রবিশঙ্কর, নিখিল ব্যানার্জি এবং বেহালা-বাদক এল সুব্রহ্মণ্যমের মত গুণী শিল্পীদের সঙ্গেও একত্রে বহুবার যুগলবন্দি সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন আলি আকবর খান। বিলায়েত খানের সঙ্গে যুগলবন্দি এই রকম সঙ্গীত পরিবেশনের মুহূর্তগুলি আজও রেকর্ড-বন্দি আছে। আমেরিকার বিখ্যাত ডেড ড্রামার মাইকি হার্টকে তিনি কিছুদিনের জন্য সঙ্গীতের তালিম দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের একটি কনসার্টের জন্য ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন তিনি। সেই উৎসবে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রবিশঙ্কর, আল্লারাখা, কমলা চক্রবর্তী, জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন এবং রিঙ্গো স্টার। এই অনুষ্ঠানের একটি লাইভ অ্যালবাম ও চলচ্চিত্র রেকর্ডিং পরে মুক্তি পেয়েছিল। শেষজীবনে মৃত্যুর আগে টানা চার বছর ধরে তিনি অসুস্থতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলেন। ২০০৪ সাল থেকে কিডনির সমস্যা ধরার পড়ার পর নিয়মিত ডায়ালিসিস চলত তাঁর।  

১৯৬৭ সালে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আলি আকবর খান পদ্মভূষণ উপাধি অর্জন করেন এবং ১৯৮৯ সালে তাঁকে পদ্মবিভূষণ উপাধি দেওয়া হয়। এছাড়াও ১৯৯১ সালে ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পেয়েছিলেন তিনি। তথাকথিত ‘জিনিয়াস’ অনুদানপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে তিনিই বিখ্যাত। ১৯৯৭ সালে ‘ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর দ্য আর্টস’-এর সম্মানীয় ‘ন্যাশনাল হেরিটেজ ফেলোশিপ’ পান আলি আকবর খান যা সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার জগতে সর্বোচ্চ সম্মান ছিল। সমগ্র জীবনে পাঁচবার ‘গ্র্যামি’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।

২০০৯ সালের ১৮ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার সান আলসেলমোতে ৬৭ বছর বয়সে আলি আকবর খানের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়