বঙ্গসংস্কৃতির একটি প্রাচীন শাখা হল লোকসংস্কৃতি, যার নানারকম ধারা আজও বর্তমান। পশ্চিমবাংলার একেক প্রান্তে বিবিধ লোকঐতিহ্যের অস্তিত্ব যেমন রয়েছে তেমনই নানা লৌকিক দেবতার মাহাত্ম্যও একেক স্থানে প্রচলিত। যেমন দক্ষিণবঙ্গের অর্থাৎ সুন্দরবনের অরণ্যসঙ্কুল অঞ্চলে বনবিবি, দক্ষিণ রায় প্রমুখের পাশাপাশি গাজী পীর (Gazi Pir) বা পীর বড়খাঁ গাজী (Pir Barokhan Gazi) নামে এক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন দেবতাপ্রতিম শক্তিকে মানুষ পূজা করে থাকেন। এই গাজী পীরের আসল পরিচয় সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে নানারকম মত প্রচলিত রয়েছে। তবে সাধারণভাবে তাঁকে ব্যাঘ্রকুলের অধিপতি বলেই মনে করা হয়। যেখানে বাঘের সঙ্গে প্রাণ নিয়ে লড়াই করে নিয়ত মানুষকে জীবনধারণ করতে হয়, সেখানে বাঘকে নিয়ন্ত্রণকারী অলৌকিক দেবশক্তির পূজা যে মানুষ করবেনই তাতে তো আশ্চর্যের কিছু নেই। গাজী পীর নাম শুনলে মূলত তাঁকে মুসলমান সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত দেবতা বলে মনে হলেও সেই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে গাজী পীরের থানে পূজা দিয়ে থাকেন।
গাজী পীর সুন্দরবন অঞ্চলে পীর বড়ঁখাঁ গাজী, গাজীবাবা, গাজী সাহেব, মোবারক শাহ গাজী, বরখান গাজী ইত্যাদি নামেও পরিচিত। এই গাজী পীরের আসল পরিচয়ের সন্ধান করেছেন অনেক পন্ডিত গবেষক। বিভিন্ন লোককথায় এই গাজী পীরের কথা পাওয়া যায়। সেই লোককাহিনি অনুসারেই, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বেলে-আদমপুর, মতান্তরে বৈরাটনগর গ্রামে এই গাজী পীরের জন্ম হয়েছিল। গাজী পীরের পিতা ছিলেন সেই নগরের রাজা সিকেন্দার শাহ এবং মাতা অজুপা সুন্দরী। গবেষকদের মতে দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দীর কোন এক সময়ে যখন বঙ্গদেশে ইসলাম ধর্মের সম্প্রসারণের কাল, তখনই জন্মেছিলেন তিনি। লোকসংস্কৃতি গবেষক বরুণকুমার চক্রবর্তীর মতে, গাজী পীর প্রথম যৌবনে নাকি পিতার অতুল ঐশ্বর্য ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য ফকির হয়ে এই দক্ষিণবঙ্গে চলে এসেছিলেন। এও প্রচলিত যে, তাঁর বন্ধু (কোথাও আবার পালিত ভাই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) কালুর সহায়তায়, যিনি মূলত কুমীর-দেবতা গাজী কালু নামে বিশেষ পরিচিত, গাজী পীরের বিবাহ হয়েছিল যশোরের ব্রাহ্মণনগরের হিন্দু রাজা মুকিট রায়ের কন্যা চম্পাবতীর সঙ্গে। তাঁদের দুই পুত্রের কথাও জানা যায়, তাদের নাম হল, দুঃখী গাজী ও মেহের গাজী৷ এই গাজী ও চম্পাবতীকে নিয়ে নানারকম কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। প্রথমে মুকুট রায় গাজী ও চম্পাবতীর সম্পর্ক মেনে নেননি কারণ গাজী ছিলেন মুসলমান। সম্ভবত ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে গিয়েই চম্পাবতীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ধর্মপ্রচারে বাধা দিলে মুকুট রায়ের সঙ্গে গাজীর যুদ্ধ হয় এবং বহু খণ্ডযুদ্ধের পর জয়ী হয়ে চম্পাবতীকে সেখান থেকে নিয়ে যান গাজী। এও বলা হয় যে, এই মুকুট রায়ের সেনাপতি ছিলেন দক্ষিণ রায়। গাজীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নাকি তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে গাজীর অনুসারী হন। যদিও এসব কাহিনির সত্যতা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
তবে আগেই বলা হয়েছে যে, গাজী পীরের পরিচয় নিয়ে নানারকম মত প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ আবার মনে করে থাকেন যে, আদতে বড়খাঁ গাজী কারও ব্যক্তিগত নাম নয়। মধ্যযুগের বাংলায় নাকি ইসলাম ধর্মপ্রচারকদের শীর্ষস্থানীয়রা বড়খাঁ গাজী নামে পরিচিত হতেন। অতএব বড়খাঁ গাজী একটি অবস্থান বা পদের নাম। অন্য আরেকটি মতানুসারে, পান্ডুয়ার প্রসিদ্ধ পীর জাফর খাঁ গাজীর পুত্রই আদতে ছিলেন বড়খাঁ গাজী। অন্যদিকে আবার ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ রচয়িতা সুকুমার সেন মনে করেন যে, চতুর্দশ শতকের পীর সুফি খানই পরবর্তীকালে, ষোড়শ শতকে বড়খাঁ গাজী নামে পরিচিত হয়েছিলেন। আরও যে একটি মত প্রচলিত রয়েছে সেটি হল, পঞ্চদশ শতকের পীর ইসমাইল গাজীই হলেন আমাদের আলোচ্য এই বড়খাঁ গাজী। অতএব নানা জনের এই নানা মতের কারণে পীর গাজীর আসল পরিচয় নিয়ে একটি রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিশ্চিতভাবে কেউই কোন একটি সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। তবে আসল পরিচয় যাই হোক না কেন, এই গাজী পীর যে আসলে একজন অলৌকিক শক্তিধর দেবতুল্য মানুষ, জনসাধারণের এই বিশ্বাসে কোনও খাদ ছিল না।
স্থানীয় লোকপুরাণ অনুযায়ী এই গাজী পীর এক যোদ্ধা-সন্ত ছিলেন এবং তিনি বাঘ, সাপ, কুমীরের মতো প্রাকৃতিক হিংস্র সব জন্তুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন এবং কখনও কখনও তাদের যুদ্ধের সৈনিক হিসেবেও ব্যবহার করতেন। সেই কারণেই সুন্দরবন অঞ্চলের মধু সংগ্রহকারী, জেলে কিংবা কাঠুরিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ কাজে বেরোনোর সময় এই গাজী পীরের নামও জপে থাকেন। প্রচলিত রয়েছে যে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার সোনারপুর অঞ্চলে জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করেছিলেন এই পীর বড়খাঁ গাজী।
তাঁকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লোককাহিনি প্রচলিত রয়েছে এবং ‘রায়মঙ্গল’-এর মতো লৌকিক সাহিত্যের মধ্যেও পাওয়া যায় তাঁর মাহাত্ম্যের কথা৷ লোককাহিনিতে এমন কথাও রয়েছে যে, এই পীর গাজী বহু স্থানীয় হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত করবার চেষ্টা করায় নাকি তাঁর সঙ্গে হিন্দু দেবদেবীদের বিরোধ ও সংঘর্ষ হয়েছে। এমনকি আঞ্চলিক কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে তা নিয়ে আরেক ব্যাঘ্রদেবতা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গেও পীর গাজীর বিরাট যুদ্ধের কথা জানতে পারা যায়। কৃষ্ণরাম দাসের ‘রায়মঙ্গল’ কাব্যে রয়েছে যে, জগদীশ্বর হিন্দু-মুসলমানের মিলিত দেবতা কৃষ্ণপয়গম্বরের বেশ ধারণ করে গাজী ও দক্ষিণ রায়কে শান্ত করে তাঁদের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধবিরতির অবশ্য কিছু শর্তও ছিল। সেইসব শর্ত অনুযায়ী দক্ষিণ রায় ভাটি অঞ্চলের কর্তৃত্ব পেলেও পীর গাজী সর্বত্র শ্রদ্ধা ও সম্মানের অধিকার লাভ করেছিলেন। অন্যদিকে আবার ‘গাজীমঙ্গল’ বা ‘গাজীর গান’ কাব্যে গাজী ও দক্ষিণ রায়ের যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে দক্ষিণ রায়কে পরাজিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই কাব্যে হিন্দুদের ধর্মান্তরকরণের প্রসঙ্গটিও উত্থাপিত হয়েছে। তবে আব্দুল গফুর যে, ‘কালু গাজী ও চম্পাবতী’ কাব্য রচনা করেছিলেন তাতে বিরোধ নয় বরং গঙ্গা, দুর্গা, শিব প্রমুখ হিন্দু দেবদেবীকে বড়খাঁ গাজীর আত্মীয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, গাজী পীর মূলত ছিলেন একজন যোদ্ধা-সন্ত। সেই কারণে খাড়িগ্রামে তাঁর যে মূর্তি দেখা যায় তাতে তিনি যোদ্ধার বেশে সজ্জিত, অশ্বারূঢ় একজন দৃপ্ত বীরপুরুষ। তাঁর পরণে দেখা যায় দীর্ঘ পায়জামা, চোগা-চাপকান, পিরান, মাথায় টুপি, মুখে ঘন লম্বা দাঁড়ি, দীর্ঘাকৃতি গোঁফ ও গালপাট্টা, ঝুলপি। একহাতে তাঁর দেখা যায় অস্ত্র এবং অন্যহাতে তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে রয়েছেন। এছাড়াও বেশ কিছু পুরাতন গাজী পীরের পটে তাঁর রঙিন চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। বাঘের সঙ্গেও তাঁর ছবি দেখতে পাওয়া যায়।
ঘুটিয়ারি শরীফে রয়েছে গাজী পীরের মাজার। এখানেই রয়েছে গাজীর কবর, যার নাম আগে ছিল বাঁশরা। ১৯৩৬ সালে ফজরুল হক বাঁশরার নাম পরিবর্তন করে রাখেন ঘুটিয়ারি শরিফ। ৭ই আষাঢ় গাজী পীরকে কেন্দ্র করে উৎসব, মেলা ইত্যাদি হয়ে থাকে। এর পিছনেও রয়েছে একটি প্রচলিত কাহিনি। একবার নাকি এই অঞ্চলে খরা দেখা দিয়েছিল। তখন গাজীবাবার কাছে এখানকার মানুষ গিয়ে বৃষ্টি এনে দেওয়ার অনুরোধ করে। সেই অনুরোধেই গাজী পীর সমাধিস্থ হন। কিছু সময় পর এক পাঠান জাতের মুসলমান বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন এবং বাবাকে মৃত ভেবে ছুঁয়ে দেন। সেই স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গেই দৈববাণী হয় যে বাবা মৃত নয় বরং সমাধিস্থ। কিন্তু সেই স্পর্শদোষে তাঁর আত্মা পর্দানশীন হয়৷ এই ৭ই আষাঢ় দিনটিকে তাই পীরের মৃত্যুদিন হিসেবে স্মরণ করে প্রায় এক সপ্তাহ ব্যাপী উৎসব ও মেলা হয়। এছাড়াও ১৭ শ্রাবণে যে উরস অনুষ্ঠান পালিত হয় এখানে, তাতে ইসলামিক গজল, কাওয়ালি, সুফি ইত্যাদি সঙ্গীত গাজী পীরের উদ্দেশে নিবেদন করা হয়।
এখানে উল্লেখ্য যে, এই উৎসবের দিনগুলিতে জিয়ারতের সময়ে বারুইপুরের রায়চৌধুরী জমিদারবাড়ি থেকে আনা শিরনি ও বাতি-আতর সর্বপ্রথম গাজীকে উৎসর্গ করা হয়। এর নেপথ্যেও রয়েছে এক কাহিনি। প্রচলিত রয়েছে যে, এই রায়চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মদনমোহন রায়কে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ-এর খাজনার হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন গাজী পীর। তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মেদিনীমল্ল পরগণার জমিদারি পাওয়ার পর রায়চৌধুরীরা গাজীকে এখানে পীরোত্তর সম্পত্তি দান করেন।
এখানকার ভাসানিপুকুরে নরনারীরা মনস্কামনা পূর্ণ করবার জন্য শিরনি হিসেবে ফুল-বাতাসা ভাসিয়ে দেয়। যার কাছে সেই ফুল-বাতাসা ফিরে আসে তার মনস্কামনা অচিরেই পূর্ণ হবে বলে মনে করা হয়। এমনকি কেউ সন্তান মানত করে যদি সফল হয় তবে সে তাঁর শিশুকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে মাটির হাড়িতে করে এখানকার জলে ভাসিয়ে দেয় এবং শিশু পুনরায় ফিরে আসে তার আপনজনের কাছে।
সকল ধর্মের মানুষই গাজীবাবার ঘুটিয়ারি শরিফের মাজারে এসে প্রার্থনা করেন। এ-এক অদ্ভুত ধর্মসমন্বয়ের পবিত্র স্থান।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ‘বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ’, ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী, অপর্ণা বুক ডিস্ট্রিবিউটার্স, প্রথম প্রকাশ:১৯৯৫
- ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’, বিনয় ঘোষ, তৃতীয় খন্ড, প্রকাশ ভবন, ১৩৯৫
- ‘বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ’, দুলাল চৌধুরী, আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা, ২০০৪
- https://en.m.wikipedia.org/
- https://rangandatta.wordpress.com/
- https://www.daricha.org/
- https://www.daily-bangladesh.com/


আপনার মতামত জানান