ইতিহাস

নিলস বোর

নিলস বোর (Niels Bohr) একজন স্বনামধন্য ড্যানিশ পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি পরমাণুর গঠন (atomic structure) এবং কোয়ান্টাম থিওরি (quantum theory) নিয়ে গবেষণা করেছেন। এই কারণে তিনি পরে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। পরমাণুর গঠন বর্ণনায় বোরের মডেল আজও এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হয়।

১৮৮৫ সালে ৭ অক্টোবর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে নিলস বোরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ক্রিস্টিয়ান বোর (Christian Bohr) এবং মায়ের নাম এলেন বোর (Ellen Bohr)। তাঁর বাবা কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওলজির (physiology) অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর মা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন। নিলস বোর বাবা-মার তিন সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। তাঁর বড় দিদি একজন শিক্ষিকা ছিলেন এবং ছোট ভাই একজন গণিতজ্ঞ এবং ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন যিনি ১৯০৮ সালে গ্রীষ্ম অলিম্পিকে অংশ নিয়েছিলেন। নিলসের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় সাত বছর বয়সে গেমেলহোম ল্যাটিন স্কুলে (Gammelholm Latin School)। এরপর তিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় (Copenhagen University) থেকে স্নাতক হন। এই সময় তিনি গণিতবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়েও পড়াশোনা করেন।

১৯০৫ সালে রায়ান ডেনিস অ্যাক্যাডেমি অফ সায়েন্সেস অ্যান্ড লেটার্স (Royal Denish Academy of Sciences and Letters) রেইলির (Rayleigh) প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে তরলের পৃষ্ঠটান নির্ণয়ের জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তিনি এই গবেষণায় শুধু রেইলির পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে সেই পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেন। বলা বাহুল্য এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হন। পরে তিনি তাঁর এই গবেষণাটি ওপর আরো কাজ করে তার সম্বন্ধে একটি থিসিস (thesis)  লিখে লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটিতে (Royal Society) জমা করেন এবং সেখান থেকে তাঁর এই গবেষণামূলক কাজটি প্রকাশিত হয়েছিল।

 ১৯১১ সালে তিনি কার্লসবার্গ ফাউন্ডেশন (Carlsberg Foundation) থেকে ফেলোশিপ পেয়ে ইংল্যান্ডে যান। ইংল্যান্ড তখন সব রকম অণু পরমাণুর তাত্ত্বিক গবেষণার কেন্দ্র ছিল। সেখানে তার সাথে ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক জে জে থমসনের সাথে দেখা হয়। এই সময় তিনি অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের বক্তৃতা শুনতে যেতেন। তিনি ক্যাথোড রে-র (cathode rays) বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন কিন্তু তাতে খুব একটা সাফল্য পাননি ফলত থমসনকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার (Victoria University of Manchester) থেকে রাদারফোর্ড তাঁকে পোস্ট ডক্টরাল গবেষণা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। সেইখানে তাঁর সাথে দেখা হয় জর্জ হেভেসি এবং চার্লস গালটন ডারউইনের সাথে।

১৯১২ সালে তিনি  ডেনমার্কে ফিরে আসেন  এবং  মারগ্রেথ নোরলান্ডকে  বিয়ে করেন। তাঁদের ছয়টি সন্তান ছিল। তাঁদের সন্তান আজে বোর (Aage Bohr) গুরুত্বপূর্ণ পদার্থবিদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন ও ১৯৭৫ সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন। এরপর তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রিভাটডোসেন্ট (privatdocent) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এখানে তাঁকে মেডিকেল ছাত্রদের পদার্থবিদ্যা পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে তাঁর তিনটি গবেষণামূলক লেখা প্রকাশিত হয় ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে। এই লেখাগুলি ভবিষ্যতে ‘দ্য ট্রিলজি’ (The Trilogy) নামে বিখ্যাত হয়। এই সময় তিনি রাদারফোর্ডের পরমাণু মডেল ও প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম থিয়োরির উপর ভিত্তি করে পরমাণুর নতুন মডেল দেন যা বোরের পরমাণু মডেল (Bohr’s model of atom) নামে পরিচিত। এই মডেল বর্তমানে বর্জিত হলেও পরমাণুর গঠনের মডেলগুলির মধ্যে অন্যতম মাইলফলক যা আজও বিদ্যালয়ের পাঠক্রমঅুক্ত।

মেডিকেল ছাত্রদের পদার্থবিদ্যা পড়াতে তাঁর ভাল লাগত না। তাই রাদারফোর্ডের প্রস্তাব পেয়ে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় রিডার (reader)  হিসেবে যোগ দিতে মনস্থির করেন। এই সময় তিনি তাঁর গবেষণার বিষয় নিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়তে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তাই বাধ্য হয়ে তাঁকে ডেনমার্কে ফিরে যেতে হয়। ইতোমধ্যে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে ‘চেয়ার অফ থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স’ (Chair of Theoretical Physics) পদে নিযুক্ত করা হয়। এই পদটি বিশেষভাবে তাঁর জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। তবে তখনও তাঁকে মেডিকেল ছাত্রদের পদার্থবিদ্যা পড়াতে হত।

১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের  বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্য উদ্যোগী হন। এই প্রচেষ্টায় তাঁকে ড্যানিশ সরকার, কার্লসবার্গ ফাউন্ডেশন (Carlsberg Foundation), শিল্পপতিরা এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেক মানুষই সাহায্য করেন। পরবর্তীকালে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম নিলস বোর ইনস্টিটিউট রাখা হয়। ১৯২১ সালের ৩রা মার্চ এই ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্স (quantum mechanics) বিষয়ে নানারকম গবেষণা করা।

১৯২২ সালে তাঁকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। সারা জীবন ধরে তিনি যে পরমাণুর কাঠামো এবং তাদের থেকে নির্গত হওয়া রেডিয়েশন এর বিষয় গবেষণা করে গেছেন তার ওপর ভিত্তি করেই এ পুরস্কার তাঁকে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি দর্শনশাস্ত্র নিয়েও চর্চা করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক জার্মান বুদ্ধিজীবী দেশ ছেড়ে সারা পৃথিবীর নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এইসব মানুষদের সাহায্য করার জন্য নিলস বোর এগিয়ে আসেন এবং তাঁদের জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করেন। আর্থিকভাবে এবং আরো নানান ভাবে তিনি এই সব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে ফেলিক্স ব্লস, গুইদো বেক, জেমস ফ্রাঙ্ক, হিল্দ লেভি, এডওয়ার্ড ট্রলারের মতো বিখ্যাত মানুষেরাও ছিলেন। এই সব আশ্রিত মানুষকে সাহায্য করার জন্য তিনি তার নোবেল পুরস্কারটি নিলামে দিয়েছিলেন। পরে যদিও এই পুরস্কারটি যিনি নিলামে কিনেছিলেন তিনি তা ড্যানিশ ঐতিহাসিক জাদুঘরে দিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে তিনি ও তাঁর স্ত্রী নাৎসি সরকারের ভয়ে সমুদ্রপথে সুইডেনে পালিয়ে যান। তিনি সেখান থেকেই তাঁর দেশের ইহুদি নাগরিকদের সাহায্য করতে থাকেন। তাঁর সাহায্যেই প্রায় সাত হাজার ড্যানিশ ইহুদি সুইডেনে পালিয়ে আসতে পেরেছিল। এরপর তিনি ইংল্যান্ডে চলে যান। তিনি আমেরিকার ম্যানহাটান প্রজেক্টেও সাহায্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি পারমানবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দেন। এটমস ফর পীস (atoms for peace) পুরষ্কারের প্রথম প্রাপক তিনি যা ১৯৫৭ সাল থেকে পারমানবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ১৯৪৫ সালে তিনি আবার কোপেনহেগেনে ফিরে যান। রয়েল একাডেমি অফ আর্ট অ্যান্ড সায়েন্সে তাঁকে আবার সম্পাদক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ইউরোপের দেশগুলির যৌথভাবে নিউক্লিয়ার গবেষণাগার সার্ন (CERN) তৈরিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯৫৭ সালে তিনি নর্ডিক ইনস্টিটিউট ফর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স (Nordic Institute for Theoretical Physics)  এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। নিলস বোরের  ১৯৬২ সালে ১৮ নভেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।