ইতিহাস

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড

আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে যাঁরা যুগান্তর এনেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড (Ernest Rutherford)। তিনিই ছিলেন তেজস্ক্রিয়তা সংক্রান্ত গবেষণার মূল কান্ডারী। রাদারফোর্ডই নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যার নানান দিক অনুসন্ধান করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি তাঁকে নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যার জনক পর্যন্ত বলা হয়। তাঁর আবিষ্কৃত পরমাণুর মডেল বিজ্ঞানে অন্য দিশা দিয়েছিল। ব্রিটানিকা বিশ্বকোষ (Encyclopedia Britannica) রাদারফোর্ডকে মাইকেল ফ্যারাডের পরে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গবেষক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নোবেল পুরস্কারের পাশপাশি তিনি নাইটহুডেও সম্মা্নিত হন। ১৯৯৭ সালে একটি কৃত্রিম মৌলের নাম তাঁর নাম অনুসারে রাদারফোর্ডিয়াম রাখা হয়। রাদারফোর্ডের প্রতিটি পরীক্ষামূলক গবেষণা এবং আবিষ্কার আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার ধারাকে অনেকাংশে এগিয়ে দিয়েছিল।  

১৮৭১ সালের ৩০ আগস্ট নিউজিল্যান্ডে নেলসনের কাছে ব্রাইটওয়াটার নামক এক স্থানে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জেমস রাদারফোর্ড (James Rutherford) প্রকৃতপক্ষে ইংল্যান্ডের এসেক্স এলাকার মানুষ। পরে তিনি স্কটল্যান্ডের পার্থে চলে আসেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল মার্থা থম্পসন।

হ্যাভলক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি নেলসন কলেজে যান। সেখান থেকে বৃত্তি পেয়ে নিউজিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ক্যান্টারবেরি কলেজে পড়াশোনা করার সুযোগ পান। বি. এ, এম. এ., বি. এস. সি. করার পরে দু’ বছর ধরে একটি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থেকে এক নতুন রূপ ধরণের বেতার গ্রাহক আবিষ্কার করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি ইংল্যান্ডে গিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরিতে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করার ডাক পান।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি জে. জে. থম্পসনের (J. J. Thompson) নেতৃত্বে গবেষণা করার সুযোগ পান। ১৮৯৮ সালে থম্পসন ক্যানাডার মনট্রিলে ম্যাকগিল বিশ্বিবিদ্যালয়ে রাদারফোর্ডের নাম সুপারিশ করেন। ১৯০১ সালে তিনি নিউজিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. এস. সি. ডিগ্রি পান। ১৯০৭ সালে ব্রিটেনে ফিরে এসে ম্যাঞ্চেস্টারের ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগের দায়িত্ব নেন।

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে থম্পসনের নেতৃত্বে গবেষণা করাকালীন গ্যাসের ওপরে এক্স রশ্মির প্রভাব নিয়ে কাজ করার সুবাদে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়। ইউরেনিয়াম নিয়ে বেকারেলের (Becquerel) অভিজ্ঞতা শুনে রাদারফোর্ড তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে বিস্তারিত চর্চা শুরু করেন। এই চর্চার সূত্র ধরেই তিনি এমন দুটি রশ্মির আবিষ্কার করেন, যা ভেদনক্ষমতার সাপেক্ষে এক্সরশ্মির থেকে আলাদা। এই দুটি রশ্মি হলো আলফা এবং বিটা। পরে তিনি তৃতীয় রশ্মির অস্তিত্বের কথাও বলেন, যার নাম গামা। ১৯০০ সাল থেকে ১৯০৩ সাল পর্যন্ত ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি তরুণ রসায়নবিদ ফ্রেডেরিক সোডির (Frederick Soddy) সঙ্গে তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করতে থাকেন। তাঁরা থোরিয়ামের একটি রূপভেদ খুঁজে পান, যার নাম তাঁরা দিয়েছিলেন ইউরেনিয়াম এক্স। উইলিয়াম ক্রুকসের (William Crookes) থেকে ইউরেনিয়াম এক্সের এবং মারি কুরির (Marie Curie) থেকে রেডিয়ামের নমুনা নিয়েও তাঁরা কাজ করেছেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যেকোন পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ একটা নির্দিষ্ট সময় পরে তার অর্ধেকে পরিণত হয়। যেমন থোরিয়ামের ক্ষেত্রে এই সময় হল ১১.৫ মিনিট। তেজস্ক্রিয় পদার্থের অর্দ্ধ জীবন কাল একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।

ধন্যাত্মক না ঋণাত্মক আধানযুক্ত তা স্পষ্ট করে বলতে না পারলেও তিনি তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে জানান যে পরমাণু তার সমস্ত আধান একটি ছোটো নিউক্লিয়াসের মধ্যে সঞ্চিত করে রাখে।  পরমাণুর মধ্যে নিউক্লিয়াসের অস্তিত্বের কথা তাঁর আগে আর কেউ বলেননি। তাঁর এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিখ্যাত গোল্ড ফয়েল এক্সপেরিমেন্টের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত হলো পরমাণুর রাদারফোর্ড কাঠামো। আধুনিক পদার্থবিদ্যাসহ সমগ্র বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে এই আবিষ্কার সমৃদ্ধ করেছিল।

১৯১৭ সালে রাদারফোর্ড নাইট্রোজেনের নিউক্লিয়াসের সঙ্গে আলফা কণার সংঘাত ঘটিয়ে প্রথম কৃত্রিমভাবে নিউক্লীয় বিক্রিয়া করে দেখান। এই বিক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে রাদারফোর্ড একটি প্রায়-আণবিক কণার আবিষ্কার করেন, যাকে ১৯১৯ সালে তিনি হাইড্রোজেন পরমাণু বললেও ১৯২০ সালে তিনি আরো স্পষ্টভাবে প্রোটন বলে অভিহত করেছেন। ১৯২১ সালে নীলস বোরের (Niels Bohr) সঙ্গে কাজ করাকালীন তিনি নিউট্রনের অস্তিত্বের সম্পর্কে কিছু তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন। ১৯৩২ সালে জেমস শ্যাডউইক নিউট্রন সম্পর্কে রাদারফোর্ডের তত্ত্বকে প্রমাণ করেন। এই একই বছরে রাদারফোর্ডের নেতৃত্বে কর্মরত ছাত্রদের তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নিউক্লিয়াসকে দুভাগে ভাগ করার প্রথম পরীক্ষাটি করা হয়।   

রাদারফোর্ড এরকম একাধিক যুগান্তকারী আবিষ্কার এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে একাধিক সম্মানে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছে। পরমাণুর বিভাজন এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপর গবেষণার জন্য ১৯০৮ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডকে রসায়নে নোবেল দেওয়া হয়। ১৯১৪ সালে তাঁকে নাইটহুড উপাধি দেওয়া হয়। ১৯১৬ সালে তাঁকে হেক্টর মেমোরিয়াল মেডেল দেওয়া হয়। ১৯২৫ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত তিনি রয়াল সোসাইটির সভাপতি পদে বহাল ছিলেন। ১৯৩৩ সালে নিউজিল্যান্ডের রয়াল সোসাইটির তরফ থেকে দেওয়া উদ্বোধনী সম্মান টি. কে. সাইডে (T. K. Sidey) মেডেল প্রাপকদ্বয়ের মধ্যে একজন ছিলেন আর্নেস্ট রাদারফোর্ড।  

১৯০০ সালে জর্জিনা নিউটনের (Georgina Newton) সঙ্গে রাদারফোর্ডের বিয়ে হয়। তাঁদের একটি কন্যাসন্তান হয়, যাঁর নাম ছিল ইলিন ম্যারি (Eileen Mary)। ইলিন পরবর্তীকালে পদার্থবিদ র‍্যালফ ফাওলারকে (Ralph Fowler) বিয়ে করেন।  

সামান্য একটি হার্নিয়া চিকিৎসা না করানোর ফলে বৃহৎ আকার নেয়। পরবর্তীকালে লন্ডনে জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করার পরে ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর মাত্র ৬৬ বছর বয়সে কেমব্রিজে রাদারফোর্ডের মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।