ইতিহাস

অনিল কাকোদকর

অনিল কাকোদকর (Anil Kakodkar) একজন যুগান্তকারী ভারতীয় পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানী, ভারতীয় পারমাণবিক কর্মসূচীর প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পোখরান পরমাণু পরীক্ষা থেকে অত্যাধুনিক রিঅ্যাক্টর― পারমাণবিক গবেষণায় তাঁর অমূল্য অবদান সারা বিশ্বের কাছে ভারতবাসীকে গর্বিত করে। তিনিই প্রথম ভারতবর্ষকে ‘হেভি ওয়াটার রিঅ্যাক্টর টেকনোলজি’র সাথে পরিচয় করান এবং পারমাণবিকভাবে ভারতবর্ষকে স্বনির্ভর করে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি একাধারে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান, ভারত সরকারের ক্যাবিনেট সচিব এবং ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের ডিরেক্টরের দায়িত্বেও ছিলেন।

১৯৪৩ সালের ১১ নভেম্বর মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানিতে অনিল কাকোদকরের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পুরুষোত্তম কাকোদকর এবং মায়ের নাম কমলা কাকোদকর।

প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া বারোয়ানি এবং খারগনেতে শেষ করে ম্যাট্রিকের পর উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে অনিল কাকোদকর চলে আসেন মুম্বাই। মুম্বাইয়ের রূপারেল কলেজ থেকে স্নাতক হন এবং ১৯৬৩ সালে মুম্বাইয়ের বীরমাতা জীজাবাঈ টেকনোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (ভিজেটিআই) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিগ্রী সম্পন্ন করেন। ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরীক্ষামূলক স্ট্রেস অ্যানালিসিসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

১৯৭৪ সালের মে মাসে রাজস্থানের পোখরানে অনুষ্ঠিত ভারতবর্ষের প্রথম সফল শান্তিমূলক পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষায় নির্বাচিত বিশেষ কয়েকজন সদস্যের অন্যতম ছিলেন কাকোদকর। ১৯৯৮ সালের মে মাসে আবারও পোখরানে সফল পারমাণবিক পরীক্ষার কর্ণধার ছিলেন এই ব্যতিক্রমী প্রতিভাশালী বিজ্ঞানী। তামিলনাড়ুর কলাপক্কামে দুটি পারমাণবিক চুল্লির পুনর্গঠন এবং প্রায় বন্ধ হতে যাওয়া রাওয়াতভাতায় প্রথম ইউনিটের কাজও তিনিই সম্পন্ন করেন। ভারতবর্ষকে পারমাণবিক সাবমেরিন ‘পাওয়ারপ্যাক’ প্রযুক্তির সাথে পরিচয়ও তিনিই করিয়েছিলেন।

ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের (বিএআরসি) রিঅ্যাক্টর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ‘ধ্রুব’ প্রকল্পের নকশা ও নির্মাণের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি। ধ্রুব রিঅ্যাক্টর হলো ভারতের বৃহত্তম পরমাণু গবেষণা চুল্লি। এটিই এশিয়ার প্রথম যথার্থ পারমাণবিক চুল্লি যা মুম্বাইয়ের ট্রম্বের বিএআরসিতে অবস্থিত। এটি ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচীর জন্য জ্বালানী ব্যয়কারী প্লুটোনিয়াম বহনকারী প্রাথমিক জেনারেটর যা বিশ্ব পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এক অমর সৃষ্টি।

কাকোদকর ভারতবর্ষে বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত সুলভ, সস্তা অথচ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তেজস্ক্রিয় থোরিয়ামকে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষকে পারমাণবিক শক্তিক্ষেত্রে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ‘অ্যাডভান্সড ওয়াটার রিঅ্যাক্টর’ ডিজাইনের ওপর গবেষণা করছেন যাতে থোরিয়াম ও ইউরেনিয়াম-২৩৩ ব্যবহার করে জ্বালানী হিসাবে প্লুটোনিয়ামের প্রাথমিক শক্তির উৎস হিসাবে ব্যবহার করা যায়। সহজ ও নিরাপদ এই প্রযুক্তি থোরিয়াম থেকে ৭৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। থোরিয়ামের সুবিশাল ভান্ডার কেবল বৈদ্যুতিক উৎপাদনের উৎস হিসাবে নয়, অন্যান্য ধরণের শক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক উৎস হিসাবেও কাজে লাগানোর জন্য ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচীর একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা তিনি তৈরি করেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে থোরিয়াম ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সামগ্রিক শক্তির চাহিদা মেটাতে জীবাশ্ম জ্বালানীর উৎস সম্বন্ধীয় কর্মসূচীতে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত রয়েছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া এবং ভারত―পৃথিবীর উন্নত সাতটি ইউনিয়ন পরীক্ষামূলকভাবে ২০২৫ এর মধ্যে ‘ফিউশন এনার্জি’র মাধ্যমে ‘ক্লীন এনার্জি’ উৎপাদনের লক্ষ্যে যে ‘ইন্টারন্যাশনল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিঅ্যাক্টর’ গঠন করেছে, ভারতবর্ষের গবেষক দলের তরফ থেকে অনিল কাকোদকর তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য।

এ ছাড়াও মানবসম্পদ উন্নয়নেও তাঁর অভাবনীয় অবদান রয়েছে। খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যগুলির রেডিয়েশন প্রসেসিং, কৃষিক্ষেত্রে তৈলবীজ এবং দানাশস্য উৎপাদন সংক্রান্ত বিষয়, ক্যান্সার সম্পর্কিত স্বাস্থ্যপরিষেবা, নগর ও গ্রামীণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জল নিষ্কাশন প্রভৃতি বিষয়েও তাঁর গবেষণা যথেষ্ট অভিনব ও প্রশংসনীয় ভারতের জনকল্যাণমুখী পারমাণবিক কর্মসূচীর বুনিয়াদি গবেষণা ও প্রযুক্তিগত মানোন্নয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার লক্ষ্যে কাকোদকরের অদম্য উদ্যোগে বিশাখাপত্তনম, হায়দ্রাবাদ, কোলকাতা এবং ব্যাঙ্গালোরে গবেষণার জন্য নতুন কেন্দ্র অন্তর্ভূক্ত হয়েছে।

বর্তমানে কাকোদকরের গবেষণার বিষয় শক্তি, শিক্ষা এবং সামাজিক বিকাশ। ‘সিআইএলএলজিই'( CILLAGE ) নামের এই পরিকল্পনায় তিনি গ্রামাঞ্চলের সর্বাঙ্গীণ উন্নতিকল্পে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শহর ও গ্রামের মধ্যে বাস্তুসংস্থানের সাহায্যে সমন্বয় সাধনের ওপর গবেষণা করছেন।

তাঁর সুবিশাল কর্মপরিধিতে তিনি প্রভূত গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্মানজনক পদ অলঙ্কৃত করেছেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের ডিরেক্টর ছিলেন। ২০০০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত নয় বছর ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জির সচিবও ছিলেন। দেশে বিদেশে তাঁর ২৫০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে যা পারমাণবিক গবেষণার অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত। তিনি ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত মুম্বাই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির চেয়ারম্যান ছিলেন। অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন এবং ওএনজিসি এনার্জি সেন্টার ট্রাস্টের সদস্যও ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল অবধি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফেলো এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন সুচারুভাবে। ১৯৯৯–২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সেফটি অ্যাডভাইজারি গ্রুপের (আইএনএসএজি) সদস্য ছিলেন। সোলার এনার্জি কর্পোরেশন গঠনের শুরু থেকেই তিনি এর চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ইন্টার ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রো ফিজিক্স (আইইউসিএএ), বায়োমেডিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ইনকিউবেশন) সেন্টারের স্টিয়ারিং এবং মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যানের পদও অলঙ্কৃত করেছেন। অলঙ্কৃত করেছেন ভারত সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট সচিব পদটিও।

বর্তমানে তিনি মহারাষ্ট্র নলেজ কর্পোরেশান লিমিটেডের চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস, ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস, ভারত তথা মহারাষ্ট্রের অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের ফেলো। এছাড়াও তিনি- ইন্টারন্যাশনাল  নিউক্লিয়ার এনার্জি অ্যাকাডেমির সদস্য এবং ওয়ার্ল্ড ইনোভেশান ফাউন্ডেশানের অনারারি সদস্য। মুম্বাইয়ের  ভিজেটিআই-এর গভর্নর বোর্ডেও তিনি রয়েছেন।

ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জির (ডিএই)  প্রাক্তন সহকর্মী ডঃ সুরেশ গাঙ্গোত্রার সহায়তায় লিখিত ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি- ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া’স স্ট্র্যাটেজিক আইডেন্টিটি’ নামক বইতে বর্ণিত দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্বলিত চড়াই উৎরাইতে পরিপূর্ণ তাঁর অসাধারণ জীবন ও সময়কে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে। বিগত ৪৫ বছরে দেশের পরমাণু শক্তি কর্মসূচীর নিত্যনতুন ও উত্তেজনাপূর্ণ আবিষ্কার এবং ঘটনাপ্রবাহের মূহুর্তগুলির মধ্যে দিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ পাঠকসমাজকে বিস্মিত করে। একজন ট্রেনি ইঞ্জিনিয়ার থেকে পারমাণবিক কর্মসূচীর প্রধান হওয়া, তাঁর গবেষণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক চুক্তি, পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরিচালনা করা থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক এবং সিদ্ধান্তের বিবরণ রয়েছে যা ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচী গ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। ভারতবর্ষের পারমাণবিক শক্তির বিকাশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকবর্গের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই।

কাকোদকরের বৈচিত্র্যময় সুদীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং সাফল্য তাঁকে এনে দিয়েছে বহু স্বীকৃতি। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় তাঁর আজীবনের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা এবং অবদান তাঁকে এনে দিয়েছে রাজ্য এবং জাতীয় স্তরের নানান সম্মান।২০১০ এ গোয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান গোমন্তবিভূষণ, ২০১২ সালে মহারাষ্ট্র রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান মহারাষ্ট্রভূষণ সম্মানে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৯৮ সালে ভারত সরকারের চতুর্থ অসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী, ১৯৯৯ সালে তৃতীয় অসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ এবং ২০০৯ সালে দ্বিতীয় অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে বিভূষিত হয়েছেন। এছাড়াও তাঁর অসাধারণ কর্মযজ্ঞের  স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আরো অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। যদিও ভারতবর্ষে পদার্থবিজ্ঞানের পরিসরকে সুবিস্তৃত করে তোলার নেপথ্যে তাঁর অনন্য অবদান স্বীকার করার জন্য কোনো পুরস্কারই যথেষ্ট নয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

লতা মঙ্গেশকর



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন