ইতিহাস

অমল কুমার রায়চৌধুরী

অমল কুমার রায়চৌধুরী

সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে অভিনব গবেষণার জন্য বিখ্যাত বাঙালি পদার্থবিদ অমল কুমার রায়চৌধুরী (Amal Kumar Raychaudhuri)। তাঁর সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’ (Raychaudhuri equation) যেটি পেনরোজ-হকিংয়ের ‘সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব’ (singularity theorem) প্রমাণের মূল উপাদান। তাঁর গবেষণার উপর ভিত্তি করেই নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ। প্রেসিডেন্সি কলেজ ও আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনাও করেছেন তিনি। তাঁর গবেষণা না থাকলে স্টিফেন হকিংয়ের গবেষণাও পূর্ণতা পেত না।

১৯২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অধুনা বাংলাদেশের বরিশালের এক বৈদ্য পরিবারে অমল কুমার রায়চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা সুরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী ছিলেন একটি বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক আর তাঁর মা সুরবালা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। অমল কুমারের একজন বড় ভাই ছিলেন, তাঁর নাম ছিল অমিয় কুমার রায়চৌধুরী। পরবর্তীকালে নমিতা সেন নামে এক মহিলার সঙ্গে অমল কুমার রায়চৌধুরীর বিয়ে হয়। এই দম্পতির মোট চারটি সন্তান ছিল। তাঁদের দুই পুত্রসন্তানের নাম ছিল যথাক্রমে অম্লানাভ ও অসীমাভ এবং দুই কন্যাসন্তান ছিল মধুক্ষরা ও পারঙ্গমা। তাঁর কন্যা পারঙ্গমা সেনও বড় হয়ে পদার্থবিদের জীবন বেছে নেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপিকা ছিলেন।

১৯৩৩ সালে দশ বছর বয়সে অমল কুমার রায়চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি বরিশালের ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু তার কিছুদিন পরেই তাঁর পরিবার বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় চলে আসে। কলকাতায় এসে অমল কুমার ভর্তি হন তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গণিতের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন গণিতের সমস্যার সমাধান করতে তিনি খুব ভালবাসতেন। সম্ভবত তাঁর বাবা গণিতের শিক্ষক হওয়ার সুবাদেই অমল কুমার রায়চৌধুরী ছোট থেকেই গণিত পছন্দ করতেন। জানা যায়, নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন একবার তিনি বিদ্যালয়ের পরীক্ষার সময় একটি গণিতের প্রশ্নকে নিজের মতো করে সমাধান করেছিলেন। সেই সমাধান প্রচলিত সমাধানের নিয়মের থেকে আরো বেশি সরল ও সহজবোধ্য হয়েছিল। অমল কুমারের এই কাজে প্রধান শিক্ষক মহাশয় খুব খুশি হয়েছিলেন এবং এই সমাধান আবিষ্কারের কৃতিত্ব তাঁকে দিয়েই বিদ্যালয়ের পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। কলকাতার হিন্দু স্কুল থেকে অমল কুমার কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাশ করেন। এরপর তাঁর ইচ্ছে ছিল পছন্দের বিষয় গণিত নিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু তাঁর বাবা গণিত নিয়ে পড়াশোনা করেও কর্মজীবনে ততটা সাফল্য লাভ করতে পারেননি বলে অমল কুমারকে এই বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেন। সেজন্য তিনি পদার্থবিদ্যায় সাম্মানিক সহ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালে তিনি এই কলেজ থেকেই স্নাতক উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স কলেজ ক্যাম্পাস থেকে স্নাতকোত্তরের পরীক্ষায় পাশ করেন। এম.এস.সি-তে তাঁর বিশেষ পত্রের বিষয় ছিল ‘এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি’ (X-ray Crystallography)। ১৯৪৫ সালে তিনি ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অফ সায়েন্স’ (Indian Association for the Cultivation of Science, IACS)-এ শিক্ষার্থী গবেষক (research scholer) হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে তিনি এখানেই গবেষকের চাকরি পান। এই সংস্থার কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ্যা’-এর উপর কাজ করতে বললে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য তৈরি হয়। কারণ অমল কুমারের আসল আগ্রহ ছিল ‘তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা’র উপর। বিশেষ করে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উপরে তাঁর গবেষণা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। তিনি নিজের চেষ্টায় এই তত্ত্বে ব্যবহৃত জটিল গণিত, যাকে বলা হয় ‘ডিফারেনশিয়াল জিওমেট্রি’ আয়ত্ত করেন এবং আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

১৯৪৯ সালে তিনি আশুতোষ কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগদান করেন। এই সময় তাঁর কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পরে তিনি আপেক্ষিকতা বিষয়ক ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’ নামে বিখ্যাত সূত্রটি আবিষ্কার এবং প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এই সূত্রটি পেনরোজ-হকিং এর ‘সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব’-এর (singularity theorem) প্রমাণের মূল উপাদান হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। তবে এই ক্ষেত্রে ব্যবহার ছাড়াও সমীকরণটির নিজস্ব গুরুত্ব আছে। বস্তুর এককত্ব বা সিঙ্গুলারিটি আছে কি নেই তা বোঝার জন্য এই ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও ‘বিগ ব্যাং’ (Big Bang) তত্ত্ব চর্চার ক্ষেত্রেও এই সমীকরণ কাজে লাগে। এই সূত্রটি আবিষ্কারের কাজে অমল কুমারকে সাহায্য করেছিলেন রাশিয়ান পদার্থবিদ লেভ ল্যাণ্ডাউ (Lev Landau)। তাই বিজ্ঞানীমহলে এই সমীকরণটি ‘ল্যাণ্ডাউ-রায়চৌধুরী সমীকরণ’ নামেও পরিচিত। ১৯৫৫ সালে এই সমীকরণ সম্পর্কিত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় একটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিজ্ঞান পত্রিকা ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’তে (Physical Review)। এই গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল ‘রিলেটিভিটিস্টিক কসমোলজি: ওয়ান’ (Relativistic Cosmology: One)।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি কণার স্রোতই শুধু সামনের দিকে এগোয়। অমল কুমার রায়চৌধুরী দেখিয়েছিলেন, সামনের দিকে এগোতে এগোতে প্রতিটি কণার স্রোতই কোনো একটি বিন্দুতে গিয়ে মিলে যায় বা ‘ফোকাসড’ (focused) হয়। তিনি আরো দেখতে পান যে কণার স্রোতগুলির এইভাবে মিলে যাওয়াই হল আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণগুলির অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি (inevitable consequence)। একেই বলা হয় পদার্থের ‘এককত্ব’ বা singularity যেখানে পৌঁছে পদার্থ ও তার অণু-পরমাণুর ঘনত্ব অসীম হয়ে যায়, অসীম হয়ে যায় ব্রহ্মাণ্ডের স্থান-কালের বক্রতাও। এই অবস্থায় পৌঁছে গেলে আলোর বেরিয়ে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে ‘সময়’ বা ‘কাল’ও। যেখানে অচল হয়ে যায় বিজ্ঞানের সমস্ত নিয়মকানুন ও তার যাবতীয় ব্যাখ্যা (physical laws)। সরলভাবে বলতে গেলে, এই হল ‘রায়চৌধুরী সমীকরণ’। এই সমীকরণ মেনে এবং তার উপরে গবেষণা করেই ‘পেনরোজ-হকিং সিঙ্গুলারিটি থিয়োরেম’-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ। স্টিফেন হকিং এবং রজার পেনরোজ অসংখ্যবার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন অমল কুমার রায়চৌধুরীর কাছে। কয়েক বছর পর তিনি জানতে পারেন যে তাঁর ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে আলোচিত হয়েছে এবং বিজ্ঞানী প্যাসকুয়াল জর্ডান-এর (Pascual Jordan) মতো সুবিখ্যাত পদার্থবিদ এর প্রশংসা করেছেন। তখন তিনি সাহস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করার জন্য গবেষণাপত্রটি জমা করেন। এই সুবিখ্যাত আবিষ্কারের জন্য ১৯৬০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টরেট’ উপাধি প্রদান করে।

১৯৬১ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপকের পদে যোগ দেন। অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি এই কলেজেই অধ্যাপনা করতেন।

শুধু বিজ্ঞানের গবেষণা নয়, অমল কুমার রায়চৌধুরী লেখক হিসেবেও ছিলেন সুদক্ষ। সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা বইগুলির নাম হল ‘থিয়োরিটিক্যাল কসমোলজি’, ‘ক্লাসিক্যাল মেকানিকস: এ কোর্স অফ লেকচারস’ এবং ‘জেনারেল রিলেটিভিটি, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স অ্যাণ্ড কসমোলজি’। বাংলা ভাষায় রচিত তাঁর একমাত্র বই হল ‘আত্মজিজ্ঞাসা এবং অন্যান্য রচনা’। আত্মজীবনীমূলক এই বইটি রচনা করার কাজে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর মেয়ে শ্রীমতী পারঙ্গমা সেন।

গবেষক হিসেবে এত সাফল্যের পরেও ব্যক্তিগত ভাবে ভীষণ সহজ-সরল জীবন যাপন করতেন অমল কুমার রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। নিজের সাফল্য নিয়ে আড়ম্বর করা তিনি পছন্দ করতেন না। নিজে পদার্থবিদ হয়েও তিনি কখনই কম্পিউটার ব্যবহার করতেন না। সুদীর্ঘকালের গবেষক জীবন ও লেখক জীবনেও কাগজ-কলম ছিল তাঁর সবসময়ের সঙ্গী। অমল কুমার সরাসরি কখনো রাজনীতিতে যোগদান করেননি, যদিও তাঁর মধ্যে রাজনীতি সম্পর্কেও বিপুল জ্ঞান ছিল। তাঁর বিভিন্ন লেখার মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। শেষ জীবনটা জন্মভূমি বাংলাদেশেই কাটিয়েছিলেন তিনি।

নিজের বিস্ময়কর প্রতিভা ও বিজ্ঞান শাখায় বিশেষ অবদানের জন্য অমল কুমার রায়চৌধুরী সারা জীবনে অনেক সম্মান ও উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ তাঁকে ‘অধ্যাপক এ. সি ব্যানার্জী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করে। এই সংস্থা থেকেই তিনি ‘ভাইনু বাপ্পু স্মৃতি পুরস্কার’ লাভ করেন। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ‘কাউসা’ (cousa) উপাধি প্রদান করে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক অতিথি অধ্যাপক (Honorary Visiting Professor) উপাধি পান। ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’ এবং ‘ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’ তাঁকে সদস্য হিসেবে নির্বাচন করে। ‘ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্টস কমিশন’ বা UGC তাঁকে ‘এমেরিটাস ফেলো’ (Emeritus Fellow) পদে অধিষ্ঠিত করে। ‘অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটি অফ ইণ্ডিয়া’ এবং মহারাষ্ট্রের পুণেতে অবস্থিত ‘ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাণ্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’ তাঁকে সম্মানসূচক সদস্য (Honorary Fellow) হিসেবে নির্বাচিত করে। তিনি ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ জেনারেল রিলেটিভিটি অ্যাণ্ড গ্র্যাভিটেশন’-এর সভাপতিত্ব করেছিলেন। অমল কুমার রায়চৌধুরী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন জেনারেল রিলেটিভিটি অ্যাণ্ড গ্র্যাভিটেশন’-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

অমল কুমার রায়চৌধুরীর মৃত্যুর ঠিক আগে ২০০৫ সালে তাঁর সম্পর্কে একটি তথ্যচিত্র মুক্তি পায়। ‘বিজ্ঞান প্রসার’ এবং পুণের ‘ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার অফ অ্যাস্ট্রোনমি অ্যাণ্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এর যৌথ উদ্যোগে এই তথ্যচিত্রটি প্রযোজিত হয়।

২০০৫ সালের ১৮ জুন ৮১ বছর বয়সে বাংলাদেশের বরিশালে অমল কুমার রায়চৌধুরীর মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. শরীফ মাহমুদ সিদ্দিকী, 'বাংলার আইনস্টাইন : অমল কুমার রায়চৌধুরী', অনুপম প্রকাশনী, ২০১২, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৬-১৮ 
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://www.anandabazar.com/
  5. https://www.insaindia.res.in/
  6. https://youtu.be/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়