রজার পেনরোজ

রজার পেনরোজ

ব্রিটিশ গণিতবিদ স্যার রজার পেনরোজ (Roger Penrose) মূলত বিজ্ঞানের জগতে দার্শনিক হিসেবে বিখ্যাত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের এমেরিটাস রাউস বল অধ্যাপক রজার পেনরোজ লণ্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের একজন সম্মানিত সদস্য। আইনস্টাইন প্রবর্তিত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এবং বিশ্ব সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্পর্কে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর কাজের কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন রজার পেনরোজ। এছাড়া স্টিফেন হকিং-এর সঙ্গে ‘পেনরোজ-হকিং সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব’ প্রবর্তনের জন্য ১৯৮৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উলফ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। বিশ্ব সৃষ্টির ইতিহাসে আপেক্ষিকতার তত্ত্বে ব্ল্যাক হোল তৈরির ধারণাটিকে তিনিই প্রথম প্রবর্তিত করেছিলেন। বিগ ব্যাং-এর আগেও যে বিশ্বজগতের এক অধ্যায় ছিল তা তিনিই প্রথম ঘোষণা করেন। গণিতের গবেষণায় ‘অসীম’-এর এক অভিনব ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিনি। কনফর্মাল সাইক্লিক কসমোলজি বিষয়ে রজার পেনরোজের লেখা ‘সাইকেলস অফ টাইম – অ্যান এক্সট্রা অর্ডিনারি নিউ ভিউ অফ দি ইউনিভার্স’ বইটি খুবই জনপ্রিয়।

১৯৩১ সালের ৮ আগস্ট ইংল্যাণ্ডের কোলচেস্টারে রজার পেনরোজের জন্ম হয়। তাঁর বাবা লিওনেল পেনরোজ পেশায় একজন মনোবিদ ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল মার্গারেট লেথেস। তাঁর ঠাকুরদা জে. ডয়েল পেনরোজ এক বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন, তাঁর ঠাকুরমা ছিলেন সম্মানীয় এলিজাবেথ জোসেফিন পেকওভার। অন্যদিকে তাঁর দাদু জন বেরেসফোর্ড লেথেস পেশায় ছিলেন একজন শারীরবিজ্ঞানী এবং তাঁর দিদা ইহুদি রাশিয়ান সোনিয়া মেরি নাতানসন ১৮৮০ সালের দিকে সেন্ট পিটার্সবার্গ ছেড়ে চলে এসেছিলেন। তাঁর কাকাও বিখ্যাত চিত্রশিল্পী অ্যান্টনি পেনরোজ এবং তাঁর ভাই অপর এক শারীরবিজ্ঞানী অলিভার পেনরোজ। সবশেষে তাঁর সৎ বাবা ম্যাক্স নিউম্যান ছিলেন একজন গণিতবিদ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পুরো শৈশবকাল পেনরোজ কানাডায় কাটিয়েছিলেন। তাঁর বাবা লণ্ডনের ওন্টারিওতে কাজ করতেন। পেনরোজের যখন আট বছর বয়স, সেই সময় তাঁর বাবা বিশ্বযুদ্ধের প্রকোপ থেকে বাঁচতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। পরবর্তীকালে কোকথর্প স্কুলের অ্যাকাডেমিক ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর এবং একাধারে অ্যাবিংডন স্কুলের গণিত বিভাগের প্রধান ভেনেসা থমাসকে বিবাহ করেন রজার পেনরোজ। তাঁদের এক পুত্র সন্তান জন্মায়। যদিও এর আগে ১৯৫৯ সালে আমেরিকান জোয়ান ইসাবেল ওয়েজের সঙ্গেও রজার পেনরোজের বিবাহ হয়েছিল এবং তাঁদের তিন পুত্রসন্তান ছিল।   

ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুলে রজার পেনরোজের শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়। এরপরে তিনি লণ্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫২ সালে লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক স্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। লণ্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে তাঁর বাবাও অধ্যক্ষ হিসেবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ছোটোবেলায় পেনরোজ গণিতে কিছুতেই সফল হতে পারতেন না। গণিত ছিল তাঁর কাছে এক গোলকধাঁধার মতো। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে সেখানকার বিদ্যালয়ে ও কলেজে পেনরোজ এমন এক তরুণ কানাডিয়ান শিক্ষকের সাহচর্য পান যে তাঁর এই ব্যর্থতার মধ্যেও পেনরোজের ভিতরকার অসীম ক্ষমতার বিষয়ে আঁচ পেয়েছিলেন এবং সেই মতো তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। তারপরই গণিতের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন রজার পেনরোজ। ১৯৫৫ সালে ছাত্রাবস্থাতেই ই. এইচ. মুরের ম্যাট্রিক্স ইনভার্সের ধারণাটি পুনঃপ্রবর্তন করেন যা ‘মুর-পেনরোজ ইনভার্স’ নামেও পরিচিত হয়। জ্যামিতি এবং জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক স্যার ডব্লিউ. ভি. ডি. হজের অধীনে গবেষণা করতে শুরু করেন রজার পেনরোজ। ১৯৫৮ সালে কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে তাঁর এই গবেষণাকর্ম শেষ করেন তিনি। বীজগণিতবিদ ও জ্যামিতিবিদ স্যার জন এ. টডের অধীনে সম্পন্ন এই গবেষণার বিষয় ছিল – ‘বীজগাণিতিক জ্যামিতিতে টেন্সর পদ্ধতি’। তাঁর এই গবেষণার ক্ষেত্রটি বিশুদ্ধ গণিতের ক্ষেত্র নয়, বরং একে বলা হয় ‘টোপোলজি’। ক্রমে পদার্থবিদ্যার প্রতিও আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫০ সালের দিকে তাঁর হাত ধরেই পেনরোজ ত্রিভুজের ধারণাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অসম্ভাব্যতার এক বিশুদ্ধ রূপ এর মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে চাইলেন তিনি। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এম. সি. এসচারের কিছু ছবি দেখে অসম্ভাব্যতার এই ধারণার জন্ম হয় পেনরোজের মনে। ১৯৫৪ সালে আমস্টারডামে একটি সভায় যোগ দেওয়ার সময়েই এসচারের ছবির একটি প্রদর্শনী লক্ষ্য করেন পেনরোজ। তারপরই নিজে থেকে তিনি এমন সব অসম্ভব সব জ্যামিতিক গঠন তৈরি করতে থাকেন। পেনরোজ ত্রিভুজ এমনই এক অসম্ভব গঠন যাকে আপাতভাবে বাস্তব ত্রিমাত্রিক ত্রিভুজ বলে মনে হলেও আসলে তা ছিল না। গবেষণা করার পাশাপাশি গাণিতিক ‘অসীম’-এর ধারণা নিয়ে নতুন এক তত্ত্বের জন্ম দেন পেনরোজ এবং অসীমের এই ধারণা থেকেই তিনি জ্যামিতিক কিছু নকশা তৈরির চেষ্টা করেন। এই নকশাগুলির মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত ছিল সিঁড়ির নকশাটি। একটি বর্গক্ষেত্রের চারপাশে উঠে গেছে দেয়াল আর এই দেয়ালের প্রতিটা সিঁড়ি দিয়েই উপরে ওঠা যায়। কিন্তু একটা সিঁড়ির শেষে উঠে দেখা যায় তার থেকেও উঁচু একটা সিঁড়ি আছে। এটা এক জ্যামিতিক গোলকধাঁধা, ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘জিওমেট্রিক্যাল ইলিউশন’। পেনরোজের বাবাও তাঁকে খুব উৎসাহ দিতেন। পেনরোজের জ্যামিতিক চিত্ররূপ দিয়েছিলেন এক ডাচ চিত্রশিল্পী এসচার।

১৯৫৬-৫৭ সালে লণ্ডনের বেডফোর্ড কলেজে সহকারী প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রজার পেনরোজ। এরপর কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজে গবেষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে প্রথমে প্রিন্সটনে এবং পরে সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যাটোর একটি গবেষণার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন পেনরোজ। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি লণ্ডনের কিংস কলেজে গবেষণা করেন। ১৯৬৩-৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন রজার পেনরোজ। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ইয়েশিভা, প্রিন্সটন এবং কর্নওয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপকের পদে আসীন ছিলেন তিনি। লণ্ডনের বার্কবেক কলেজে প্রভাষক থাকাকালীন ক্যালটেকের কিপ থর্নের ধারণা থেকে বিশুদ্ধ গণিতের দিক থেকে মহাজাগতিক পদার্থবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন রজার পেনরোজ। এই সময় থেকেই আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এবং বিশ্বজগতের সৃষ্টি বিষয়ে গবেষণা করতে থাকেন তিনি। স্টিফেন হকিং-এর সঙ্গে এই বিষয়ে একত্রে কাজ করে বিশ্বজগত সৃষ্টির আদি মুহূর্ত হিসেবে তাঁরা উপস্থাপন করেন পেনরোজ-হকিং সিঙ্গুলারিটিকে। বিশ্বজগত সৃশটির বিষয়ে রজার পেনরোজের তত্ত্ব ‘কনফর্মাল সাইক্লিক কসমোলজি’ নামে পরিচিত। আজ থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে যে বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে এই জগত সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করা হয়, সেই বিস্ফোরণের শক্তিটা কোথা থেকে এলো তা নিয়েই প্রশ্ন করেছেন পেনরোজ। তাঁর এই তত্ত্ব অনুসারে, বিগ ব্যাং-এর আগে একটি বিশ্বজগৎ ছিল যা সময় ও কালের নিরিখে ক্রমেই ফুলতে থাকে। এই বিশ্বজগৎ আদি শক্তির চাপে ক্রমেই ফুলতে ফুলতে সমস্ত্র বিলুপ্ত হয়ে শীতল হয়ে পড়বে। এই তাপমাত্রা এতই কম হবে যে ব্ল্যাকহোলগুলিও কোটি কোটি বিশ্বজগত অপেক্ষা উষ্ণ থাকবে। তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে সেই সময় ঐ কোটি কোটি ব্ল্যাকহোল একত্রে বিস্ফারিত হবে। এটাই বিগ ব্যাং। আদিতম বিশ্বজগৎ থেকে নতুন এক বিশ্বজগতের সৃষ্টি হয়েছে এভাবেই। এই মত অনুসারে সময়, কাল, স্থান ইত্যাদির আদি-অন্ত বলে কিছু নেই। ব্ল্যাকহোলের আকার-আকৃতি ও গঠন সম্পর্কেও তাঁর বর্ণনা আশ্চর্যজনক। ব্ল্যাকহোলের বাইরের পরিধিকে পেনরোজ নাম দেন ‘বদ্ধ তল’ বা trapped surface নামে যাতে আলো এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গে এক ঢুকলে আর বেরোতে পারে না। আইনস্টানের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের এক নতুন রূপ দেন পেনরোজ এভাবেই। তাঁর ইলিউশনের ধারণার সঙ্গেই ব্ল্যাকহোলের এই ধারণাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পেনরোজ টুইস্টার তত্ত্ব প্রবর্তন করেন যার মাধ্যমে মিনকাওস্কি স্পেসে চতুর্মাত্রিক জ্যামিতিক বস্তুর আকার-আকৃতির ধারণা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এছাড়া ১৯৭৪ সালে ‘পেনরোজ টাইলিংস’ নামে নতুন এক তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছিলেন তিনি। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রজার পেনরোজ হাউসটনের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন।

২০০৪ সালে পেনরোজ তাঁর নিজের তত্ত্বের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্বলিত পদার্থবিদ্যার নানা বিষয় নিয়ে একটি বই লেখেন ‘সাইকেলস অফ টাইম – অ্যান এক্সট্রা অর্ডিনারি নিউ ভিউ অফ দি ইউনিভার্স’ নামে। এছাড়াও তাঁর লেখা ‘দ্য রোড টু রিয়েলিটি – এ কম্পলিট গাইড টু দ্য ল’স অফ দ্য ইউনিভার্স’ বইটি খুবই বিখ্যাত।  

স্টিফেন হকিং-এর সঙ্গে ‘পেনরোজ-হকিং সিঙ্গুলারিটি তত্ত্ব’ প্রবর্তনের জন্য ১৯৮৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে উলফ পুরস্কার পেয়েছেন রজার পেনরোজ। আইনস্টাইন প্রবর্তিত আপেক্ষিকতার তত্ত্ব এবং বিশ্ব সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্পর্কে গাণিতিক পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন রজার পেনরোজ।

পদার্থবিদ্যা এবং বীজগাণিতিক জ্যামিতির নানা অনাবিষ্কৃত দিক আর মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের আরো নতুন নতুন সব ধারণা নিয়ে গবেষণায় লিপ্ত আছেন স্যার রজার পেনরোজ।

আপনার মতামত জানান