ইতিহাস

টি এন সেশান

তিরুনেল্লাই নারায়ণা আইয়ার সেশান (Tirunellai Narayana Iyer Seshan) বা টি এন সেশান ভারত সরকারের একজন উচ্চপদস্থ আমলা যিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন দশম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ভারতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তাঁর যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপের জন্য। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কার্যভার পাওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় সরকার অধীনস্থ বিভিন্ন মন্ত্রকে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং ভারতের আঠারোতম মন্ত্রীসভার সচিব (Cabinet Secretary) হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন।

১৯৩২ সালের ১৫ ডিসেম্বর কেরালার পালাক্কাড় জেলায় টি এন সেশানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন জেলা দায়রা আদালতের উকিল। দাদা ভেঙ্কটরামণ ছিলেন ভারতের প্রথম আই.এ.এস ব্যাচের প্রথম স্থানাধিকারী। তাঁরই অনুপ্রেরণায় সেশান আই.এ.এস হওয়ার লক্ষ্য স্থির করেন। সেশানের স্ত্রীয়ের নাম জয়ালক্ষ্মী। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন।

ছয় ভাইবোনের কনিষ্ঠতম সেশান পড়াশনা করেন পালাক্কাড়ের বাসেল ইভানজেলিকাল মিশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল থেকে। এরপরে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন গভর্নমেন্ট ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ই শ্রীধরণ(যিনি ভারতে মেট্রো রেলের জনক হিসেবে বিখ্যাত)। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য সেশান অন্ধ্রপ্রদেশের জে.এন.টি.ইউ কলেজে সুযোগ পেলেও তিনি মাদ্রাস ক্রিশ্চিয়ান কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে ভর্তি হন। অসামান্য মেধাবী এবং কঠোর পরিশ্রমী সেশান চারবছরের কোর্স শেষ করেন মাত্র তিন বছরের মধ্যেই। বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার সুযোগ তৎকালীন ভারতবর্ষে বেশ কম থাকার দরুন সেশান বি.এস সি ডিগ্রী লাভ করার পরের তিনবছর তিনি ওই কলেজেই শিক্ষকতার চাকরী নেন। বয়স কম থাকায় তিনি আই.এ.এস পরীক্ষায় বসতে না পারলেও ১৯৫৩ সালে তিনি ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস এর পরীক্ষা দেন এবং প্রথম স্থান গ্রহণ করেন। যদিও তিনি এই চাকরিতে যোগদান করেননি। ১৯৫৪ সালে তিনি ইন্ডিয়ান আ্যডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস পরীক্ষা দেন এবং প্রথম সারিতেই উত্তীর্ণ হন।

১৯৫৫ সালে কোয়েম্বাতুর জেল্লার আ্যসিসট্যান্ট কালেক্টর হিসেবে সেশান তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি মাদুরাই জেলার সাবকালেক্টার হিসেবে নিযুক্ত হন। জল পরিবহণ, রেশনের সুবন্টন এবং সাবকালেক্টার পদের যাবতীয় দায়ভার তিনি দক্ষতার সাথে সামলান। একবার এক দলিত ব্যক্তি আর্থিক তছরুপের দায়ে গ্রেপ্তার হন। ঘটনাচক্রে তিনি স্থানীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন। মন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করেই সেশান এই ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যান এবং বুঝিয়ে দেন আইনের উর্ধ্বে তাঁর কাছে বাকি সবকিছুই মুল্যহীন। ১৯৫৮ সালে সেশান মাদ্রাজের গ্রামোন্নয়ন দপ্তরে সহকারী সচিব পদে বদলি হন। এই পদে থাকাকালীন কোন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ায় রাতারাতি তাঁর কার্যভার পরিবর্তন করা হয়। তৎকালীন শিল্প ও পরিবহন মন্ত্রী রামাস্বামী ভেংকটরামাণ সেশানের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই তাঁকে মাদ্রাজ শহরের পরিবহণ দপ্তরের নির্দেশক পদে বহাল করেন। দৈনিক তিন হাজার বাস চলাচল এবং পরিবহণ দপ্তরের চল্লিশ হাজার কর্মচারীকে অত্যন্ত সুচারু ভাবে সামলানোর পর তিনি মাদুরাই জেলার কালেক্টার পদে বদলি হন। আড়াই বছর এই পদে কাজ করার পর সেশান আ্যড ম্যাসন ফেলোশিপ পেয়ে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক আ্যডমিনেস্ট্রেশন নিয়ে পড়তে যান এবং ১৯৬৮ সালে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৬৯ সালে দেশে ফেরার পর তাঁকে অ্যাটমিক এনার্জি কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এরপর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল অব্দি সেশান সায়েন্স আ্যন্ড টেকনোলজি মন্ত্রকের অন্তর্ভুক্ত ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস-এর যুগ্মসচিব হিসেবে কাজ করেন। দিল্লীতে বিভিন্ন মন্ত্রকে কাজ করার পর সেশান ফিরে আসেন তামিলনাড়ুতে। অল্প সময়ের জন্য তিনি রাজ্যের কৃষি ও শিল্প দপ্তরের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময়ে তামিলনাড়ুর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর সাথে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ে তিনি আবার দিল্লী ফিরে যান। দিল্লীতে ফেরার পর তাঁকে অয়েল এন্ড ন্যাচারাল গ্যাস কমিশনের মেম্বার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। দু বছর পর তিনি পুনরায় ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস-এ নিযুক্ত হন। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল অব্দি তিনি এই দপ্তরে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি পরিবেশ ও বনাঞ্চল মন্ত্রকের সচিব নিযুক্ত হন। তাঁর সময়ে ভারত সরকারের এই মন্ত্রকটি প্রশাসনিক দিক দিয়ে অন্যতম সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। তিনি নর্মদা নদীর উপর তেহরী ড্যাম এবং সর্দার সরোবর ড্যাম তৈরীর বিরোধিতা করলেও সরকার তা মানতে অস্বীকার করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রতিরক্ষা দপ্তরের সচিব হিসেবে এক বছরেরও কম সময় কাজ করেন। ১৯৮৯ সালে সেশান ভারতের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সাথে সুসম্পর্ক থাকার কারণেই সেশান ক্যাবিনেট সচিবের পদের জন্য মনোনীত হন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের পদবিন্যাসে যা সর্বোচ্চ। যদিও মাত্র কয়েক মাস তিনি এই পদে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্ব হারানোর পরই সেশানকে ক্যাবিনেট সচিবের পদ থেকে প্ল্যানিং কমিশনের মেম্বার পদে স্থানান্তরিত করা হয়। এইসময়ই সেশানের বন্ধু তথা প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের মন্ত্রীসভার আইনমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম স্বামী তাঁকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। প্রাথমিক ভাবে অরাজী হলেও রাষ্ট্রপতি ভেঙ্কটরামণের উপদেশে তিনি এই পদ গ্রহণে সম্মত হন।

১৯৯০ সালের ১২ ডিসেম্বর সেশান ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের দশম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সমগ্র কর্মজীবনে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পর্যায় হল ১৯৯০ থেকে ১৯৯৬ সাল, যে সময় তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। পদগ্রহণের সাথে সাথেই তিনি বুঝতে পারেন ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং ভুলভ্রান্তিময়। সংবিধানে বর্ণিত আইন-কানুন উপেক্ষা করেই এযাবৎ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। শোনা যায় কমিশনের অফিসের মধ্যে তিনি কোন দেব-দেবীর ছবি রাখার অনুমতি দেননি, যাতে কমিশনের ধর্ম নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। তিনি প্রথমেই নির্বাচনের বেলাগাম খরচের উপর রাশ টানেন। প্রত্যেক ভোটপ্রার্থীকে খরচের হিসাব লিখিত রূপে জমা করতে বলা হয়। তিনি রাজ্য বা দেশে নির্বাচন ঘোষণার সাথে আদর্শ নির্বাচন বিধি চালু করেন। যে কোন নির্বাচনেই যেহেতু সুবিশাল লোকবল প্রয়োজন হয়, তাই তিনি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মীদের সাময়িক ভাবে কমিশনের আওতায় নিযুক্ত করেন। স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য তিনি নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতা খর্ব করেন এবং সুপ্রীম কোর্ট ও তাঁর নিজের চালু করা নিয়মই বহাল রাখেন। ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টাকে দমন করার জন্য তিনি টাকার আদান-প্রদান, নেশাজাত দ্রব্য সরবরাহ ইত্যাদি নিষিদ্ধ করেন। প্রচারের সময় উচ্চস্বরে মাইকের ব্যবহারও বন্ধ করেন। এমনকি প্রার্থীদের প্রচারের সময় সরকারি সম্পত্তির ব্যবহার সীমিত করেন। ভোটারদের অধিকার সুরক্ষিত করার জন্য তিনিই সচিত্র পরিচয়পত্র বা ভোটার কার্ড চালু করেন। রাজনৈতিক নেতাদের প্রবল বিরোধিতার পরেও তিনি তাঁর সংস্কারগুলির পরিবর্তন করেননি। নির্বাচনী প্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট হবার অভিযোগে ১৯৯২ সালে নির্বাচন কমিশন বিহারের নির্বাচন বাতিল করার মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত নেয়। শোনা যায়, তিনি প্রায় ৪০,০০০ আ্যকাউন্টের হিসাব খতিয়ে দেখেন এবং ১৪,০০০ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেন ভুয়ো তথ্য দেওয়ার জন্য। তাঁর তৈরী নিয়ম কানুন অনুসরণ করেই ১৯৯৯ সালে ১৪৮৮ জন প্রার্থী অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য দেওয়ার ফলে তিন বছরের জন্য নির্বাসিত হন। ১৯৯৬ সালে সেশান অবসর গ্রহণ করেন।

অবসরের পর সেশান ১৯৯৭ সালে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনয়ন দাখিল করেন। কিন্ত কে আর নারায়ণনের কাছে পরাজিত হন। এরপরে কিছুদিন তিনি চেন্নাইয়ের গ্রেট লেক্স ইন্সটিউট অফ ম্যানেজমেন্টে শিক্ষকতা করেন। স্বল্প সময়ের জন্য মুসৌরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশানাল অ্যাকাডেমি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্টে অন্তর্বর্তী প্রশাসক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।

১৯৯৬ সালে টি এন সেশান প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য রামন ম্যাগসেসে পুরস্কারে সম্মানিত হন। দীর্ঘ কর্মজীবনে সেশান বহু দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর একরোখা মনোভাবের জন্য তিনি বহু নেতা মন্ত্রীর বিরাগভাজন হয়েছেন। তিনি বুঝেছিলেন ভারতবর্ষে প্রশাসনিক কার্যক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই স্বচ্ছতার অভাব দেখা যায়। তিনি নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন ভোটারদের স্বার্থে নির্বাচন প্রক্রিয়ার যাবতীয় রদবদল করেন। বহু মানুষের কাছে তিনি আদ্যোপান্ত কঠোর এবং আত্মম্ভরিতায় পূর্ণ মানুষ হলেও তিনি প্রকৃতরূপে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন দূরদর্শী একজন প্রশাসক ছিলেন। সারাজীবন উচ্চ পদে আসীন হয়েও সেশান ও তাঁর স্ত্রী চেন্নাইয়ের বাড়িতে অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন।

২০১৯ সালের ১০ নভেম্বর ছিয়াশি বছর বয়সে স্বগৃহে টি এন সেশানের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন