ইতিহাস

রাজীব গান্ধী

রাজীব রত্ন গান্ধী (Rajiv Gandhi) ছিলেন স্বাধীন  ভারতের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। তিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ও স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পৌত্র এবং ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র।

১৯৪৪ সালের ২০ আগস্ট বোম্বেতে ( বর্তমান মুম্বাইতে) রাজীব গান্ধীর জন্ম হয় ৷ তাঁর বাবার নাম ফিরোজ গান্ধী , মায়ের নাম ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর বাবা ফিরোজ গান্ধী ছিলেন ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আর ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন স্বাধীন ভারতের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ছোটো ভাইয়ের নাম সঞ্জয় গান্ধী। ১৯৬৮ সালে তিনি এডভিজ আন্তোনিয়া আলবিনা মিনোকে বিয়ে করেন পরবর্তীকালে নাম পরিবর্তন করে যিনি সোনিয়া গান্ধী নামে পরিচিত হন ৷ 

রাজীব গান্ধীর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ১৯৫১ সালে শিব নিকেতন স্কুলে৷ তারপর ১৯৫৪ সালে তাঁকে পড়াশোনার জন্য দেরাদুনের ওয়েলহ্যাম বয়েস স্কুলে পাঠানো হয়৷ উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজীব গান্ধীকে ১৯৬১ সালে লন্ডনে পাঠানো যান এবং কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে তিনি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন৷ ১৯৬৬ সালে ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনে (Imperial College London) তিনি মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোর্স করার জন্য ভর্তি হন৷ কিন্তু কোর্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পড়া শেষ না করে তিনি ভারতবর্ষে  ফিরে আসেন৷ দেশে ফিরে তিনি দিল্লিতে ফ্লাইং ক্লাবের সদস্য হিসেবে যুক্ত হন যেখানে তিনি বিমান চালক হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন৷ 

রাজীব গান্ধীর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭০ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার  বিমানচালক হিসেবে৷ রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার তার কোনও আগ্রহ ছিল না৷ ২৩ জুন ১৯৮০ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর ভাই সঞ্জয় গান্ধী মারা যান৷ তখনই তাঁর মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি রাজনীতিতে পদার্পণ করার সিদ্ধান্ত নেন৷ যদিও তখন থেকে এখনও পর্যন্ত তিনি এয়ার ইন্ডিয়ার একজন কর্মচারী হিসেবেই নিযুক্ত আছেন। 

১৯৮১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজনীতিতে পা রাখেন৷ ওই সালের ৪ মে ইন্দিরা গান্ধীর সভাপতিত্বে  অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সভায় সকলের সম্মতিক্রমে বসন্তদাদা পাতিল রাজীব গান্ধীকে অমেঠী আসনের (Amethi constituency) প্রার্থী হিসাবে যোগদানের প্রস্তাব দেন এবং তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। তিনি সুলতানপুরে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে আসেন৷ তাঁর রাজনীতিতে প্রবেশের ঘটনা বহু সংবাদপত্রে, জনসাধারণ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দ্বারা সমালোচিত হয়েছিল। নির্বাচনে লোকসভা প্রার্থী শরদ যাদবকে ২৩৭০০০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তিনি এই পদটি লাভ করেন৷ 

১ আগস্ট সংসদের সদস্য হিসাবে তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই রাজীব গান্ধী প্রথম রাজনৈতিক সফর করেন ইংল্যান্ডে৷  সেখানে গিয়ে তিনি প্রিন্স চার্লস এবং লেডি ডায়ানা স্পেন্সারের বিবাহ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সেই বছরই ডিসেম্বর মাসে তাঁকে ভারতীয় যুব কংগ্রেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমস পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়৷ ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর  ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর থেকেই কংগ্রেসের বেশ কিছু নেতৃবৃন্দ এমনকি রাষ্ট্রপতি জৈল সিংও রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। সেই সময় দিল্লীতে শিখ বিরোধী দাঙ্গা চলছিল৷ রাজীব গান্ধী সমগ্র ঘটনার পরিপেক্ষিতে বলেন, “When a giant tree falls, the earth below shakes”। তাঁর এই বক্তব্যের ভিত্তিতে সমালোচনার ঝড় ওঠে৷ অনেকক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। রাজীব গান্ধী কার্যভার গ্রহণ করেন এবং পাঁচ বছরের লোকসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রপতি জৈল সিংকে লোকসভা ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করতে অনুরোধ জানান।

ভারতবর্ষের সংসদের ইতিহাসে সর্বকালীন সর্ববৃহৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কংগ্রেস পার্টি এক অভূতপূর্ব জয় লাভ করে। ১৯৮৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজীব গান্ধী মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী রূপে কার্যভার গ্রহণ করেন৷ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রাজীব গান্ধীর প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৯৮৫ সালে দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-defection Law) এর প্রবর্তন ৷ এই আইন অনুসারে, নির্বাচিত সংসদ বা আইনসভা সদস্যরা পরবর্তী নির্বাচনের আগে পর্যন্ত বিরোধী দলে যোগ দিতে পারবেন না৷  রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্বে ১৯৮৬ সালে ভারতের সংসদ ইসলাম ধর্মের তালাক প্রথা(Protection of Rights on Divorce) সম্পর্কীত আইন পাশ করে। রাজীব গান্ধী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সমগোত্রীয় শিল্পে সরকারী সহায়তা বৃদ্ধির প্রয়াস করেছিলেন। বৈদেশিক আমদানির পরিমাণ হ্রাস, প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্প, বিশেষত কম্পিউটার, এয়ারলাইনস, সামরিক ও টেলিযোগাযোগ প্রভৃতি ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাস করেছিলেন তিনি। ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধী  নতুন একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রবর্তনের কথা ঘোষণা করেন যা জাতীয় শিক্ষানীতি নামে পরিচিত। সারা ভারত ব্যাপী উচ্চ শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ ঘোষণা করা হয়েছিল৷ তিনি ১৯৮৬ সালে ‘জওহর নবোদয় বিদ্যালয় সিস্টেম’-এই নামে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন একটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। এই বিদ্যালয় ব্যবস্থার মুখ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, আর্থ-সামাজিক দিক থেকে দুর্বল পরিবারগুলির মেধাসম্পন্ন শিশুদের বেছে অন্য এক বিশ্বমানের পরিবেশে রেখে তাদেরকে উচ্চ মানদণ্ডের শিক্ষা প্রদান করা। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন।

১৯৯১ সালে ভারত সরকার দ্বারা রাজীব গান্ধীকে দেশের সর্বোচ্চ পুরষ্কার ভারতরত্ন প্রদান করা হয় । ২০০৯ সালে রাজীবগান্ধীকে মরণোত্তর দ্য রিভোলিউশনারি লিডার অফ মর্ডান ইন্ডিয়া পুরস্কারে ( The Revolutionary Leader of Modern India Award) ভূষিত করা হয়৷ 

রাজীব গান্ধীকে ১৯৯১ সালের ২১ মে মাদ্রাজের (বর্তমান চেন্নাই) শ্রীপেরিমবুদুরে এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় হত্যা করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।