ইতিহাস

জ্ঞানী জৈল সিং

জ্ঞানী জৈল সিং(Giani Zail Singh) ছিলেন স্বাধীন ভারতের সপ্তম রাষ্ট্রপতি। তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে শিখ সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রপতি৷  

১৯১৬ সালের ৫ মে পাঞ্জাবের ফারিদকোট জেলার সান্ধাওয়ানের এক গ্রামে জ্ঞানী জৈল সিংয়ের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম কিষান সিং এবং মায়ের নাম মাতা ইন্দকৌর৷ তাঁর বাবা পেশায় ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী। গ্রামে তাঁর নিজস্ব খেত ও ছিল। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সব থেকে ছোটো৷ খুব অল্প বয়েসে তিনি মা’কে হারান৷ তাঁর প্রকৃত নাম ছিল জার্নেল যার অর্থ ‘ সাধারণ। পরবর্তীকালে তিনি এই নাম বদল করে রাখেন জৈল।

জৈল সিংয়ের প্রথাগত পড়াশোনা তেমন ভাবে না হলেও পারিবারিক ভাবে তিনি ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠেছিলেন। ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি তাঁর এই আগ্রহ তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। তিনি ‘গুরু গ্রন্থসাহেব’ সাবলীল ভাবে পাঠ করতে পারতেন৷ পাশাপাশি তিনি শিখ মতবাদ এবং ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।  কলেজে ভর্তি হওয়ার ন্যুনতম শর্তগুলো তিনি পূরণ করতে পারেননি৷ অথচ অমৃতসরের শহীদ শিখ মিশনারী কলেজ এর কর্তৃপক্ষ জৈল সিংয়ের বুদ্ধি বিবেচনা করে জনসমক্ষে বক্তৃতা দেওয়ার ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কলেজে ভর্তি নেন। ‘গুরু গ্রন্থসাহেব’ পাঠে শিক্ষিত হওয়ার ফলে তিনি ‘ জ্ঞানী ‘ (Giani)  উপাধি লাভ করেন৷

জ্ঞানী জৈল সিংয়ের কর্মজীবন বলতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে হয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের পূনর্গঠনের সময় ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির সমালোচনা করে তিনি ফরিদকোটের শাসক হরিন্দার সিংহ ব্রারের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ফলস্বরূপ ৫ বছরের জন্য তাঁকে কারাগারে নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল ।

এরপরে মুখ্যমন্ত্রী জ্ঞান সিং রারেওয়ালার অধীনে গঠিত পতিয়ালা এবং পূর্ব পাঞ্জাব স্টেটস ইউনিয়নের রাজস্ব মন্ত্রী হওয়ার জন্য তাঁকে আহ্বান জানানো হয় এবং পরে ১৯৫১ সালে তিনি কৃষিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন৷ তিনি রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক কাজকর্ম করেছিলেন। ১৯৮০ সালে জ্ঞানী জৈল সিং সপ্তম লোকসভা নির্বাচনে নির্বাচিত হন এবং ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন৷ ১৯৮২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত হন। যদিও তাঁর পদপ্রাপ্তীর পর গনমাধ্যমে প্রচার হয় জ্ঞানী জৈল সিং ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ অনুগত হওয়ায়  তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ দেওয়া হয়েছে৷ নির্বাচনের পর জ্ঞানী জৈল সিং বলেছিলেন  “If my leader had said I should pick up a broom and be a sweeper, I would have done that. She chose me to be President.” ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ছিলেন। ১৯৮৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি  “পোস্ট অফিস (সংশোধনী) বিল” এর সম্মতি প্রত্যাখ্যান করার জন্য পকেট ভেটোর ব্যবহার করেছিলেন৷ যদিও ১৯৯০ সালে ভি. পি. সরকার বিলটি প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন৷ 

১৯৭২ সালে তিনি পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন থাকার সময় বেশ কিছু ধর্মীয় সমাবেশ করেছিলেন। দশম শিখগুরু গুরু গোবিন্দ সিংয়ের নামে একটি মহাসড়ক উদ্বোধনের পাশাপাশি গুরুর ছেলের নামে একটি জনপদের নামকরণ করেছিলেন। রাজ্যের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আজীবন পেনশন প্রকল্প তৈরি করে দিয়েছিলেন জৈল সিং। তিনি লন্ডন থেকে ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব উধম সিংয়ের দেহাবশেষ, গুরু গোবিন্দ সিংহের সজ্জিত অস্ত্র এবং ব্যবহৃত সামগ্রীগুলি দেশে ফেরত আনিয়ে ছিলেন৷ 

১৯৮২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর কোট্টায়াম নেহেরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ক্যাথলিকস প্ল্যাটিনাম জুবিলি উদযাপন সভায় জৈল সিংকে ইন্ডিয়ান অর্থোডক্স চার্চ দ্বারা সম্মানিত সর্বোচ্চ সম্মান  “অর্ডার অফ দি সেন্ট থমাস “খেতাবে ভূষিত করা হয়। 

গাড়ি দুর্ঘটনায় ১৯৯৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জৈল সিংয়ের মৃত্যু হয়।

দিল্লীর রাজঘাট স্মৃতিসৌধে তাঁর শেষকৃত্য করা হয়।তাঁর মৃত্যুর পরে ভারত সরকার  সাত দিনের সরকারী শোক ঘোষণা করেছিল। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।