ইতিহাস

ই শ্রীধরণ

ই শ্রীধরণ (E. Sreedharan) একজন ভারতীয় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সার্ভিস অফ ইঞ্জিনিয়ার্স (Indian Railway Service of Engineers,IRSE) এর অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক। ভারতীয় গণপরিবহন জগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কলকাতা মেট্রো (Kolkata Metro) এবং কোঙ্কন রেলওয়ে (Konkan Railway) তাঁরই তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে। তিনি “মেট্রো ম্যান” (Metro Man) নামেও খ্যাত। 

১৯৩২ সালের ১২ জুন ভারতের কেরল প্রদেশের পালাক্কাদ  জেলার থ্রিথালা অঞ্চলে ই শ্রীধরণের জন্ম হয়। ই শ্রীধরণের সম্পূর্ণ নাম ইলাত্তুভালাপিল শ্রীধরণ। তাঁর বাবার নাম নীলাকান্দান মোসাথ এবং মায়ের নাম আম্মালুআম্মা। তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় পালাক্কাদের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে। এরপর তিনি বাস্তিল ইভাঞ্জেলিক্যাল মিশন হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল  (Bastil Evangelical Mission Higher Secondary School) ও ভিক্টোরিয়া কলেজ (Victoria College) থেকে পড়াশোনা করেন। অন্ধ্রপ্রদেশের গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (Government Engineering College) থেকে তিনি তাঁর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন।

শ্রীধরণ খুব অল্প সময়ের জন্য কোঝিকোরের গভর্নমেন্ট পলিটেকনিক কলেজে লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। এর সাথে তিনি বোম্বে পোর্ট ট্রাস্টে (Bombay Port Trust) এক বছর শিক্ষানবীশ হিসাবে কাজ করেন। পরবর্তীকালে তিনি ১৯৫৩ সালে  ইন্ডিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস পরীক্ষায়  উত্তীর্ণ হয়ে ইন্ডিয়ান রেলওয়ে সার্ভিস অফ ইঞ্জিনিয়ার্সে যোগ দেন। 

১৯৬৪ সালে সাইক্লোনে পাম্বান সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই রেল সেতুটি রামেশ্বরমকে মূল ভারতীয় ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করে। এই সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রামেশ্বরম মূল ভূখণ্ডে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যেহেতু এই সেতুটি প্রায় আড়াই কিলোমিটার বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে গেছে সেহেতু এটি মেরামত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক এই সময় সরকার শ্রীধরণকে এই কাজের দায়িত্ব দেয়। যদিও তাঁকে এই কাজের সময় সীমা দেওয়া হয়েছিল ছয় মাস, শ্রীধরণ কাজটি ৪৬ দিনেই সুসম্পন্ন করেন।

১৯৭০ সালে শ্রীধরণ প্রধান ডেপুটি ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কলকাতায় ভারতের প্রথম মেট্রো তৈরি করার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সামিল হন। ১৯৭৯ সালে তিনি কোচিন শিপইয়ার্ডে যোগদান করেন। ১৯৮১ সালে এই সংস্থায় তাঁর আধিকারিক থাকাকালীন এর প্রথম জাহাজ এম ভি রানী পদ্মিনী (MV Rani Padmini) তৈরি হয়। ১৯৮৭ সালে পশ্চিম রেলওয়ে জেনারেল ম্যানেজার পদে তিনি উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৮৯  সালে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের মেম্বার অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভারত সরকারের এক্স অফিসিও সেক্রেটারি (ex-officio Secretary) পদেও নিযুক্ত হন। যদিও ১৯৯০ সালে তাঁর অবসর গ্রহণ করার কথা ছিল, কিন্তু তৎকালীন রেলমন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের দ্বারা শ্রীধরণ কোঙ্কন রেলওয়েজে চেয়ারম্যান অ্যান্ড ম্যানেজিং ডিরেক্টর (managing director) হিসেবে নিয়োজিত  হন। ঠিক এই সময় প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের (Gulf War) জন্য নানা দেশ তথা ভারতেও জ্বালানির সমস্যা দেখা দেয়। এই কারণে বিভিন্ন প্রকল্প সমস্যার সম্মুখীন হয়; কিন্তু এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শ্রীধরণ তাঁর বুদ্ধিমত্তা দ্বারা কোঙ্কন রেলওয়ের কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাঁর তত্ত্বাবধানে কোঙ্কন রেলওয়ে সাত বছরেই চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করে।

শ্রীধরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল দিল্লি মেট্রো। তৎকালীন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী সাহিব সিং ভার্মা তাঁকে দিল্লি মেট্রো কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯৯৭ সালের মধ্যে সময় এবং বাজেটকে সঠিক কাজে লাগিয়ে তিনি এখানেও সাফল্য লাভ করেন। এই দিল্লি মেট্রো প্রকল্পে তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য তখনকার সংবাদমাধ্যম তাঁকে “মেট্রো ম্যান” উপাধি দেয়। এই প্রকল্পটি তাঁর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক হিসেবে ধরা হয়। এর জন্য তিনি ২০০৫ সালে ফ্রান্স সরকারের দ্বারা প্রদত্ত  কিং অফ দা লিজিয়ন অফ অনার (King of the Legion of Honour)  সম্মান এবং ২০০৮ সালে ভারত সরকার দ্বারা প্রদত্ত পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। যদিও ২০০৫ সালে তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার কাজের সময়সীমা আরও বাড়ানো হয়। অবশেষে ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

শ্রীধরণের অবসর গ্রহণের পর তাঁকে কোচি মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই প্রকল্পটির সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন। ভারতীয় ইতিহাসে এই প্রকল্পটিও নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন এখানে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কাজে নিযুক্ত করা হয়, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়, সৌর শক্তির ব্যবহার করা হয় ইত্যাদি। এইসব গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের পাশাপাশি তিনি লখনৌ মেট্রো প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন। এছাড়াও তিনি জয়পুর মেট্রো, অন্ধ্রপ্রদেশ মেট্রো, কোয়েম্বাটুর মেট্রো, মীরাট মেট্রো, মুম্বাই মেট্রো ও আরো নানা প্রকল্পের সাথে যুক্ত আছেন।

এখনো কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে বিভিন্ন শহরের রেল কর্তৃপক্ষ তাঁর পরামর্শ নিয়ে থাকে। তিনি মনে করেন আমাদের দেশে অনেক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মেট্রো ব্যবস্থা নির্মাণ করার গতি খুবই মন্থর। তাঁর মতে,  চীনে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ কিলোমিটার মেট্রো রেল পথ তৈরি করা হয়, সেখানে ভারতে ২৫ কিলোমিটারের কাছাকাছিও করা হয়ে ওঠে না। এছাড়া তিনি এও মনে করেন যে মেট্রো পরিষেবা সাধারণ মানুষের জন্য হওয়া উচিত। লাভের পরিমাণ কম হলেও টিকিটের দাম সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন।

শ্রীধরণ তাঁর এই বর্ণাঢ্য জীবনে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হন যেমন পদ্মবিভূষণ, পদ্মশ্রী, জিন্দাল পুরস্কার, ভারত শিরোমণি পুরস্কার, রেল মন্ত্রকের দ্বারা প্রদত্ত পুরস্কার, দ্যা টাইমস অফ ইন্ডিয়া দ্বারা প্রদত্ত ম্যান অফ দ্যা ইয়ার ওম প্রকাশ ভাসিম পুরস্কার, কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি জুনিয়র্স পুরস্কার , অল ইন্ডিয়া ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার, শ্রী চিথিরা থিরুনাল জাতীয় পুরস্কার, এছাড়াও নানা সংস্থার থেকে জীবনকৃতি সম্মান এবং নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক উপাধিও পেয়েছেন। ২০১৩ সালে জাপান সরকার দ্বারা প্রদত্ত অর্ডার অফ দ্য রাইজিং  সান  গোল্ড এন্ড সিলভার স্টার পুরস্কারেও ভূষিত হন । এম এস অশোকান “কর্মযোগী-ই  শ্রীধরণতে জীবীথা কথা” নামে তাঁর একটি জীবনীও লেখেন। এছাড়াও রাজেন্দ্র  বি আক্লেকার ‘ইন্ডিয়াস  রেলওয়ে ম্যান’ (India’s Railway Man) নামে তাঁর জীবন নিয়ে আর একটি বইও লেখেন। ই শ্রীধরণ রাধা শ্রীধরণের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের চারটি সন্তান আছে।

এই প্রৌঢ়ত্বে এসেও তিনি সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

স্বরচিত রচনাপাঠ প্রতিযোগিতা - নববর্ষ ১৪২৮



সমস্ত রচনাপাঠ শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন