ইতিহাস

নিল আর্মস্ট্রং

নিল আল্ডেন আর্মস্ট্রং (Neil Alden Armstrong) একজন মহাকাশচারী যিনি একাধারে বিমান সংক্রান্ত বিষয়ের ইঞ্জিনিয়ার (Aeronautical Engineer), নৌ বিমানচালক (Naval Aviator), পরীক্ষামূলক বৈমানিক, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের মাটিতে পা রাখার জন্য। চাঁদের মাটিতে পা রাখার পর তাঁর করা উক্তিটি আজও বিখ্যাত হয়ে আছে- “একজন মানুষের জন্য এটি খুব ছোট পদক্ষেপ ঠিকই, কিন্তু মানব সভ্যতার জন্য এটি একটি সুবিশাল পদক্ষেপ।”

১৯৩০ সালের ৫ আগস্ট আমেরিকার ওহিও প্রদেশের ওয়াপাকোনেটাতে (Wapakoneta, Ohio) নিল আর্মস্ট্রংয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল স্টিফেন কোইং আর্মস্ট্রং (Stephen Koeing Armstrong) এবং মায়ের নাম ছিল ভাওয়েলা লুই নি এঙ্গেল (Viola Louise nee Engel)। নিল আর্মস্ট্রংয়ের বাবা ওহিও রাজ্য সরকারের নিরীক্ষক (Auditor) ছিলেন। ফলে তাঁর বাবার কাজের সূত্রেই তাঁদের সারা প্রদেশ জুড়ে ঘুরে বেরাতে হত। চোদ্দ বছরের মধ্যে তাঁরা ষোলোটি শহরে বাস করেছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই তাঁর বাবার সাথে একটি বিমান প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে নিল আর্মস্ট্রংয়ের বিমানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

তিনি ব্লুম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে (Blume High School) পড়াশোনা শেষ করে গ্রাসি ওয়াপাকোনেট এয়ারফিল্ড (Grassy Wapakonet Airfield) থেকে বিমানচালনার প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তিনি বয়েজ স্কাউটে অত্যন্ত সক্রিয় (Boys Scouts) ছিলেন এবং ঈগল স্কাউটেও (Eagle Scout) উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি বয়েজ স্কাউট অফ আমেরিকা দ্বারা (Boys Scouts of America) ডিস্টিঙ্গুইশড ঈগল স্কাউট অ্যাওয়ার্ড (Distinguished Eagle Scout Award) এবং সিলভার বাফেলো অ্যাওয়ার্ড (Silver Buffalo Award) সম্মানে ভূষিত হন।

প্রথমে তিনি ম্যসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে (Massachusetts Institute of Technology) ভর্তি হন। কিন্তু কিছুদিন পরেই পার্ড্যু বিশ্ববিদ্যালয়ে (Purdue University) বিমান সংক্রান্ত বিষয়ের ইঞ্জিনিয়ার (Aeronautic Engineer) হিসেবে পড়াশোনা শুরু করেন। এর ঠিক দুই বছর পরে বৃত্তির অঙ্গ হিসেবে ফ্লোরিডার (Florida) নাভাল এয়ার স্টেশন পেনানসাকোলাতে (Naval Air Station Penansacola) তাঁর ডাক পড়ে। এখানে তিনি মিডশিপম্যান (Midshipman) হিসাবে কাজে যোগ দেন। এরপর গ্রুমান এফ৮এফ বেয়ারক্যাটের (Grumman F8F Bearcat) ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাঁকে টেক্সাসে (Texas) নাভাল এয়ার স্টেশন কর্পাস ক্রিস্টিতে (Naval Air Station Corpus Christi) পাঠানো হয়। ১৯৫০ সালের ১৬ আগস্ট তিনি একজন নৌ বিমান চালক হিসেবে সম্পূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হন।

পার্ড্যু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পরে নিল আর্মস্ট্রং একজন পরীক্ষামূলক বিমানচালক হয়ে ওঠেন। তিনি ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ফর এরোনটিক্সে (National Advisory Committee for Aeronautics, NACA) আবেদন করেন কিন্তু সেখানে কোনো পদ ফাঁকা না থাকায় তাঁর আবেদনটি ক্লিভল্যান্ডে (Cleveland) লুইস ফ্লাইট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে (Lewis Flight Propulsion Laboratory) পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এখানেই তিনি তাঁর জীবনের প্রথম পরীক্ষামূলক বিমানচালনা করেন।

নিল আর্মস্ট্রং সেঞ্চুরি সিরিজ ফাইটার্সে (Century Series Fighters) প্রকল্প বৈমানিক(Project Pilot) হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। তাঁর পরীক্ষামূলক বিমান চালকের কর্মজীবনে তিনি দুশোর বেশি ধরণের বিমানচালনা করেছেন, যা তাঁকে প্রভূত অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে তিনি ন্যাশনাল এরোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (Natioanl Aeronautics and Space Administration, NASA) কর্মী নিযুক্ত হন।

নাসার কর্মী হিসেবে প্রথম যে বড় কাজটির সঙ্গে নিল আর্মস্ট্রং সরাসরি যুক্ত ছিলেন, সেটি হলো জেমিনি ৫ (Jemini 5)। ১৯৬৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নিল আর্মস্ট্রং এবং এলিয়ট সী (Eliot See) জেমিনি ৫ অভিযানের সাহায্যকারী কর্মী হিসেবে নির্বাচিত হন, যার মুখ্য কর্মী ছিলেন জর্ডন কুপার (Gordon Cooper) এবং পেট কনর‍্যাড (Pete Conrad)। এরপর একে একে জেমিনি ৮, জেমিনি ৯, প্রকল্পে নিল আর্মস্ট্রং নাসার হয়ে কাজ করতে থাকেন। জেমিনি ১১ তে তাঁকে সহকারী কম্যান্ড বৈমানিকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হয় নাসার অ্যাপোলো প্রকল্প (Apollo Program/ Project Apollo) যার মূল উদ্দেশ্য ছিল চাঁদের মাটিতে মানুষের পদার্পণ। নিল আর্মস্ট্রং এই প্রকল্পের নবম অধ্যায় থেকে যুক্ত হন। অ্যাপোলো ৮ (Apollo 8) প্রকল্পে তিনি সহকারী কর্মী হিসেবে কাজ করার পরে অ্যাপোলো ১১ প্রকল্পে (Apollo 11) তাঁকে কম্যান্ডার বৈমানিকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এরপর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক দিন। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই কেনেডি স্পেস সেন্টারের (Kennedy Space Center) লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯ সাইট (Launch Complex 39 Site) থেকে একটি স্যাটার্ন ভি (Saturn V) রকেটের মাধ্যমে ‘অ্যাপোলো ১১’ নিল আর্মস্ট্রং, এডুইন ইউজিন অলড্রিন, (Edwin Eugene Aldrin) ও মাইকেল কোলিন্সকে নিয়ে (Michael Collins) চাঁদের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং মহাকাশচর্চার ইতিহাসে এই ঘটনা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকে, কারণ নিল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন অলড্রি্নের আগে আর কোনো মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখেননি।  

৭৬ ঘন্টায় ২ লক্ষ ৪০ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে ১৯ জুলাই, অ্যাপোলো ১১ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। তাঁর পরের দিন দুপুর ১ টা বেজে ৪৬ মিনিটে লুনার মডিউল (Lunar Module), ‘ঈগল’, অর্থাৎ যে অংশটি চাঁদের মাটিতে প্রবেশ করবে, সেটি কম্যান্ড মডিউল (Command Module) থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই কম্যান্ড মডিউলে রয়ে গিয়েছিলেন মাইকেল কোলিন্স। দুই ঘন্টা পরে ঈগল চাঁদের মাটিতে অবতীর্ণ হতে শুরু করে। বিকেল ৪ টে ১৮ মিনিট নাগাদ নিল আর্মস্ট্রং এবং এডুইন অলড্রিনের বিমান চাঁদের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ স্পর্শ করে। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ ঘন্টা পরে রাত ১০ টা বেজে ৩৯ মিনিতে ঈগলের দরজা খুলে নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে পা রাখেন এবং ইতিহাস রচিত হয়। ২২ জুলাই রাত ১২ টা ৫৬ মিনিটে অ্যাপোলো ১১ পৃথিবীতে প্রবেশ করে।

এই ঐতিহাসিক ঘটনার পর থেকেই তিনি ক্রমশ অধ্যাপনার দিকে এগিয়ে যান। ১৯৭১ সালে তিনি নাসা থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত ওহিওর সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (Cincinnati University) এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং (Aerospace Engineering) বিভাগে অধ্যাপনা করতেন।

১৯৫৬ সালে তিনি জ্যানেট শিরনকে (Janet Shearon) বিয়ে করেন। কিন্তু, ১৯৯৪ সালে তাঁকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন ক্যারল হেল্ড নাইটকে (Carol Held Knight)।   

কীর্তিমান নিল আর্মস্ট্রং একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সম্মান হল, প্রেসিডেন্ট মেডাল অফ ফ্রিডম (Presidential Medal of Freedom), কালাম জিওগ্রাফিক মেডাল (Cullum Geographical Medal), ১৯৬৯ সালে ন্যাশনাল এরোনটিক অ্যাসোসিয়েশন (National Aeronautic Association) থেকে কলিয়ার ট্রফি (Collier Trophy), নাসা ডিস্টিঙ্গুইশড সার্ভিস মেডাল ((NASA Distinguished Service Medal), ডাঃ রবার্ট এইচ. গোডার্ড মেমোরিয়াল ট্রফি (Dr. Robert H. Goddard Memorial Trophy), ইউনাইটেড স্টেটস মিলিটারি অ্যাকাডেমির (United States Military Academy) তরফ থেকে সিলভানাস থায়ের অ্যাওয়ার্ড (Sylvanus Thayer Award),  ১৯৭৮ সালে কংগ্রেশনাল স্পেস মেডাল অফ অনর (Congressional Space Medal of Honor), ২০০১ সালে রিট ব্রাদার্স মেমোরিয়াল ট্রফি ((Wright Brothers Memorial Trophy), ২০১১ সালে কংগ্রেশনাল  গোল্ড মেডাল (Congressional Gold Medal) ইত্যাদি।

নিল আর্মস্ট্রং দীর্ঘদিন ধরেই হৃদপিন্ডের সমস্যায় ভুগতেন। করোনারি আর্টারি ডিজিজের (Coronary Artery Disease) জন্য তাঁর বাইপাস সার্জারিও হয়। ২০১২ সালের ২৫ আগস্ট ওহিওর সিনসিনাটিতে তাঁর মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।