ইতিহাস

কে আর নারায়ণন

কে আর নারায়ণন (K. R. Narayanan) একজন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ। তিনি ভারতের দশম রাষ্ট্রপতি এবং নবম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন। এছাড়াও তিনি একজন কূটনীতিক ছিলেন।

১৯২০ সালের ২৭ অক্টোবর কেরালার ত্রাভাঙ্কোরের পেরুমথানামে একটি গরিব পরিবারে কে আর নারায়ণের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল কোচেরিল রমণ নারায়ণন। তাঁর বাবার নাম ছিল কোচেরিল রমণ ভইদ্যার এবং তাঁর মায়ের নাম পুন্নাথথুরাভেট্টিল পাপ্পিয়াম্মা। তিনি তাঁর মা বাবার চতুর্থ সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা আয়ুর্বেদ শাস্ত্র চর্চা করতেন। নারায়ণনের আসল জন্ম তারিখ ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯২১। কিন্তু তাঁর স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় তার জন্মদিন বদলে ২৭অক্টোবর, ১৯২০ করে দেওয়া হয়। তারপর থেকে সেই দিনটিকেই তাঁর জন্মদিন হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় উঝাভুরের গভঃমেন্ট লোয়ার প্রাইমারি স্কুলে (Government Lower Primary School)। এরপর তিনি আওয়ার লেডি অফ লর্ডস আপার প্রাইমারি স্কুলে (Our Lady of Lord’s Upper Primary School) ভর্তি হন। সেখানে তিনি ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল অব্দি পড়াশোনা করেন।

ছোটবেলা থেকেই তাঁকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয়েছে। অনেক সময় তাঁর স্কুলের মাইনে বাকি থেকে যেত আবার কখনো বই কেনার টাকা থাকতো না। তিনি প্রতিদিন ১৫ কিলোমিটার দূরে তাঁর স্কুলে হেঁটে যেতেন। এরপর তিনি সেন্ট জনস হাইস্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৩৭ সালে সেন্ট মেরিজ হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। কোথায়ামের সি এম এস কলেজ থেকে তিনি ১৯৪০ সালে বৃত্তি নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট করেন। এরপর তিনি ত্রাভাঙ্কোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বি এ এবং এমএ করেন। তিনিই সেই সময় ত্রাভাঙ্কোরের প্রথম দলিত যিনি ফার্স্ট ক্লাস ফাস্ট হন। এরপর তিনি চাকরির সন্ধানে দিল্লি চলে যান এবং সেখানে বেশ কিছুদিন সাংবাদিক হিসেবে দ্য হিন্দু  এবং দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া সংবাদপত্রে কাজ করেন। সাংবাদিকতা করার সময় তিনি একবার মহাত্মা গান্ধীর সাক্ষাৎকার নেন।

এরপর তিনি জে আর ডি টাটার কাছ থেকে বৃত্তি নিয়ে লন্ডনে পড়াশোনা করতে যান। সেখানে তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে পড়াশোনা করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে অর্থনীতিতে ব্যাচেলর অব সায়েন্স অনার প্রদান করে। এরপর তিনি হ্যারল্ড লাস্কির কাছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সম্বন্ধে শিক্ষা গ্রহণ করেন। লন্ডনে থাকাকালীন তিনি সেখানকার ইন্ডিয়ান লীগের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার উইকলি নামক একটি পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।

১৯৪৯ সালে তিনি ভারতীয় বিদেশমন্ত্রকের (Indian Foreign Service, IFS) সাথে যুক্ত হন। সেই বছরেই তিনি অ্যাটাচি হিসেবে এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ারস মন্ত্রকে (Ministry of External Affairs, MEA) যোগদান করেন। তিনি কূটনীতিক হিসেবে রেঙ্গুন, টোকিও, লন্ডন, ক্যানবেরা ও হানোই দূতাবাসে কাজ করেন। এর পাশাপাশি তিনি দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সে  বেশ কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। তিনি ১৯৭৮ সালে বিদেশ মন্ত্রকের চাকরি থেকে অবসর নেন। এরপর তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮০ সাল অব্দি জওয়াহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য হিসেবে কাজ করেন।

রেঙ্গুনে কাজ করার সময় তাঁর সাথে দেখা হয় মা তিন্ট তিন্টের সাথে। ১৯৫১ সালের ৮ই জুন দিল্লিতে তাঁদের বিবাহ হয়। এরপর তিনি ভারতীয়ত্ব গ্রহণ করে ঊষা নারায়াণন নাম গ্রহণ করেন। ঊষা ভারতে নারী এবং শিশু কল্যাণ এর জন্য অনেক কাজ করেন। এছাড়াও তিনি অনেক বার্মিজ সাহিত্য ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। তাঁদের দুটি মেয়ে আছে। তাদের নাম চিত্রা নারায়ণন এবং অমৃতা নারায়ণন। 

কে আর নারায়ণন ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। এরপর তিনি কংগ্রেসের হয়ে কেরালার পালাকাড থেকে ১৯৮৪ সালে, ১৯৮৯ সালে এবং ১৯৯১ সালে, তিনবার লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি রাজীব গান্ধীর তত্ত্বাবধানে রাজ্যের মন্ত্রী সভায় মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালের ২১শে আগস্ট তাঁকে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। সেই সময় হওয়া বাবরি মসজিদ ধ্বংসকে তিনি তীব্র ভাষায় নিন্দা করেন এবং গান্ধী হত্যার সাথে তার তুলনা করেন।

১৯৯৭ সালের ১৭ই জুলাই ইলেক্টোরাল কলেজ (Electoral college) থেকে ৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ভারত তাঁর স্বাধীনতার স্বর্ণ জয়ন্তী পালন করে। তিনি সেই উপলক্ষে স্বাধীনতা দিবসের মাঝরাত্তিরে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে সাধারণ মানুষের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন। ভারতীয় রাজনীতিতে সেটি ছিল একটি বিরল ঘটনা। সাধারণত একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাধারণ নির্বাচনে ভোট প্রদান করার নিয়ম ছিল না। কিন্তু তিনি সেই নিয়ম বদল করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীনই ২০০০ সালের ২৬শে জানুয়ারি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের স্বর্ণ জয়ন্তী পালিত হয়। সেই সময় তিনি ভারতের বেশ কিছু অক্ষমতা নিয়ে আলোচনা করেন এবং তার সম্ভাব্য সুরাহা নিয়েও আলোচনা করেন। এটিও ছিল একটি বিরল ঘটনা। এর আগে কোন রাষ্ট্রপতি এই ধরনের আলোচনা জনসমক্ষে করেননি। ১৯৯৮ সালে তিনি অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। তার তত্ত্বাবধানে ১৯৯৯ সালে বিহারে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়।

তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন কারগিলের যুদ্ধ শুরু হয়। যেহেতু তার কিছুদিন আগে অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার অনাস্থা ভোটে হেরে যায় এবং বিরোধী দল সরকার গড়তে ব্যর্থ হয় সেহেতু ভারতীয় রাজনীতিতে সেই সময় এটি একটি টালমাটাল সময় ছিল। তিনি সেই সময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন কোন ধর্মীয় স্থানে যাননি, সেটিও ছিল একটি বিরল ঘটনা। সেই সময় হওয়া গুজরাট দাঙ্গার তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন। বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁকে দ্বিতীয়বারের জন্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার অনুরোধ করলেও তিনি এরপরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। এরপরে এ পি জে আবদুল কালাম রাষ্ট্রপতি হন।

রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেওয়ার পরে কে আর নারায়ণন এবং তাঁর স্ত্রী দিল্লিতে বসবাস করতে থাকেন। ২০০৫ সালে উঝাভুরে তিনি নবজ্যোতিশ্রী করুণাকর্ণ গুরু গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০০৫ সালের ৯ নভেম্বরে কে আর নারায়ণনের মৃত্যু হয়। ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আগামী প্রজন্ম তাঁকে একজন দক্ষ রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনে রাখবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন