সববাংলায়

ফিদেল কাস্ত্রো

বিভাগঃ ,

ফিদেল কাস্ত্রো (Fidel Castro) একজন কিউবান রাজনৈতিক নেতা ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী যিনি কিউবা বিপ্লবের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত কিউবার প্রধানমন্ত্রী এবং ১৯৭৬ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কিউবার  রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৬১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন।

ফিদেল কাস্ত্রোর পুরো নাম ফিদেল আলেসান্দ্রো কাস্ত্রো রুজ। তবে মানুষের কাছে তিনি ফিদেল কাস্ত্রো বা শুধুই কাস্ত্রো নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট, কিউবার (Cuba) বিরান অঞ্চলে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম এঞ্জেল কাস্ত্রো ওয়াই আরজিজ‌। তিনি পেশায় ছিলেন একজন সম্পন্ন আঁখ চাষী। ফিদেল কাস্ত্রোর মায়ের নাম লীনা রুজ গঞ্জালেজ (Lina Ruz González)। কাস্ত্রো ছিলেন তাঁদের সাত সন্তানের মধ্যে একজন।

সান্টিয়াগোর (Santiago) লা স্যালে বোর্ডিং স্কুলে (La Salle boarding school) তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়। ১৯৪৫ সালে কাস্ত্রো হাভানার এল কলিজিও ডি ব্যালেন স্কুল থেকে পাশ করার পর হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়া শুরু করেন যদিও স্কুল জীবনে তাঁর ইতিহাস এবং ভূগোলে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। তবে পড়াশোনার থেকে খেলাধুলার প্রতি তাঁর আগ্রহ বেশি ছিল। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।

কাস্ত্রো কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এবং লেনিনের মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন। ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আইনে স্নাতক হন। ক্রমে তিনি কিউবার রাজনীতিতে একজন বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় রাষ্ট্রপতি ফালজেন্সিও বাতিস্তা এবং কিউবার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সমালোচনামূলক নিবন্ধ লিখে।  রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের অভিযোগে কাস্ত্রোকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিচারে তাঁর কারাদণ্ড হয়। পরে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মেক্সিকোয় যান। ১৯৫৬ সালে গেরিলা বাহিনীর সঙ্গীদের নিয়ে ‘গামা’ নামক এক ইয়টে  পাড়ি দেন কিউবার উদ্দেশে। এই সময় ভাই রাউল কাস্ত্রোর সূত্রে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় চে গুয়েভারার। ফিদেল কাস্ত্রো‌ ও চে গুয়েভারার নেতৃত্বে  কিউবায় শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধের নতুন পর্ব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন চে। কিউবার তৎকালীন একনায়ক বাতিস্তাকে (Batista) ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে তিনি আন্দোলনে ব্রতী হন। দুই বছর ধরে চলা এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। গেরিলা যুদ্ধ চলাকালীন তিনি কাস্ত্রোকে বিভিন্ন কূটনীতি বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। চে এবং কাস্ত্রো মিলে এই সময় গ্রেনেড তৈরির কারখানা, রুটি বানানোর চুল্লি প্রস্তুত এবং নিরক্ষরদের লেখাপড়ার জন্য পাঠশালা তৈরি করেছিলেন। এছাড়া একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মশালারও আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। সেই সময় কাস্ত্রো তাঁর সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য চে’র দ্বারা এতই প্রভাবিত ছিলেন যে চে’কে ‘কাস্ত্রোর মস্তিষ্ক’ বলে অভিহিত করা হত সেই সময়।

গেরিলা যুদ্ধের জন্য কাস্ত্রো ও তাঁর সঙ্গীরা জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করতে থাকে। তাঁদের খোঁজে কিউবার বাতিস্তা সরকার জঙ্গলে বিমানহানা চালাতে থাকে। ক্রমে কাস্ত্রোর ৪১ জন সহযোদ্ধার মধ্যে বেঁচে থাকেন মাত্র ১৯ জন। এই ১৯ জনই রাতের অন্ধকারে সেনাছাউনিতে হামলা চালিয়ে, অস্ত্র লুঠ করে, আক্রমণ করে ভূস্বামীদের। সেনাছাউনিতে হামলার পরই‌ স্থানীয় মানুষও গেরিলাদের সমর্থক হয়ে ওঠেন। ফলে গেরিলাদের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়। অন্য বিপ্লবী দলগুলির সঙ্গেও সংযোগ গড়ে তুললেন কাস্ত্রো। গেরিলারাই তখন কিউবার বিশাল এলাকার হাসপাতাল, স্কুল, চিনির কারখানা নিয়ন্ত্রণ করে। ফিদেল এক দিকে গেরিলা সেনাধ্যক্ষ, অন্য দিকে হাসপাতাল, কারখানার নেতা।

ফিদেলের চিন্তা ও কাজের কেন্দ্রে ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব। কিউবায় একনায়কতন্ত্রের প্রতিভূ বাতিস্তার বিরুদ্ধে কিউবার সার্বভৌমত্ব অর্জনের সংগ্রামের জন্যই তিনি সমাজতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিলেন। বাতিস্তা ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল। ১৯৫৯ সালে কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবার বিপ্লব সেই সরকারকে উৎখাত করে। বাতিস্তার লোকজন মায়ামিতে পালিয়ে গিয়ে প্রধান বিরোধী ঘাঁটি তৈরি করে।

বিপ্লবের আগে কিউবার রাজনীতি ও সরকারি নীতি ছিল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে। জমির মালিক ছিল ভূস্বামীরা ও মার্কিন কোম্পানিগুলি। নানা পণ্য হয় আমেরিকা থেকে আমদানি হত অথবা কিউবায় আমেরিকান কোম্পানি তৈরি করত। দারিদ্রের মাত্রা ছিল অস্বাভাবিক বেশি, নিরক্ষরতা ও অস্বাস্থ্য ছিল বৃহৎ সমস্যা। জাতি-বৈষম্য, বিশেষ করে আফ্রিকা থেকে আসা ক্রীতদাসদের বংশধরদের নিপীড়ন একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। বাতিস্তার রাজত্বে প্রতিবাদ ছিল নিষিদ্ধ, যে কোনও বিরোধিতা কঠোর ভাবে দমন করা হত।

কাস্ত্রো কিউবান বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এবং বাতিস্তার স্বৈরশাসনকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এর কিছুদিন পরে কাস্ত্রো কিউবার প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হন এবং কিউবাকে একদলীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি কিউবার সর্বোচ্চ সামরিক পদ Comandante en Jefe (“Commander in Chief”) পদে আসীন হন।

বাতিস্তাকে সরিয়ে ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারকে আমেরিকা স্বীকৃতি দিয়েছিল। কাস্ত্রো দেশে ফিরে  ব্যবসা ও কৃষিক্ষেত্রের জাতীয়করণ শুরু করলেন এরপর। ফলে কিউবায় মার্কিন বিনিয়োগে বড়সড় আঘাত লাগল। শুরু হল মার্কিন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। মার্কিন সরকারও একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে যেতে লাগল। কিউবার প্রধান উৎপাদন চিনি কেনা বন্ধ করে আমেরিকা। কিউবার তেল বিক্রিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমেরিকার এই সিদ্ধান্তে জ্বালানী সঙ্কটে পড়ে যায় কিউবা। আমেরিকার এই অসহযোগিতা কিউবাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ধরতে বাধ্য করে।

১৯৬১ সালে দু’দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু তার আগে, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ারের আমলেই সেন্ট্রাল ইন্টালিজেন্স এজেন্সিকে (সিআইএ) নির্দেশ দেওয়া হয় কাস্ত্রোকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার জন্য। কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করার জন্য কাস্ত্রো-সহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করতে পরিকল্পনা চলতেই থাকে। এর ছদ্মনাম ছিল ‘অপারেশন মঙ্গুজ’। তবে প্রতিটা ক্ষেত্রেই পরিকল্পনাগুলি ব্যর্থ হয়েছিল।

সত্তরের দশক জুড়ে আমেরিকা ও কিউবার বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। কখনও সম্পর্কের সামান্য উন্নতি হয়েছে তো কখনও অবনতি। নানান নিষেধাজ্ঞার ফলে কিউবার অর্থনীতিতে একের পর এক আঘাত এসেছে। কিন্তু সোভিয়েত রাশিয়া সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতও  বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিউবার পাশে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু কিউবার জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছিল। ১৯৮০ সালে এপ্রিল মাসে জনগনের একাংশ হাভানায় পেরুর দূতাবাসে গিয়ে ভিড় করেন আশ্রয়ের জন্য। কাস্ত্রো জানান, যাঁরা চাইছেন কিউবা ছেড়ে চলে যেতে পারেন। সেই বছরে প্রায় এক লক্ষ ২৫ হাজার কিউবার বাসিন্দা আমেরিকা চলে আসেন। প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের সরকার নিষেধাজ্ঞা আরও তীব্র করে। শুধু কিউবায় প্রচার চালানোর জন্য আলাদা রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল খোলা হয়। কিন্তু কাস্ত্রোকে সরানো সম্ভব হয়নি।

ব্যক্তিগত জীবনে ফিদেল কাস্ত্রো ১৯৪৮ সালে মিরতা দিয়াজ বালার্ট-কে বিবাহ করেন। তাঁদের একটি পুত্র সন্তান হয়। ১৯৫৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায়। ফিদেল কাস্ত্রোর জীবনের দ্বিতীয় নারী ছিলেন ডালিয়া সোটো ডেল ভ্যালি। এই সম্পর্কের ফলে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। তাছাড়া বিভিন্ন নারীসঙ্গের কারণে তাঁর আরও সন্তান জন্মায়। তাঁর মোট ১১ জন সন্তান ছিল।

১৯৯১ সালে সোভিয়েতের পতনের পরে প্রায় একা হয়ে পড়ে কিউবা। কিউবার অর্থনীতি চরম দুর্যোগের সামনে পড়ে। কাস্ত্রো বহু কষ্টে তা সামলানোর চেষ্টা করেছেন। আমেরিকার রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতিরা কিউবার উপরে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন আর অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট রাষ্ট্রপতিরা সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের সময়ে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হয়। বিশেষ করে দু’দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা হয়। তবে কিউবা নীতির বড়সড় পরিবর্তন আনেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা‌ (Barack Obama)।

২০০৮ সালে ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে দায়িত্ব থেকে সরে যান ফিদেল কাস্ত্রো। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ভাই রাউল কাস্ত্রো (Raul Castro)। দীর্ঘ গোপন আলোচনার পরে কিউবা ও আমেরিকা আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ভ্যাটিকানে পোপ ফ্রান্সিস অনুঘটকের কাজ করেন এক্ষেত্রে। কিউবাকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে সরিয়ে দেয় আমেরিকা।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত কিউবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাস্ত্রো। এরপর ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি স্বেচ্ছায় সরে যান। স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত তিনি কিউবার মন্ত্রী পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিদেল কাস্ত্রো পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাঁর যে শান্তিপূর্ণ ভূমিকা, তার জন্য চিনের ‘কনফুসিয়াস শান্তি পুরস্কারে’ (Confucius Peace Prize) ভূষিত হন।

২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর হাভানায় এই বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading