সববাংলায়

কৃষ্ণগহ্বর ।। ব্ল্যাক হোল

বিভাগঃ ,

বিপুল বিস্তৃত মহাবিশ্বে শূন্যতা (Space) আর সময়ের (Time) নানাবিধ খেলা চলে। অসীম এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি কীভাবে হল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বহু বহু কাল থেকেই গবেষণা চলছে। পদার্থবিদ অমল কুমার রায়চৌধুরী, রজার পেনরোজ কিংবা বিখ্যাত স্টিফেন হকিং প্রত্যেকেই এই ব্ল্যাক হোলের ধারণা দিয়ে বলতে চেয়েছেন আসলে বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে একটা ‘সিঙ্গুলারিটি’ থেকে আর এই সিঙ্গুলারিটির সঙ্গে ব্ল্যাক হোলের (Black Hole) ধারণাটা খানিকটা জড়িয়ে আছে। গাণিতিক পদার্থবিদদের মধ্যে এই ব্ল্যাক হোল হোল নিয়ে প্রচুর চর্চা চলে কারণ মহাবিশ্বের মধ্যে এ এক এমন অস্তিত্ব যার মধ্যে কোন পদার্থবিদ্যার নিয়ম কাজ করে না। আলো একবার এখানে প্রবেশ করলে নাকি আর বেরোতেই পারে না। বিপুল পরিমাণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে এই ব্ল্যাক হোল আশেপাশের সমস্ত বস্তুকে নিজের দিকে টেনে নেয়। সম্ভবত আলোর কণাও এখানে নিস্তার পায় না বলেই এর নাম কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল –  এক গভীর অতলান্ত অন্ধকার, সময় আর শূন্যতা সবই সেখানে গুলিয়ে যায়। বহু দশকের গবেষণার পরে বিজ্ঞানীরা এই কৃষ্ণগহ্বরের একটি স্পষ্ট ধারণা নির্মাণ করেছেন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কয়েকটি কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তুলতেও সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে। সেই সব আবিষ্কারের গল্প, কৃষ্ণগহ্বরের গঠনপ্রকৃতি নিয়ে আরো অনেক কথা জেনে নিই চলুন।

মহাকাশের এমন এক স্থান এই কৃষ্ণগহ্বর যেখানে অত্যধিক শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কারণে কোনো কিছুই এর মধ্য থেকে বেরোতে পারে না। কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে পদার্থের (Matter) ঘনত্ব অত্যধিক বেশি হয় যার ফলে এর চারদিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি থাকে। যেহেতু এর মধ্যে থেকে কোনো আলোক রশ্মি বা আলোর কণা কিছুই বেরোতে না পারে না, তাই খালি চোখে এই কৃষ্ণগহ্বর সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়। একটি ছোট্ট শূন্যস্থানে অধিক পদার্থ (Matter) সংকুচিত হয়ে জমা থাকে এখানে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন সাধারণত কোনো নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটলে সেখান থেকে এই কৃষ্ণগহ্বর সৃষ্টি হতে পারে। মানুষের চোখে অদৃশ্য হলেও বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে এই কৃষ্ণগহ্বর দেখা যায়। ব্ল্যাক হোলের পাশ দিয়ে নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ বা মহাকাশযান যাই যাক না কেন, তা গিলে খেয়ে নেয় এই ব্ল্যাক হোল। বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে তাত্ত্বিকভাবে এই ব্ল্যাক হোল তার আশেপাশে সব বস্তুকে আকর্ষণ করার সময় একইসঙ্গে অনুভূমিক সংকোচন (Horzinotal Compression) এবং উল্লম্ব প্রসারণ (Vertical Stretching) ঘটে থাকে। একে ‘স্প্যাগেটিফিকেশন’ (Spaghettification) বলা হয়।

১৭৮৩ সালে প্রথম জন মিশেল ডার্ক স্টার নামে একটি গবেষণাপত্রে ব্ল্যাক হোলের ধারণা দেন, কিন্তু তখনও একে ব্ল্যাক হোল বলে চিহ্নিত করা হয়নি। তিনিই প্রথম বলেন বিপুল পরিমাণ ভরযুক্ত কোনো বস্তুর কথা যার মধ্যে থেকে আলোও পালাতে পারে না। এর অনেক পরে ১৯১৬ সালে বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জাইল্ড প্রথম ব্ল্যাক হোলের আধুনিক ধারণা দেন। এর মাঝে আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের বর্ণনায় মাধ্যাকর্ষণ, শূন্যতা আর সময়ের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা করেছিলেন। শোয়ার্জাইল্ড এই ধারণা থেকেই ব্যাখ্যা দেন যে অসীম ক্ষুদ্র কোনো বিন্দুতে বিপুল ভরের সংকোচন ঘটলে তা স্পেস-টাইম বক্রকে (Space-time Curve) বাঁকিয়ে দেবে। এই বিন্দুর ব্যাসার্ধ কত হতে পারে তাও নির্ণয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু জন হুইলারই প্রথম ১৯৬৭ সালে এই ‘ব্ল্যাক হোল’ নামকরণ করেন।   

অনন্ত মহাকাশে মূলত চার ধরনের ব্ল্যাক হোল দেখা যায় –

  • নাক্ষত্রিক বা স্টেলার (Stellar)
  • মধ্যবর্তী বা ইন্টারমিডিয়েট (Intermediate)
  • দানবাকৃতি বা সুপারম্যাসিভ (Supermassive)
  • ক্ষুদ্রাকৃতি বা মিনিয়েচার (Miniature)

একটি ব্ল্যাকহোল কত বড়ো হতে পারে তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা সময় নানা ধারণা দিয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, ক্ষুদ্রাকৃতি ব্ল্যাক হোলগুলি একটি পরমাণুর সমান আকারের হয়ে থাকে কিন্তু তার ভর হয় বিশালাকার পর্বতের মতো। অন্যদিকে নাক্ষত্রিক বা স্টেলার ব্ল্যাক হোলের আকার তুলনায় অনেক বড়ো, কিন্তু তার ভর সূর্যের ভরের থেকেও ২০ কিংবা ৩০ গুণ বেশি হয়ে থাকে। আমাদের পৃথিবী যে আকাশগঙ্গা ছায়াপথে আছে সেখানে এরকম অনেকগুলি স্টেলার ব্ল্যাক হোল থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। সবথেকে বিশালাকায় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলগুলির ভর দশ লক্ষ সূর্যের সম্মিলিত ভরের সমান। আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কেন্দ্রেও এরকম একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে যার নাম ‘স্যাজিটারিয়াস এ’ (Sagitarius A)। এর ভর প্রায় ৪০ লক্ষ সূর্যের ভরের সমান এবং এর মধ্যে কয়েক লক্ষ পৃথিবী ঢুকে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হল এই ব্ল্যাক হোল তৈরি হয় কীভাবে? চলুন জেনে নিই।

মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অধিকাংশের মত হল, বিশালাকায় নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটলেই একটি ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয়। নক্ষত্র যখন নিজের কেন্দ্রে ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে, তখন প্রবল নিউক্লীয় বিভাজন বিক্রিয়ার ফলে হাইড্রোজেন পরমাণু থেকে হিলিয়াম পরমাণু তৈরি হয় এবং পাশাপাশি অত্যধিক শক্তি নির্গত হয়। যদি কখনও এই বিক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, শক্তি নির্গমন স্তব্ধ হয়ে যায় তাহলেই নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে। এই মৃত নক্ষত্রগুলির মধ্যে কোনো কোনোটি শ্বেত বামন নক্ষত্রে (White Dwarf Star) পরিণত হয়, আবার কোনোটি থেকে ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়। নক্ষত্রের মৃত্যু হলে তা শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হবে নাকি ব্ল্যাক হোলে রূপ নেবে তা নির্ভর করে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’র (Chandrasekhar Limit) উপর। এই সীমা অনুযায়ী একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভর সর্বাধিক সূর্যের ভরের ১.৪ গুণ হতে হবে, কিন্তু তার থেকেও ভর বেশি হলে সেটাই ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। বিশালাকায় নক্ষত্রগুলির মধ্যেকার অবশিষত যে পদার্থ তা মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে কেন্দ্রের দিকে ক্রমশ সংকুচিত হতে শুরু করে এবং সমস্ত ভর কেন্দ্রে সংকুচিত হতে থাকে। নক্ষত্রটি নিজের অন্তরের ও বহিঃপৃষ্ঠের চাপের মধ্যে সমতা আনতে গিয়ে প্রবল বিস্ফোরণের সাহায্যে ভিতরের বহুল পদার্থকে বাইরে বের করে দেয়। একে সুপারনোভা (Supernova) বলা হয়। একমাত্র তখনই নক্ষত্রের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় ব্ল্যাক হোল। সুপারনোভার ফলে মাধ্যাকর্ষণকে প্রতিহত করার মতো আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট থাকে না নক্ষত্রের মধ্যে। তাই সেই নক্ষত্রের কেন্দ্রটি নিজে থেকেই সংকুচিত হতে শুরু করে। অপরিমেয় ক্ষুদ্র বিন্দুর মধ্যে রকম একটি বৃহদাকার নক্ষত্রের ভর এসে সঞ্চিত হলে ব্ল্যাক হোল তৈরি হয়। আমাদের সূর্যের থেকেও কয়েক লক্ষ গুণ বেশি ভর সঞ্চিত থাকে এই কেন্দ্রে আর তার দরুণ মাধ্যাকর্ষণের টান বেড়ে যায় অত্যধিক হারে। ব্ল্যাক হোলের চারপাশে একটি সীমানা থাকে যে অঞ্চল থেকে কোনো কিছুই আর ফিরে যেতে পারে না, তাকে বলা হয় ‘ইভেন্ট অফ হরাইজন’ (Event of Horizon) বা ‘পয়েন্ট অফ নো এস্কেপ’ (Point of No Escape)।  

ব্ল্যাক হোলগুলি সমস্ত আলোকে গ্রাস করে নেয়, তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কেউই খালি চোখে সেগুলি দেখতে পান না। তবে কিছু কিছু নির্দেশকের সাহায্যে মহাকাশে ব্ল্যাক হোলের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। যেমন ব্ল্যাক হোলের তীব্র মাধ্যাকর্ষণ তার আশেপাশের সব বস্তুকেই আকর্ষণ করে। কখনো কখনো মহাজাগতিক পদার্থসমূহ এই ব্ল্যাক হোলের চারপাশে আবর্তন করে। একটি ব্ল্যাক হোল আর একটি নক্ষত্র যখন কাছাকাছি আসে তখন উচ্চ শক্তির আলো তৈরি হয় যা মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু স্পেস টেলিস্কোপ তা ধরতে পারে। ব্ল্যাক হোলে কিছুই দেখা যায় না, আলোর কণা ফোটনও এর শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন যে, এই ব্ল্যাক হোল থেকেও আলোক নির্গমণ হয়। এই আলো অবলোহিত রশ্মি (Infrared Ray) যাকে তিনি ‘হকিং রেডিয়েশন’ নাম দিয়েছিলেন। আগে ধারণা ছিল বিজ্ঞানীদের যে এই ব্ল্যাক হোল দেখা যায় না, কিন্তু ২০১৯ সালে প্রথম বি-নাসা তাদের শক্তিশালী স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে ‘এম-৮৭’ (M-87) নামের একটি ব্ল্যাক হোলের ছবি তুলতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি মহাকাশের থেকে গবেষ্ণাগারের মধ্যেই কৃত্রিম উপায়ে ব্ল্যাক হোল তৈরিও সম্ভব করে ফেলেছেন ইজরায়েলের কয়েকজন বিজ্ঞানী। এই গবেষণার মাধ্যমেই তাঁরা প্রমাণ করে দেখান যে হকিং-এর কথা ভুল ছিল না। এই ব্ল্যাক হোলের জন্ম যেমন আছে, মৃত্যুও আছে। তবে ব্ল্যাক হোলের ধ্বংস বা মৃত্যু নির্ভর করে তার কেন্দ্রের ভরের উপর। ভর যত বেশি হবে তার জীবনকালও তত বেশি বেড়ে যাবে।       


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading