সতীপীঠ জ্বালামুখী

সতীপীঠ জ্বালামুখী

সতীপীঠ জ্বালামুখী মন্দিরটি ভারতের হিমাচল প্রদেশ রাজ্যের কাংড়া উপত্যকায় অবস্থিত। এটি একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর জিহ্বা বা জিভ পতিত হয়েছে। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী অম্বিকা এবং ভৈরব হলেন উন্মত্ত। অনেকে আবার এই মন্দিরের দেবীকে সিদ্ধিদা বলেও অভিহিত করে থাকেন। জ্বালামুখী সতীপীঠে সর্বদা জ্বলন্ত সাতটি অগ্নিশিখাকে দেবী অম্বিকা রূপে পূজা করেন ভক্তরা। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই আগুন স্পর্শ করলেও হাত পোড়ে না। অলৌকিক ধর্মবিশ্বাসের বাতাবরণে মোড়া প্রতিটি সতীপীঠের মধ্যে জ্বালামুখী সতীপীঠ অন্যতম।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে মাতা সতী বাবার কাছে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের বাপের বাড়িতেই দেহত্যাগ করেছিলেন। মাতা সতীর দেহত্যাগের খবর মহাদেবের কাছে পৌঁছাতেই মহাদেব সেখানে উপস্থিত হন। সতীর মৃতদেহ দেখে ক্রোধে উন্মত্ত মহাদেব এই দেহ কাঁধে নিয়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করেন। মহাদেবের তান্ডব নৃত্যে পৃথিবী ধ্বংসের আশঙ্কায় শ্রীবিষ্ণু তার সুদর্শন চক্র দ্বারা মাতা সতীর দেহ একান্নটি খণ্ডে খণ্ডিত করেন। সেই দেহখণ্ডগুলিই যে যে স্থানে পড়েছিল সেখানে একটি করে সতীপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই রকম একটি পীঠ হলো জ্বালামুখী সতীপীঠ। বলা হয় সতীর জিহ্বা ভূপতিত হয়ে জন্ম হয়েছে এই জ্বালামুখী সতীপীঠের।

হিমাচল প্রদেশের কাংড়া উপত্যকা থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দক্ষিণে সমুদ্রতল থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতায় জ্বালামুখী সতীপীঠ অবস্থিত। দেবী এখানে ভক্তদের কাছে নানা নামে পরিচিত, যেমন সিদ্ধিদা, জ্বালাদেবী, লণ্ঠনওয়ালী মাঈ ইত্যাদি। পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী কাংড়ার রাজা ভূমিচাঁদ কাতোচ ছিলেন দেবী দুর্গার ভক্ত। তিনিই প্রথম স্বপ্নে আগুনের শিখা যুক্ত পবিত্র এই স্থানটির দর্শন পান ও মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করেন। তারপরে এই জায়গাটি খুঁজে বের করে এখানে মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। মন্দিরের সামনে একটি ছোটো নাটমন্দির আছে যেখানে নেপালের রাজার দেওয়া অসংখ্য ঘন্টা ঝোলানো রয়েছে। মন্দিরের উত্তর দিকের দেওয়ালে দেখা যায় দেবী অম্বিকার প্রতীকরূপী এক অনির্বাণ দিব্য অগ্নিশিখা যা নাকি কখনো নেভে না। এই মূল শিখা ছাড়াও আরো ছয়টি অগ্নিশিখা দেখা যায় মন্দিরের মধ্যেই। পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী মানুষ বিশ্বাস করেন এই সাতটি অগ্নিশিখা আসলে দেবীর সাতটি রূপ –কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী এবং বিশ্বরূপা।

সতীপীঠ জ্বালামুখী মন্দির নিয়ে ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে নানা কাহিনী। ইতিহাস অনুযায়ী সম্রাট আকবর নাকি একবার কোনো এক কুচক্রীর বুদ্ধিতে দেবীর মাহাত্ম্য প্রমাণ করার জন্য মন্দিরের নিকটস্থ ঝর্ণাধারার বাঁক মন্দিরের দিকে ঘুরিয়ে দেন যাতে ঐ অগ্নিশিখাগুলি নিভে যায়। কিন্তু তারপরেও জলের সংস্পর্শে সেই অগ্নিশিখা না নেভায় আকবর দেবীর মাহাত্ম্য বুঝতে পারেন। পরে দেবীর কাছে মানসিকভাবে আত্মনিবেদন করে দেবীর জন্য তামার উপর সোনার প্রলেপ দেওয়া ছাতা তৈরি করিয়ে দেন এবং তিনিই নাকি মন্দিরের চূড়াটি সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দেন। ১৮০৯ সালে মহারাজ রঞ্জিত সিংহ এই মন্দির পরিদর্শন করেন। তার ছেলে খরক সিং মন্দিরে একজোড়া ভাঁজ করা রূপার দরজা নির্মাণ করিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী ফিরোজ তুঘলক এই মন্দির ধ্বংস করতে উদ্যত হলে বহু মৌমাছি এসে তাঁকে ও তাঁর সৈন্যদেরকে আক্রমণ করেন এবং সেই আক্রমণের ফলে মন্দির ধ্বংস করা থেকে বিরত হন ফিরোজ তুঘলক।

জ্বালামুখীর মন্দিরটি সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় দু’হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত। পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত মন্দিরটি দক্ষিণদ্বারী। মন্দিরের চূড়া গম্বুজাকৃতি ও স্বর্ণমণ্ডিত। মন্দিরে দেবীর কোনো মূর্তি নেই। পাথরের ফাটল দিয়ে অগ্নিশিখা বেরোতে দেখা যায়। মনে করা হয় এখানেই দেবীর জিহ্বা পড়েছিল। মূর্তির বদলে এই অগ্নিশিখাগুলিকেই দেবীরূপে পূজা করা হয় এখানে। মূলত সাতটি অগ্নিশিখা দেখা গেলেও কোনো কোনো সময় নয়টি শিখাও লক্ষ্য করা যায়। নয়টি অগ্নিশিখার আলাদা আলাদা নামকরণ করা হয়েছে। যথা – মহাকালি, ঊনপূর্ণা, চন্ডী, হিংলাজ-মাতা, বিন্ধ্যবাসিনী, মহালক্ষ্মী, সরস্বতী, অম্বিকা, অঞ্জিদেবী। মতান্তরে অনেকের মতে, জ্বালামুখী মন্দিরের সাতটি মূল অগ্নিশিখা হল – কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধুম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী এবং বিশ্বরূপা।

শোনা যায় বহু প্রাচীনকাল আগে এই হিমালয় পর্বতে রাক্ষসদের বাস ছিল। তারা দেবতাদের উপর অত্যাচার চালাতো। দেবতারা শ্রীবিষ্ণুর তপস্যা করে রাক্ষসদের ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন। হিমালয়ে অবস্থিত এই অগ্নিকুন্ড থেকে মা আদ্যশক্তির সৃষ্টি হয়। এই নয়টি আগুনের শিখার মধ্যে একটিকে বিশেষভাবে পুজো করা হয়। পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত এই অগ্নিশিখাগুলি খুবই শক্তিশালী বলে বিশ্বাস করে হিন্দুরা। মন্দিরের মাঝে একটি কুণ্ড অবস্থিত, এই কুণ্ডের মাঝেই ভক্তরা পুজো ও হোম করে থাকে। তবে মন্দিরের উত্তর দিকের দেওয়ালে যে জ্যোতি শিখা দেখা যায় এটি আদি অগ্নিশিখা। এর দেওয়ালে গর্ত করে রূপার সিংহাসন বসানো হয়েছে। এই জায়গাটিকেই বলা হয় দেবীর প্রধান গদি। জ্বালাদেবীর পুষ্পাঞ্জলি এই সিংহাসনের সামনেই নিবেদন করা হয়। দেবীকে রাবড়ি, মিছরি, দুধ, প্যাড়া, ফল ইত্যাদি ভোগ হিসাবে নিবেদন করা হয়।

প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব উপস্থিত থাকে। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। জ্বালামুখী সতীপীঠে দেবী হলেন অম্বিকা তথা সিদ্ধিদা এবং ভৈরব হলেন উন্মত্ত।

নবরাত্রি ও শিবরাত্রির সময় মন্দিরে বেশ জাঁকজমকে সহ বিশেষ উৎসব পালিত হয় এবং ঐ উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসে।

আপনার মতামত জানান