ধর্ম

ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা

শান্তনু রাজা এবং গঙ্গার পুত্র হল দেবব্রত। গঙ্গা চলে যাওয়ার পর শান্তনু সত্যবতীকে বিয়ে করতে চান। দেবব্রত যাতে এ বিয়েতে বাধা না হতে পারে, তাই এক নিজে এক ভীষণরকম প্রতিজ্ঞা করেন। এর জন্য তিনি ভীষ্ম নামে পরিচিত। ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

গঙ্গা, তাঁর এবং শান্তনুর সন্তান দেবব্রতকে শান্তনুর হাতে তুলে চলে যাওয়ার পর রাজা শান্তনু ছেলেকে নিয়ে রাজত্ব করছিলেন ভালমতই। কিন্তু একদিন যমুনাতীরে এসে সুন্দর একটা গন্ধে তাঁর মন ভরে গেল। গন্ধের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পেলেন এক নারীকে, অপরূপ সুন্দর এক নারীকে। এই মেয়েটি  সত্যবতী।
রাজা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কে তুমি? কোথা থেকে এসেছ?”
“আমার বাবার নাম দাসরাজ। বাবার আদেশে আমি নৌকা চালাই।”
বারবার রাজা সুন্দরী সত্যবতীকে দেখতে থাক্লেন। তাকে দেখে তাকে বিয়ে করতে ইচ্ছে  হল রাজার। তিনি সত্যবতীকে সে কথাও জানালেন। সত্যবতী জানাল তাঁর বাবার যদি এ বিয়েতে মত থাকে, তাহলে তাঁর কোনও আপত্তি নেই। রাজা মনে মনে ভাবলেন এ আর এমন কি! কোন বাবা চাইবে না তাঁর মেয়ের সাথে রাজার বিয়ে হোক। সত্যবতীর বাবা ধীবর দাসরাজের সাথে রাজা শান্তনু দেখা করলেন। কিন্তু দাসরাজের কথায় হতাশ হলেন তিনি।

দাসরাজ বলল যদি শান্তনু ও সত্যবতীর সন্তান ভবিষ্যতে রাজা হয় তাহলেই সে কন্যাদান করবে। কিন্তু শান্তনুর পুত্র দেবব্রত যুবরাজ থাকায় রাজা একথা দিতে পারলেন না এবং ফিরে এলেন। দেবব্রত বুঝতে পারলেন বাবার কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সঠিকভাবে তাঁকে রাজা শান্তনু কিছুই বললেন না।  বারংবার জিজ্ঞেস করাতে শান্তনু তাঁকে বললেন, “তুমি আমার একমাত্র পুত্র। তুমি বীর, তুমি মহান। কিন্তু যদি তোমার কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমার কি হবে, এই রাজ্যের কি হবে? জ্ঞানী লোকেরা বলেন এক পুত্র থাকা এবং পুত্র না থাকা দুইই সমান।” যুবরাজ বুঝলেন, বাবা তাঁকে সঠিকভাবে দুঃখের কথা বলছেন না, কিন্তু বাবাকে দেখে কষ্ট হতে লাগল তাঁর। তিনি মন্ত্রীর কাছে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে বাবার। মন্ত্রীর থেকেই জানতে পারলেন সমস্ত কথা।

বাবার দুঃখের কথা জানতে পেরে দেবব্রত সোজা চলে এলেন দাসরাজের কাছে। তাঁর কাছে এসে বাবার জন্য সত্যবতীকে চাইলেন। দাসরাজ শান্তনুকে যে কথা বলেছিল, একই কথা বলল দেবব্রতকেও। সঙ্গে এও বলল যে তার আসল ভয় দেবব্রতকে নিয়ে। যুবরাজ দেবব্রত যদি শান্তনু আর সত্যবতীর ছেলেদের কোনও ক্ষতি করে! দেবব্রত কথা দিলেন, তাঁর বাবা শান্তনু আর সত্যবতীর যে ছেলে হবে, সেই রাজত্ব পাবে। কিন্তু দাসরাজ তাতেও রাজি হল না। সে বলল, “আপনার প্রতিজ্ঞা থেকে আপনি কখনও ব্যর্থ হবেন না। কিন্তু আপনার ছেলেপুলেরা?” তখন দেবব্রত বললেন, “আপনি আমার প্রতিজ্ঞা শুনুন। আমি রাজ্য আগেই ত্যাগ করেছি। এখন  প্রতিজ্ঞা করছি জীবনে বিয়েও করব না। ব্রহ্মচর্য পালন করব।” এই ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য তার নাম হল ভীষ্ম।

সত্যবতীকে রথে নিয়ে তিনি রাজ্যে ফিরে এলেন। বাবার ভালবাসার জন্য নিজে নিলেন ব্রহ্মচর্য জীবন আর বাবার জন্য আনলেন তাঁর পছন্দের পাত্রী। ভীষ্মের এই কাজে খুবই খুশি হলেন রাজা শান্তনু। তিনি ভীষ্মকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন, “তুমি যতদিন বাঁচতে চাও, মৃত্যু তোমার কাছেও আসতে পারবে না। তোমার অনুমতি ছাড়া মৃত্যু কিছু করতে পারবে না তোমায়।”

তথ্যসূত্র


  1. "মহাভারত সারানুবাদ", দেবালয় লাইব্রেরী(প্রকাশক সৌরভ দে, তৃতীয় প্রকাশ) - রাজশেখর বসু, আদিপর্ব (১৬। দেবব্রত-ভীষ্ম-- সত্যবতী) পৃষ্ঠাঃ ৩৭-৩৯
  2. "মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত", আনন্দ পাবলিশার্স, পঞ্চম মুদ্রণ - ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যায় ১০- ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা (আজ হতে এ বিশ্বের সমস্ত রমণী আমার জননী), পৃষ্ঠাঃ ৬০-৬২

 
1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের জন্ম | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অশোক ষষ্ঠী ব্রতকথা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন