অর্থ: যা চিরকালের জন্য হারিয়েছে,তার কথা ভেবে যে মানসিক দ্বন্দ্ব, যে অনুতাপ হাহাকার, তাকে যখন ভাষায় প্রকাশ করা যায়না,সেই অনুভূতিরই নাম Zal।
উৎস: পোলিশ শব্দ।প্রথম বলেন বিখ্যাত পোলিশ সুরকার ফ্রেডরিক চপিন।
মাঝে মাঝে আমাদের সবার জীবনে এমন একটা সময় আসে যখন রোজকার বাঁধাধরা জীবনটা ওলটপালট হয়ে যায় এক নিমেষে।এ এক এমন ঝঞ্ঝা যা তোলপাড় করে দেয় বুকের ভেতরটা।প্রচন্ড কষ্ট হয়, কখনো মনে হয় ঈশ্বর আমাকে মেরে ফেলছো না কেন!এত কষ্ট আর সহ্য করা যায়না।আবার কখনোবা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বদলে ভিতরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে প্রতিশোধ নেওয়ার আগুনটা।
বিখ্যাত পোলিশ সুরকার ফ্রেডরিক চপিন-এর বুকের ভেতর ঠিক একইরকম এক অবর্ণনীয় তোলপাড়ে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে তখন।নভেম্বর উত্থান চরমভাবে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছে পোল্যান্ডে। হাজারে হাজারে অভিজাত পোল্যান্ড ছেড়ে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিচ্ছে।চপিনও তাদের মধ্যে একজন।১৮৩১ এর সেপ্টেম্বরের এক সকালে চপিন সেই যে প্যারিস-এ এসে পৌঁছলেন আমৃত্যু সেখানেই থাকলেন।১৮৩৬ -এর এক পার্টিতে দেখা ফরাসি লেখিকা জর্জ স্যান্ড এর সাথে।আলাপ ক্রমে গভীরতর হতে লাগল।কিন্তু এ সম্পর্ক তাদের যে সামাজিক ও সাংসারিক প্রতিকূলতার মরুভূমিতে নামিয়ে দিল সেখান থেকে আর বেরোতে পারলেন না চপিন।এ দিকে শরীরও ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে শুরু করেছে ততদিনে।আধুনিক গবেষকদের মতে চপিন টেম্পোরাল লোব এপিলেপ্সিতে ভুগছিলেন।ভাগ্য যেন কোমর বেঁধে নেমেছে চপিনের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখার মানুষের কষ্ট সহ্য করবার সীমানাটা কোথায় শেষ হয়েছে।এই প্রবল প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করতে করতে চপিন যখন মারা গেলেন তখন ওনার বয়স সবে ঊনচল্লিশ।
Zal হল সেই মানসিক অবস্থা যার কোন উপযুক্ত অনুবাদযোগ্য ইংরেজী চপিন খুঁজে পাননি।এক সাক্ষাৎকারে চপিনকে জিজ্ঞেস করা হয় একবার তার রচিত সমস্ত সুরে যে এক অমোঘ আবেগ থাকে, তার উৎস কি।উত্তরে চপিন বলেন-এক এমন অনুভূতি তার সারা জীবন সঙ্গী থেকেছে,যা তার বুকের ভেতরকার যে পৃথিবী, সেই পৃথিবীর মাটির মত অবিচ্ছেদ্য।এ অনুভূতির কোন অনুবাদ করে উঠতে পারেননি তিনি।এ এমন এক অনুভূতি, এক এমন কোমল স্পন্দন যার মধ্যে ঠাসাঠাসি করে মিলে মিশে থাকে সমস্ত অপমান,সমস্ত জ্বালা, সমস্ত না দিতে পারা কথার উত্তর, সমস্ত চলে যাওয়া সময়ের প্রতি অনুতাপ।এই অনুভূতি যেন নিশ্চুপে, নীরবে হার মেনে নেওয়ার ঠিক আগের ধাপ।
চপিন এর তৈরী সমস্ত সুরে এই Zal এরই প্রবল উপস্থিতি।Zal আমাদেরও ইন্দ্রিয়ে ধীরে ধীরে ডানা মেলে, প্রতিটা হেরে যাওয়া, প্রতিটা হারিয়ে ফেলার ঠিক পরপরই।যা কিছু কাছের, যা কিছু নিজের, সব একটার পর একটা হারাতে হারাতে মন হঠাৎ হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।কিন্তু পরক্ষণেই কি এক অমোঘ কারণে আগুন তার উত্তাপ হারাতে থাকে।চপিন সারাজীবন পিয়ানোকে হাতিয়ার করতে চেয়েছেন এই সব না বলতে পারা অনুভূতির প্রকাশের জন্য।Zal তাই কখনো বাঙ্ময় হয়ে ওঠে পিয়ানোয়, তো কখনো ক্যানভাসে আবার কখনো শব্দের মধ্যে দিয়ে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান