সববাংলায়

রুবাইয়ের গল্প ।। বিয়ের পর

বিভাগঃ ,

বিয়ের পর

রুবাই শুভজিৎ ঘোষ


।।১।।

অনেকদিন পর পার্লারে এল তুলি। বিয়ের পর প্রায় আসাই হয়না। অফিসে কাজ, বাড়িতে কাজ, নিজের সময় বলতে তুলির সেরকম নেই। চাকরি আর সংসার করতে করতেই সব সময় পেরিয়ে যায় তার। আজকে তুলির ননদের বিবাহবার্ষিকী। এদিকে অফিসেও দরকারি কিছু কাজ আছে, তাই আজ কামাই করলে হত না। তাই অফিস করেই সেখানে যেতে হবে তাকে। ননদ তো এমনিই রেগে আছে। তার ওপর কদিন আগেই তুলিকে সে বলেছিল, “চলো না বউদি চুলটা স্ট্রেট করিয়ে আসি। কবে থেকে তোমায় বলছি।”
“হ্যারে ছোট! যাবো। কিন্তু সময় করে উঠতে পারছিনা।” তুলি বলেছিল।
“সে জানিনা। কিন্তু অ্যানিভারসারিতে যদি না স্ট্রেট করিয়ে এসেছ, দেখে নিয়ো!”
“আচ্ছা বাবা করাব।”
কিন্তু ঐ করাব করাব বলে ননদের বিবাহবার্ষিকীই চলে এল। তাই যাবার আগে না করালেই নয়। অনেক দিন বলছে। তাই সকালে অফিস আসবার আগেই পার্লারে এল সে। আজ আসবার সময় গাড়িটাও সঙ্গে এনেছিল। নাহলে অফিসের কাজ মিটিয়ে ননদের শ্বশুরবাড়িতে যেতে দেরী হয়ে যেতে পারে। তুলির বর প্রীতমও অফিস থেকে ওখানেই সরাসরি আসবে।

অফিসে এসে নিজের সিটে বসল তুলি। স্ট্রেট করা চুলগুলো বারবার কানের ওপর চলে আসছে তার। সিল্কের মত চুলগুলোর মধ্যে হাত দিয়ে কানের পাশ দিয়ে সরিয়ে দিল সে। কিন্তু নরম অবাধ্য চুলগুলো তার কথা শুনবে কেন! তুলি আবার চুলগুলোকে সরিয়ে দিল, আবার তারা ফিরে এল। আচমকা খেয়াল হল নীল তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
“বোসো!” সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বলল তুলি।
“চুল স্ট্রেট করিয়েছ তুলিদি?”
“হুম।” আচমকা এরম প্রশ্নে একটু গম্ভীরভাবেই জবাব দিল তুলি।
“দারুণ লাগছে” নীল হেসে বলল।
“তাই?”জিজ্ঞেস করল তুলি। মুখে একটু হাসি।
“হ্যাঁ। বেশ অন্যরকম।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।” তুলি আবারও গম্ভীর থাকার চেষ্টা করলেও মনে মনে ভালোই লাগল তার প্রশংসা শুনে।

বেশ কিছুদিন হল নীল তুলিদের অফিসে এসেছে। তুলিদের কোম্পানিরই অন্য শাখায় সে কাজ করে। একটা কাজের সূত্রে কলকাতায় এসেছে মাস ছয়েকের জন্য। তুলি এখন যে কাজটা করে সেটাই এই কয়েক মাস তার থেকে শিখবে নীল। এই একমাসে অনেকটা শিখেও নিয়েছে কাজগুলো। খুব তাড়াতাড়িই শিখছে বলা যায়। এরম ভাবে শিখলে ছয়মাসের অনেক আগেই সে ফিরে যেতে পারবে নিজের শহরে। তুলির থেকে বছর তিনেক ছোট সে। খুব বকবক করে সারাদিন। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় তুলি, মাঝে মাঝে আবার ভালোও লাগে। বিকাল হতেই আবার এল নীল, “তুলিদি স্ন্যাকস করতে যাবে?”
“এই তোমায় বলাই হয়নি।”
“কি?”
“আজ তো আমি তাড়াতাড়ি বেরোবো।”
“আচ্ছা। কোথাও যাবে নাকি?”
“হ্যাঁ! ননদের অ্যানিভার্সারি”
“ও আচ্ছা! চলো এনজয়!”
চলে যায় নীল। তুলি বেরিয়ে পড়ে অফিস থেকে। বেরনোর সময় ফোন করে প্রীতমকে, “বেরোলে?”
প্রীতম এখন একটা বড়সড় কাজের মাঝে। মনে হয় না তাড়াতাড়ি শেষ হবে। মোবাইল তুলে উত্তর দেয়, “এই শোনো না, আমার একটু সময় লাগবে গো!”
“মানে?” গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে একটু খেপেই জিজ্ঞেস করে তুলি, “আমি কি একা যাবো তাহলে?”
“আরে রাগ কোরো না। তুমি তো জানো!”
“হ্যাঁ জানি কত কাজ থাকে অফিসে। আমিও অফিস থেকেই বেরচ্ছি। বারবার এক জিনিস তোমার। ছোট জিজ্ঞেস করলে কি বলব ওর দাদা সারাদিন অফিসেই থাকে?”
“শোনো না তুলি, একটু ম্যানেজ করে নাও না প্লিজ। আমি তো আসছিই।”
“হ্যাঁ সে তো সব সময়েই আমাকেই ম্যানেজ করতে হয়।” ফোন কেটে দিল তুলি। প্রীতম সেই রাত করেই এল তার বোনের বিবাহবার্ষিকীতে।

যখন বাড়ি ফিরল দুজনে, তখনও তুলির রাগ কমেনি।
“তুমি রেগে আছো?”
“না” রেগে উত্তর দিল তুলি।
“রেগে আছো তুমি, আমি জানি।”
“তো কি করব। তুমি তো শুধু এলে আর খেলে!” কান থেকে  দুল গুলো খুলতে খুলতে বলল তুলি।
“আরে বোলোনা” প্রীতম বলতে শুরু করল, “আজ তো মিটিং-এর পর মিটিং। আর বেরিয়ে তো আজকে গাড়িটাও…” প্রীতমের কথা শেষ হওয়ার আগেই চেঁচিয়ে উঠল তুলি, “মানে কি বলতে চাও? আমি একদিন গাড়িটা নিয়ে গেছি বলে অসুবিধা?”
“না সেটা না। আসলে ওখানে অনেকটা দেরী হয়ে গেল তাই।”
“নিজের দোষগুলো আমার ওপর দিয়ো না।” চেঁচিয়ে উঠল তুলি, “আর যাবোই না তোমার গাড়ি নিয়ে।” টেবিল থেকে চাবিটা নিয়ে ছুঁড়ে দিল প্রীতমকে।
হাত দিয়ে উড়ন্ত চাবিটা মুখের ওপর আসা থেকে আটকাল প্রীতম। তারপর বিছানা থেকে উঠে এসে জড়িয়ে ধরল তুলিকে।
“ছাড়ো বলছি!” রাগের সাথে কোমরে জড়ানো প্রীতমের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল তুলি।
কিন্তু প্রীতম ছাড়ল না। তুলির নরম চুলগুলোর ছোঁয়ায় জিজ্ঞেস করল প্রীতম, “এই কি করেছো গো চুলে?”
তুলির রাগ এবার অভিমানে বদলে গেল। প্রীতমের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, “এতক্ষণে দেখতে পেলে তাহলে!”
আমতা আমতা করে প্রীতম বলল, “ও স্ট্রেট করিয়েছ না! হ্যাঁ তখনই দেখলাম। জানি তো”
“চুপ! আর বোলো না” চলে গেল তুলি। চোখে একটুখানি জল তার।

রাতে তুলি পাশ ফিরে শুল।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করল প্রীতম, যদিও সে জানে কি হয়েছে। তুলি কোনও উত্তর দিল না। প্রীতম তার পেটের কাছে জড়িয়ে ধরে বলল, “দ্যাখো তুলি, এই সাত বছরের বিবাহিত জীবনে ‘কেমন লাগছে’, ‘ভাল লাগছে’ এগুলো আর ম্যাটার করে না। তোমায় ছাড়া আমি আর কাকেই বা দেখি বলো!”
প্রীতমের দিকে ঘুরে শুল তুলি, “কাউকে দেখো না জানি। কিন্তু আমাকেও তো দ্যাখো না।”
“কে বলেছে দেখি না। কৈ দেখি কেমন লাগছে আমার বউকে?” বলে কাতুকুতু দিল প্রীতম।
“শুতে দাও।” তুলি কোনোরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে শুয়ে পড়ল। সে জানে প্রীতম তাকে ছাড়া অন্য কারও কথা ভাবেও না, কোনওদিন ভাবেওনি। কিন্তু সেই যে পুরনো দিনগুলো, কলেজের সময় তাদের একসাথে কাটানো সময়গুলো! সেই আবেগ কোথায়!

পরের দিন অফিসে মনমরা তুলিকে জিজ্ঞেস করল নীল, “কি হয়েছে তুলিদি?”
বিরক্ত হল তুলি। সবেতেই যেন প্রশ্ন এর। “কিছু না” রাগের সাথেই উত্তর দিল, “একটু ব্যস্ত আছি।” নীল চলে গেল। তুলির যেন খারাপ লাগল। কিন্তু হঠাৎ করে তো ডাকতেও কেমন লাগে। তুলি অপেক্ষা করতে থাকল বিকাল হবার। বিকাল হতেই নীলকে ডাকল সে, “চলো স্ন্যাকস করে আসি।”
এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল নীল। ওরা দুজনে অফিসের বাইরে এল।
“কি খাবে বলো?” জিজ্ঞেস করল তুলি।
“দুপুরবেলাই তো বকা খেলাম তোমার” হেসে উঠল নীল।
“সরি নীল!” তুলি লজ্জার সাথে বলে উঠল, “তখন খুব বাজে অবস্থা ছিল। খুব চাপে ছিলাম।”
“তুমি এত চাপ নাও কেন বলো তো?”, একটু থেমে দোকানদারকে উদ্দেশ্য করে নীল দুটো চা দিতে বলল।
“তুমি বুঝবে না”, একটু থেমে বলল তুলি, “বিয়েটা করো!”
“বিয়ের সাথে কি আছে? মানুষ আমি একই থাকবো নাকি”
“তোমার আর কি?” পুরনো অভিমান উঠে এল তুলির স্বরে, “সব জ্বালা তো মেয়েদের।”
“ও এই ব্যাপার।” হেসে উঠল নীল, “মানে দাদার সাথে ঝামেলা হয়েছে।”
তুলি লজ্জাও পায়, কিন্তু হেসে ওঠে। নীলের সাথে কথা বলে ভালো লাগে তুলির, কাল থেকে ভারী হওয়া মনটা হাল্কা হয়ে যায়।

।।২।।

আস্তে আস্তে নীল আর তুলির বন্ধুত্ব বেড়ে উঠল। সাধারণত তুলি অফিসের কারও সাথে মিশত না সেইভাবে। কিন্তু নীল আসার কিছুদিন পর তার অভ্যাস বদলে গেল। অফিসে একটু সময় পেলেই নীল তুলির সামনে এসে দাঁড়ায়, “চলো না বাইরে!”
“না গো! কাজ আছে আজকে!” তুলি যেতে চাইত না প্রথম প্রথম।
“কাজই করো সারাদিন।” নীল মুখ ভার করে বলে তারপর, “আমি তো চলেই যাব কদিন পর! একটু নতুন জায়গা বলে বলি তোমায়।”
তুলি তারপর নীলের দিকে তাকায় আর একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে, “চলো।”
নীল খুব খুশিমনে একগাল হাসে তারপর। আসলে বাড়ির থেকে দূরে বাড়িকে খুব মনে পড়ে নীলের। একা একাই তাকে কাজের জন্য আস্তে হয়েছে কলকাতা। সে আগে কখনও কলকাতায় আসেওনি, থাকেওনি। এখানে তার কোনও বন্ধু নেই, এখানে সে কাউকে চেনে না, চেনে শুধু তুলিকেই। তাই একা লাগলেই সে তুলির কাছে আসে, একটু গল্প করে। কয়েক মাসে তুলির সাথে তার বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

একদিন সে তুলিকে বলে, “তুলিদি! আর তো কয়েকমাস পড়ে আমি চলেই যাব, এখনও কলকাতা দেখা হল না। প্লিজ নিয়ে চলো না?”
“কোথায়?” জিজ্ঞেস করল তুলি।
“হাওড়া ব্রিজ!”
হেসে উঠল তুলি, “হাওড়া ব্রিজে কি দেখবে?”
“আমি কি জানি!” হাত উল্টে বলল নীল, “আমি তো কিছুই চিনিনা। কিন্তু হাওড়া ব্রিজটা দেখার খুব ইচ্ছে আছে। তারপর ভিক্টোরিয়া, সেন্ট পলস, বেলুড় মঠ কত কি আছে…” হঠাৎ জোরে বায়না করতে শুরু করল নীল, “চলো না প্লিজ!”
“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে।”

রাতে বাড়িতে ফিরে নীলের ইচ্ছে জানিয়ে প্রীতমকে তুলি বলল, “চলো একদিন বেরোই। অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি।”
প্রীতম ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বলে “তোমরা ঘুরে এসো না। ছেলেটা বাইরে থেকে এসেছে। একটু ঘুরিয়ে দেখিয়ে দাও না!”
“মানে?” চমকে ওঠে তুলি, “আমি একা যাবো?”
“না একা কেন?” প্রীতম বলে, “নীলকে নিয়ে যাবে তো!”
“ধুর! তোমার সারাদিন কাজ।” তুলি বলে, “চলো না! বাইরে অনেকদিন খাইনি দুজনে। পার্ক স্ট্রিট যাবে?”
“না গো অন্য একদিন যাবো। এই সপ্তাটা এত চাপ গেছে, কাল রেস্ট করব।”
“হ্যাঁ তো আজকেই যেতে বলছি নাকি?”
ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলল প্রীতম। তুলির গালে হাত রেখে বলল, “শোনো আমি বলি তুমি একদিন ওকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে এসো বরং। কলকাতা দেখবে দেখবে করে কত দিন লাফাচ্ছে!”
“বুঝেছি!” বিছানা থেকে উঠে চলে যায় তুলি, “তুমি অফিস ছাড়া কোথাও যাবেনা!”

অনেক রাতে যখন প্রীতম ঘুমিয়ে পড়ল, তখনও জেগে রইল তুলি। তার যেন বড় কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে আজ। তার কলেজ জীবনের দিনগুলো তার ঝাপসা চোখের সামনে ভেসে উঠল। কলেজের সেই ফেস্টের দিন। তুলি একটা গান করেছিল তাতে। হাততালিতে ফেটে পড়েছিল দর্শক, হাততালিতে ফেটে পড়েছিল প্রীতম। ও তখন সিনিয়র দাদা, ফেস্ট পরিচালনা করছিল, “বা! আজকে তোমার পারফর্মেন্সটাই সবচেয়ে দারুণ।”
লজ্জায় হেসে উঠেছিল তুলি। সেই তাদের প্রথম কথা বলা। তারপর আস্তে আস্তে তাদের আলাপ লাইব্রেরী, কলেজের ক্যান্টিন, ফাঁকা ক্লাসরুম থেকে পেরিয়ে গেল কলেজের গেট। তুলির এখনও মনে আছে প্রথমবার যখন প্রীতম পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টে যাবার কথা বলেছিল, কিভাবে বাড়ি থেকে ম্যানেজ করেছিল সে। আর তারপর থেকে তো প্রায়শই কলকাতায় দেখা করতে আসত তারা। রাস্তায় দুজনে হাত ধরে হাঁটতে থাকত, অনেক সময়েই পথের ঠিক থাকত না, তারা শুধুই হাঁটতে থাকত। হাঁটতে হাঁটতে সময় পেরিয়ে যেত। আর এখন… পাশ ফিরে দেখল তুলি, প্রীতম অঘোরে ঘুমচ্ছে। এত কাছাকাছি এসে এত বছর পর যেন তুলির মনে হচ্ছে দূরে থাকলেই ভালো হত। রোজ দেখা করার ইচ্ছেটা তো জেগে থাকত। এখন সেই ইচ্ছেটাই নেই। ইচ্ছেটার দরকারই যে নেই। বিয়ের পরে তারা তো সারাক্ষণই একসাথেই থাকে। একবার মনে হচ্ছে বিয়েটা না করলেই বোধয় ভালো হত। বিয়ের পর জীবনটা কেমন বদলে গেছে। উঠে বসল সে। নীলকে মেসেজ করল পরের দিন যেন সে রেডি থাকে।

পরের দিন আলমারি থেকে পুরনো একটা জিনস বার করল তুলি। অনেকদিন জিন্স পড়েনি। কোমরের কাছটা বেশ টাইট হয়ে গেছে। সংসার করার পর নিজের দিকে নজর দেওয়ার সময়ই তো এতদিন পায়নি। কিন্তু হঠাৎ কি মনে হল, আজকে জিন্সটা বার করল সে। তারপর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল। তুলিকে জিন্সে দেখে নীল বলল, “বা! তুমি এরমও সাজো!”
“মানে?” হাল্কা হেসে জিজ্ঞেস করল তুলি। মানে সে জানে, কিন্তু নীলের মুখ থেকে শুনতে যেন বেশি ভালো লাগে।
“এই জিন্স টপ!”
“কেন আমি কি পড়তে পারি না? বুড়ি লাগছে?”
“বিউটিফুল লাগছে।” নীল বলল, “তোমায় এরকম খুব ভালো লাগে। পড়োনা কেন?”
হাসল তুলি, নিজের প্রশংসা শুনে মন থেকে আনন্দ পেল সে, “চলো!”
প্রথমবার কলকাতা দেখল নীল। আর অনেকদিন পর কলকাতার রাস্তায় একবুক নিঃশ্বাস নিল তুলি।

কলকাতা রাস্তায় অনেকদিন পর তুলির কেমন যেন অন্য অনুভূতি হল। একটা নস্টালজিয়া অনুভূতি। সেই আগের দিনগুলোর মত নীলের সাথে সে হাঁটতেই থাকল। মাঝে একবার নীলের হাতে হাত ছুঁয়ে গেল তার। সেই পুরনো দিনের প্রীতমকে মনে পড়ল। মনে মনে হেসে উঠল তুলি। নীলের দিকে তাকিয়ে দেখল শহরটাকে সে হাঁ করে দেখছে। তুলির গর্ব হল। তার শহর, তার প্রিয় কলকাতা।

রাতে যখন বাড়ি ফিরল তুলি, মনে তার অনেকটা প্রশান্তি আর ঠোঁটের ডগায় অনেক কথা। সারাদিনের কথাগুলো প্রীতমকে বলতে না পারলে যেন শান্তি হচ্ছে না। বাড়ি এসে দেখল প্রীতম শুয়ে আছে।
“জানো আজ কি হয়েছে?” তুলি বলতে শুরু করল। কিন্তু প্রীতমের দিক থেকে কোনও সারা এল না সেইভাবে। সে বলল, “আর বলো না! এদিকে তো ভাবলাম রেস্ট নেবো একটু, কিন্ত যেতে হল রেস্টুরেন্ট।” “মানে?” তুলি একটু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,”কোথায় গেছিলে?”
“পার্ক  স্ট্রিটে গেছিলাম তো।”
“পার্ক  …?” তুলির মুুখটা লাল হয়ে উঠলো রাগে।   “নিতা ম্যাডামের সাথে মিটিং ছিল। হঠাৎ করেই ঠিক হল যে!”
তুলি এবার যেন রেগে গেল একটু, “তুমি বললে রেস্ট নেবে তাই যেতে পারবে না, আর তুমি গেলে?”
এবার একটু বিরক্ত হল প্রীতমও, “তো কি করতাম?”
তুলি কোনও কথা বলল না আর। তার সারাদিনের না বলা কথা গুলো তার মধ্যেই রয়ে গেল। মনের ভেতর একরাশ রাগ নিয়ে পাশ ফিরিয়ে শুল সে। রাত অবধি জেগে রইল। কিন্তু প্রীতম তাকে জাগাল না, তাকে মানাল না।

একদিন রান্নার লোক সকালে ফোন করে বলল আসবেনা। প্রীতমকে তুলি অফিস যাওয়ার আগে রান্নাঘরে একটু হাত লাগাতে বলল। কিন্তু প্রীতম ব্যস্ততা দেখিয়ে বেরোবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল।
“মানে তোমার থেকে কোনও হেল্প পাবোনা ?” রেগে জিজ্ঞেস করল তুলি।
“তুমি কি চাও আমি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে এবার রান্নাও করি?”
“অফিস তুমি একাই করো না, আমিও করি।”
“আমি চললাম।” প্রীতম আর কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। রাগে তুলির ঠোঁট ফুলে উঠল।

আস্তে আস্তে যেন প্রীতম আর তুলির মধ্যে দুরত্ব বেড়ে চলল। একটা অভিমানের দেওয়াল তুলে তুলি প্রীতমের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে নেয়। এই দূরত্ব  বিয়ের পর থেকেই বাড়ছিল। এখন তুলির জীবনে নীলের উপস্থিতিতে সেটা আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। প্রীতমের এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো যেন তুলির বেশি করে চোখে পড়ছে।  অপরদিকে নীলের সাথে কথা বললেই তার কেমন পুরনো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। নীল যেন তার অতীতের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। আগে অফিসে আস্তে তেমন ইচ্ছে করত না। যেমনটা আর পাঁচজনের হয়। কিন্তু এখন নীলের সঙ্গ ভালো লাগে। একদিন অফিস না আসতে পারলে কেমন খারাপ লাগে।  প্রীতমের সাথে ঝগড়া, কথা কাটাকাটি আস্তে আস্তে কমে আসে। প্রীতমকে প্রীতমের মতই মেনে নেয় সে। প্রীতমের যেন তাতেও ভ্রূক্ষেপ নেই। তুলির   প্রীতমের সাথে ফেলে আসা দিনগুলো যেন নীল আবার এনে দিয়েছে তাকে। অফিস থেকে তারা একসাথেই বাড়ি ফেরে। তুলি এখন রোজ গাড়ি আনে। নীলকে তার ফ্ল্যাটে গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে সে বাড়ি আসে। তারা অফিস থেকে খেতে যায়, মাঝে মাঝেই ঘুরতে যায় কলকাতা। প্রিয়জনের থেকে দুরত্বের কারণে দুজনের যে একাকিত্ব, তারা তা ভাগ করে নিয়ে ভাল থাকে। আস্তে আস্তে দুজন দুজনের অফিসের অভ্যাস হয়ে যায়।

।।৩।।

একদিন নীল তুলির কাছে এসে বলল, “তুলিদি একটা সারপ্রাইজ আছে।”
নীলের সব কথাই এখন বেশ ভালো লাগে তুলির। টেবিলের ওপর কনুইয়ে ভর করে গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে তুলি “কি?”
“আমি তো কাজ মোটামুটি শিখে গেছি। তো অনেকদিন ধরেই আমার ম্যানেজারকে বলছি বাড়ি ফেরত পাঠাতে। অ্যাট লাস্ট মেনে নিয়েছে জানো।”
তুলি এই প্রথমবার নীলের কথা শুনে খুশি হয় না, “মানে তুমি চলে যাচ্ছ?”
“হ্যাঁ তুলিদি। পরশু ফ্লাইট।” একগাল হেসে বলল নীল। তারপর ফিরে গেল নিজের সিটে। তুলির কেমন একটা লাগল।একটা খারাপ লাগা, একটা অভিমান। আর কদিন পরই পুজো।  দুর্গাপুজোয় সে ভেবেছিল  নীলকে  এক অন্য কলকাতা দেখাবে। নীলের নিশ্চয়ই ভালো লাগবে খুব। কলকাতার রাস্তায় যখন নীল তার সাথে হেঁটেছে এই কদিন, তার চোখে মুখের আনন্দে তুলির মনে হয়েছিল কলকাতাকে নীলও তার মতই ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু আসলে তা নয়। সব মানুষই  নিজের শহরকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসে। ভেতরে ভেতরে নীল ফিরে যাবার প্ল্যান করেছে কিন্তু তাকে বলেনি! নিজেকে প্রতারিত মনে হল তুলির। মনে হল কলকাতা আর তার পুরনো দিন নিয়ে তার সাথে যেন কেউ মজা করে গেছে এতদিন। মনে হল নীলকে ডেকে কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু কি শোনাবে তাকে? সে তো নীলকে ভালবাসে না? বাসে কি? নাকি নীল তাকে ভালবাসে? তাকে কি নীল কোনও কথা দিয়েছিল থেকে যাবার! নীল তো নিজের বাড়ি ফিরবেই।

দুদিন পর বিকেল করে দুজনে বেরোলো অফিস থেকে। চারদিকে শহর কি সুন্দর সাজে সেজে উঠেছে। আর কদিন পরেই তো পুজো। পুজোর আনন্দে কলকাতা মেতে উঠেছে, তুলির প্রিয় কলকাতা। কোথাও প্যান্ডেল বাধার জন্য বাঁশ পড়ে আছে রাস্তার ধারে, তো কোথাও আলো লাগানো চলছে জোরকদমে। তার মাঝ দিয়ে ছুটে চলেছে তার গাড়ি, শহরের এই রঙিন রূপ কাটিয়ে নীলকে নিয়ে তার গাড়ি ছুটে চলেছে এয়ারপোর্টের দিকে।
“তাহলে?” গাড়িতে ব্রেক কষে জিজ্ঞেস করল তুলি। সামনে লাল সিগন্যাল।
“তাহলে আর কি?” নীল উত্তর দিল,”ব্যাক টু হোম।” বেশ উত্তেজিত সে। কিন্তু একটা কষ্ট উঠে এল তুলির গলাতে। সে বেশি কিছু বলতে পারল না।
“হুম।” হাসার চেষ্টা করল তুলি, কিন্তু পরশু অবধি যেই হাসি ছিল তার ঠোঁটের কোণে, সেটা আর নেই। সিগন্যাল লাল থেকে সবুজ হল, কিন্তু তুলির যেন মন করল না গাড়িটাকে আর এগোতে। সেদিন যখন নীল তাকে এসে বলল সে ফিরে যাচ্ছে, তুলির রাগ হয়েছিল। আবার মনে হয়েছিল খবরটা যেন সত্যি নয়, নীল বোধয় মিথ্যে বলছে। কিন্তু আজ যখন সত্যিই ফিরে যাচ্ছে নীল, তখন তুলির কেমন একটা হচ্ছে ভেতরটা। চারপাশের এই শহরের রূপ দেখে নিজের ভেতরটা ঠিক রাখতে পারছে না সে। দলা পাকানো কষ্ট গুলো বুকের কাছটায় জমে ব্যথা হচ্ছে।নীল তুলির দিকে তাকিয়ে দেখল এতক্ষণে।
তুলি হঠাৎ বলল “আর কিছুদিন থেকেই যেতে পারতে নীল।”
“আমিও তাই ভেবেছিলাম।” ঠোঁট উল্টে বলল নীল, “কিন্তু একবার যখন রাজি হয়েছে, আর দেরী করে কি লাভ। জানোইতো।”
“হ্যাঁ জানি।” অভিমান আর খারাপ লাগাটা আরও বেড়ে গেল তুলির। আর কোনও কথা না বাড়িয়ে তুলি গাড়ি চালিয়ে এয়ারপোর্টের ভিতরে ঢুকে পড়ল।
হঠাৎ তুলির হাতে  হাত রাখল নীল, “তোমায় খুব মিস করব তুলিদি।”
মনের ভেতর কান্নায় ভেঙে পড়ল তুলি। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। সব আবেগ মনের মধ্যে ধরে রেখে অপেক্ষা করল নীলের চলে যাওয়ার। নীল চলে গেল। এয়ারপোর্টে ঢোকবার আগে আর একবার ফিরে দেখলনা সে। তুলি গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। তার চোখের জল বাধা মানল না। নিজেকে হঠাৎ খুব ছোট মনে হল। আর মনে হল প্রীতমের কথা । তার মনে হল খুব ভুল করেছে সে। প্রীতমকে ফোন করল।
“হ্যাঁ বলো!” ফোন তুলে বলল প্রীতম।
“আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরো।” তুলি বলল
“কেন কি হয়েছে?”
“জানি না আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরো নাহলে আমি বাপের বাড়ি চললাম।”
“আরে হলটা কি তো বল…”
তুলি প্রীতমের বাকি কথা বলে না শুনেই ফোন কেটে দিল। তারপর স্টিয়ারিঙে হাত রাখল। গাড়ি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এল বাড়ি। বাড়ি এসে অপেক্ষা করতে লাগল প্রীতমের।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি এল প্রীতম। প্রীতম আসতেই  দৌড়ে গিয়ে প্রীতমকে জড়িয়ে ধরল সে।
“কি হল?” আশ্চর্য প্রীতম জিজ্ঞেস করল।
“পুজোয় কোথায় যাবে আগে বলো?” প্রীতমের বুক থেকে মাথাটা তুলে তুলি বলল।
“তুমি কোথায় যাবে বলো!” তুলির মাথায় হাত রেখে বলল প্রীতম। প্রীতমের দিকে চেয়ে দেখল তুলি। কি সরল চোখদুটোয় অগাধ ভালবাসা তার জন্য। আর সে কিনা… হঠাৎ আঁকড়ে জড়িয়ে ধরল সে প্রীতমকে।
“কি হল?” প্রীতমের প্রশ্নের উত্তরে তুলি কিছু বলল না, শুধু কেঁদে চলল। প্রীতম তাকে যত ছাড়ানোর চেষ্টা করে, তত তাকে আঁকড়ে ধরে তুলি আর কেঁদে চলে। প্রীতমের বুকে মাথা রেখে তার যেন স্বস্তি লাগছে আজ। আর কেঁদে কেঁদে মনটাকে হাল্কা লাগছে বেশ। সে এখন জানে প্রীতম হয়ত আগের মত তার হাত ধরে কলকাতার রাস্তায় দিকবিহীন ভাবে আর নাও হাঁটতে পারে, কিন্তু তার হাত কোনোদিন সে ছাড়বেনা ,তাকে ছেড়ে প্রীতম কোথাও যাবেনা।


 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।