সববাংলায়

ডুয়ার্স ডায়রি ।। তৃতীয় পর্ব ।। বক্সার অরণ্যে

বিভাগঃ

২৯শে মে, বেলা ১০.৪৫ 

রাজাভাতখাওয়া!এমন অদ্ভুত নাম কেন,রুবাই জিজ্ঞেস করল।ওর আবার এই একটা অভ্যেস আছে।যে কোনো নাম শুনলেই তার ইতিহাস ওকে জানতেই হবে।ড্রাইভারদাই এখন আমাদের গাইডও বটে।রেল গেট খুলে গেছে।আমরা যেতে যেতে ড্রাইভারদার মুখ থেকে জানলাম -কোচবিহারের রাজা ধৈর্যেন্দ্রনারায়ণ নাকি বন্দী হয়েছিলেন ভূটানে। সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে ফেরার পথে এই জঙ্গলে গ্রামে এসে নাকি ভাত খেয়েছিলেন। সেই থেকেই নাম রাজাভাতখাওয়া।এখানে রয়েছে বন দপ্তরের একটি মিউজিয়াম। বন্যপ্রাণের ছবি আর ‘স্টাফড’ প্রাণীমূর্তির প্রদর্শন রয়েছে।মিউজিয়ামটির গায়ে রাজামশাইয়ের সপার্ষদ সেই ফিরে আসার দৃশ্য আঁকা রয়েছে বড় বড় করে। মনে মনে ঠিক করে নিলাম, মিউজিয়ামে একবার না গেলেই নয়।ডানদিকে একটা বাঁক ঘুরতেই আবার জঙ্গল শুরু হল।খুব গভীর নয় কিন্তু আদিম একটা আবহ তৈরী হয়েছে আবার।কিন্তু বুঝতে পারলাম না আমরা কোন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাচ্ছি।জানতে চাইনি তবু ড্রাইভার দা বোধ হয় আমাদের হঠাৎ চুপ করে যাওয়াতে যা হোক কিছু আন্দাজ করে বলল- আমরা কিন্তু বক্সা টাইগার রিজার্ভে ঢুকে গেছি।

নামটা শুনতেই গা’টা কেমন কাঁটা দিয়ে উঠল যেন। সেই ভূগোল বইতে পড়া বক্সা যে হঠাৎ করে এত সামনে চলে আসবে ভাবতেই অবাক লাগছে। এর আগে কখনও সংরক্ষিত অরণ্য দেখিনি। দেখিনি এমন কোন জঙ্গল যা ভূগোল বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে আমার চোখের সামনে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ে তার দিগন্ত ব্যাপী বিস্তৃতি নিয়ে।গাড়ি এসে যেখানটায় দাঁড়িয়েছে সেটা বন দপ্তরের চেকপোস্ট। এখানে ভোটার আইডি চেক হবে। রুবাই গেছে ভোটার কার্ড নিয়ে। আমি গাড়ি থেকে নেমে এসে খোলা রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমি যেখানটায় দাঁড়িয়ে তার বাঁদিকে শুরু হয়েছে বক্সা ব্যাঘ্র অরণ্যের কোর এরিয়া ।  দেখতে পাচ্ছি বিশাল গেটে বড় বড় হরফে লেখা বক্সা টাইগার রিজার্ভ। গেটটা তৈরী কাঠের গুঁড়ি দিয়ে।তার  ওপর রয়্যাল বেঙ্গলের হলুদ ডোরা কাটা ছাপ । বাড়ি থেকে এই মুহূর্তে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে এক আদিম অরন্যের প্রবেশ পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মানুষের প্রবেশ এখনো বন্যার জলের মত আছড়ে পড়েনি। ভোটার কার্ড হাতে রুবাই অফিস থেকে বেরোচ্ছে। আমি গাড়িতে উঠে বসলাম।

buxa-entry
বক্সার অরণ্যে প্রবেশ। চিত্রগ্রহণঃ লেখক

সেই ছোটবেলা থেকে বইয়ের পাতায় পড়ে আসা বক্সা টাইগার রিজার্ভের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। দুপাশে ঘন জঙ্গল, মাঝে রাস্তা।অদ্ভূত এক নিস্তব্ধতা সারা জঙ্গল জুড়ে। মাঝে কোন এক নাম না জানা পাখির ডাক যেন এই জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা এগোচ্ছি। যত এগোচ্ছি তত আমার কল্পনা লাগাম ছাড়া হয়ে উঠছে। প্রতিটা রাস্তার মোড়েই মনে হচ্ছে এই বোধহয় বেরিয়ে এল দুদ্দাড় করে গজরাজ তারা পুরো দলবল সমেত। দুপাশে আকাশ চুম্বি শাল গাছের জঙ্গলের মাঝে চুলের সিঁথির মত পিচ ঢালা কালো রাস্তাটা যত দূর দেখতে পাচ্ছি ততদূর অবধি আমাদের গাড়িটা ছাড়া আর একটাও গাড়ি নেই। এখানে ঢুকতেই বুঝতে পারছি গরম অনেকটা কমে গেছে। গাছ যে মানুষের প্রকৃত বন্ধু সেটা বুঝতে পারলাম। কিন্তু এই গাছেরই আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বক্সার বাঘ। অবশ্য ড্রাইভারদাদা বলল সে সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ বাঘের সংখ্যাই যে কমে গেছে অনেক। রুবাই ওদিকে  গল্প ফাঁদতে শুরু করে দিয়েছে। নিস্তব্ধ রাস্তার দুপাশের ঘন জঙ্গল দেখিয়ে বাঘ না হলেও অন্য  জন্তু যে আস্তে পারে সেটা ততক্ষণে ও বোঝাতে শুরু করে দিয়েছে। ও চিরকালই কল্পনাপ্রবণ।সামনে একটা মোড় ঘুরতেই দেখলাম জঙ্গলের ঘনত্ব কমতে শুরু করেছে আর গাছের মাথার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে জয়ন্তী পাহাড়।

আমাদের গাড়ি যে বাংলোটার সামনে দাঁড়ালো তার পূবদিকে জয়ন্তী পাহাড় আর তিনদিকে বক্সার গভীর জঙ্গল। কাঠের গুঁড়ির ওপর আমাদের একতলা বাংলোটার চারদিক কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা।এখানে যথেষ্ট গরম আজ।এখন স্যান্ডউইচ নিয়ে বসেছি বারান্দায়। ঘন নীল আকাশের নিচে সবুজ জয়ন্তী পাহাড়টা থেকে চোখ যেন সরতেই চাইছেনা।রুবাই আবার ক্যামেরা নিয়ে কোথায় বেরোচ্ছে !

dooars-buxa-jayanti
বক্সার বাংলো থেকে জয়ন্তী পাহাড়। চিত্রগ্রহণঃ লেখক

২৯শে মে, দুপুর ২টো 

সকালের পর এই এখন আবার লেখার সময় হল।রুবাইকে ক্যামেরা নিয়ে বেরোতে দেখে আমিও ওর পিছু নিলাম।বাংলো থেকে বেরিয়ে জয়ন্তী পাহাড় বরাবর আমরা এগোতে লাগলাম।জঙ্গলের মাঝে মাঝে কাঠের ছোট ছোট বাংলো। কোন কোন বাংলোয় টাঙানো বোর্ড দেখে বুঝলাম এগুলো হোম স্টে।এই হোম স্টে হল দুর্গম জায়গায় যেখানে হোটেল বানানোর মত পরিবেশ নেই সেখানে স্থানীয় মানুষরা পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা তাদের নিজেদের বাড়িতে করে।আমরা কিছুদূর এগিয়ে একটা বিশাল খোলা মাঠে এলাম। স্থানীয় কিছু মানুষ এই প্রচন্ড রোদে ছাগল চড়াচ্ছে। আমার এখানকার স্থানীয় কাউকে দেখলেই খালি জিগেস করতে ইচ্ছে করে তারা হাতি দেখেছে কিনা।বক্সায় আসার পর এর সাথে যোগ হয়েছে বাঘ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল কেউই স্পষ্ট করে কিছু বলল না।আমরা টুকটাক কিছু ছবি তুলে বাংলোয় ফিরে এলাম।বিকেলে আবার বেরোবো।

 

(চলবে…)


 

 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।