২৯শে মে, রাত ৮ টা
ডাঙায় বোটটা এসে লাগল যখন সূর্যের আলো যথেষ্ট কমে এসেছে। রুবাই আরো একটু দাঁড়াতে চাইছিল, আমি রাজি হলাম না।সিকিয়াঝোরায় ওই লোকটা কি দেখে এত ভয় পেল আমার মনের মধ্যে তখন থেকে এই একটা প্রশ্নই ঘুরছে।এই জল জঙ্গলের মাঝে ওই লোকটার চোখ মুখের যে আতঙ্ক, সঙ্গে ক্রমশ নামতে থাকা সন্ধে আমার স্বাভাবিক সাহসটার ভিতটা একটু হলেও নড়িয়ে দিয়েছে । গাড়িতে উঠে ড্রাইভারদাকে বললাম, একটু টেনে চালাতে। যেতে যেতে পেছনে ফেলে আসা সিকিয়াঝোরার কথা ভাবছিলাম।ওই খাঁড়ির বুকে আর একটু বাদেই রাত নামবে অল্প অল্প করে।জলের তলার জীবনগুলো চাঁদের আলো গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে থাকবে।গাছের ডাল বেয়ে এখন হয়ত কোন সাপ শিকারের দিকে নিঃশব্দে এগোচ্ছে।ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আমাদের গাড়ির গতি কেমন কমে গেল মনে হল।
“কি ব্যাপার গো!” রুবাই জিগেস করল।
“ওই দেখুন ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বোর্ড। এখানে ঘন্টায় তিরিশ কিমির বেশি চালানো মানা।”
-

বন দপ্তরের নির্দেশিকা। চিত্রগ্রহণঃ লেখক
গাড়িটা এসে যেখানে দাঁড়ালো সেটা বক্সার কোর এরিয়ার ভেতর।ডানহাতে একটা শিব মন্দির আর তার পেছনে একটা ওয়াচ টাওয়ার।ওয়াচ টাওয়ার থেকে গোটা জঙ্গলটার একটা সামগ্রিক ছবি, ইংরেজিতে যাকে প্যানোরামিক ভিউ বলে সেটা পাওয়া যায়।ড্রাইভারদা বলল-যান একবার ঘুরে আসুন।আমরা গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম ওয়াচ টাওয়ারের দিকে।চারতলা ওয়াচ টাওয়ার।
-

ক্যানপি ওয়াচ টাওয়ার। চিত্রগ্রহণঃ লেখক
সিঁড়ির অবস্থা খুব খারাপ।টাওয়ারের দ্বিতীয় তলাতে উঠে দেখলাম- পাথর ফলকে বড় বড় করে লেখা- ক্যানোপি ওয়াচ টাওয়ার।২০১৩-এ উদ্বোধন। কিন্তু হলে কি হবে, এই চার বছরেই তার অবস্থা খুব শোচনীয়। আমরা দৌড়তে দৌড়তে চারতলায় উঠলাম।
-

চিত্রগ্রহণঃ লেখক
“দ্যাখ!” দেওয়াল গুলো দেখিয়ে বলল রুবাই। চারপাশে মানুষ নিজেদের নাম লিখে রেখে গেছে।
“সব জায়গায় এই সমস্যা!” রুবাই গজগজ করতে থাকল, “এরা কি ভাবে বলত। এইভাবে এদের নাম অমর হয়ে যাবে!”
“রাগিস না” আমি এটুকুই বললাম। এই বিষয়গুলো আবার রুবাইয়ের একদম পছন্দ না। এর আগেও যতবার কোথাও গেছে এরকম দেখলেই ও মাথা গরম করে ফেলে। এখানে তো কোনও গার্ডও নেই যে ও গিয়ে বলবে। অগত্যা আমিই ওকে শান্ত করলাম। আমরা মানুষরা যেখানেই গেছি একদল সৃষ্টি করেছি, পরক্ষণেই অন্য একটি দল এসে তাকে বিকৃত করেছি।এই টাওয়ারের প্রতিটা প্রান্তে তার প্রমাণ।এখানে আসা মানুষ প্রতিটা থামে কুঁড়ে কুঁড়ে নিজেকে অমর করে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস করে গেছে।আমরা যারা মানুষ তাদের এই এক সমস্যা।আমরা বড় প্রকাশমুখী, বড় অমরত্বকামী।আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপে আমরা নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে চাই, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও।এই না মানুষদের রাজত্বে একটু নাহয় অকিঞ্চিৎকর অন্তর্মুখী থাকলাম।না হয় একটু নির্বাক, নিভৃতই থাকলাম।
জঙ্গলে সন্ধ্যে নামে খুব তাড়াতাড়ি। সারি সারি গাছের মাথা যত দূর চোখ যায়।বুঝলাম ক্যানোপি কেন।ক্যানোপি মানে ত্রিপল,প্যান্ডেলের মাথায় যা বাঁধা হয়, রোদ জল আটকাতে।এই ওয়াচ টাওয়ার থেকে জঙ্গলের প্রায় কিছুই দেখা যায় না, গাছের মাথাগুলো ছাড়া।পাখিদের চিৎকার আকাশ বাতাস মাতিয়ে দিচ্ছে।সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার তীব্র ডাক। প্রকৃতির এই নিজস্ব কনসার্টে আমার বড় অবাঞ্ছিত লাগছিল নিজেকে। রুবাইয়েরও বোধ হয় তাই লাগছে। নাম ছেড়ে এখন দেখছি ও জঙ্গলের দিকে চেয়ে আছে একমনে। প্রকৃতিপ্রেমী যেকোন ব্যক্তিরই এমনটাই লাগা উচিত।এই সময়টা আসলে ঘরে ফেরার সময় পাখিদের।যেমন ফেরে সমস্ত মানুষ যে যার কর্মক্ষেত্র থেকে নিজের বাড়িতে ।
-

ক্যানপি ওয়াচ টাওয়ার থেকে বক্সার জঙ্গল। চিত্রগ্রহণঃ লেখক
টাওয়ারের পেছন দিক থেকে জঙ্গল শুরু।ওপর থেকে দেখলাম স্পষ্ট দুটো রেখা জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেছে।এগুলোকে ট্রেইল বলে।জঙ্গল সাফারির সময় দিনের পর দিন জিপ গিয়ে গিয়ে এরকম রাস্তা তৈরী হয়েছে।আমি ওই ট্রেইলটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিলাম এই আবছা আবছা আলোয়, এই ট্রেইল সোজা পৌঁছে গেছে জঙ্গলের সেই সব প্রান্তে যেখানে এখন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে কোন এক ডোরাকাটা তার রাতের খাবার জোগাড়ের।এই রাস্তা ধরে সোজা হাঁটা লাগাই যদি মাঝ রাস্তাতেই হয়ত পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখব মহাকালকে তার দলবল সমেত। ট্রেইল দুটো যেন আমার কাছে এক না দেখা পৃথিবীর প্রবেশ পথ ।
-

জিপ ট্রেইল। চিত্রগ্রহণঃ লেখক
আমার চেনা শহর, চেনা পৃথিবী থেকে শত আলোকবর্ষ দূরের এই আদিম বনভূমির প্রবেশ পথের সামনে দাঁড়িয়ে এখন শহর থেকে আসা আমরা দুজন চুপ করে প্রকৃতির এই ব্যক্তিগত মুহূর্তটাকে অনুভব করার চেষ্টা করছি, বোঝার চেষ্টা করছি এটাও একটা সভ্যতা, এটাও একটা সংস্কৃতি, এটাও একটা জগৎ যেখানে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই সন্ধ্যা একান্ত ভাবেই তাদের যাদের আমরা না মানুষ বলি।
-

জিপ ট্রেইল। চিত্রগ্রহণঃ লেখক
-

চিত্রগ্রহণঃ লেখক
সম্বিৎ ফিরল একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজে। গাছে গাছে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আওয়াজটা। রুবাই কে বললাম নেমে চল। আওয়াজের গুরুত্ব নির্ভর করে আবহের ওপর।এই ডাকটাই যদি আমার কলকাতার বাড়িতে শুনতাম তাহলে এতটা ভয় লাগত না যতটা এখন লাগছে। চারতলা থেকে দৌড়ে নামছি আমরা।নামতে নামতে খালি মনে হচ্ছে সিঁড়ির পেছন থেকে আমাদের কেউ লক্ষ্য রাখছে নাতো। সিঁড়ি যেন শেষই হচ্ছে না, মনে হচ্ছে পাহাড়চূড়ো থেকে নামছি।সিঁড়ির শেষ ধাপে যখন, দেখি ড্রাইভারদা দাঁড়িয়ে। দেখে একটু ভরসা হল।আমাদের দেখে বলল- “চলুন দাদা অনেক দেরি হয়ে গেছে ।হাতি বেরিয়ে পড়লে ঝামেলা হয়ে যাবে।”
গাড়িতে উঠতে উঠতে জিগেস করলাম-“একটু আগে একটা আওয়াজ হল খুব জোরে।মনে হল জঙ্গলের ভেতর থেকে এল।কিসের ডাক ওটা?”
“ওটা ময়ূরের।” গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল ড্রাইভারদা। ঠিকই তো! সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লায় সেই ডাক শুনেছিলাম। কিন্তু সেই ডাক যে এত কর্কশ, এত তীক্ষ্ণ হয়, না বললে বিশ্বাস করতাম না।বইতে পড়েছিলাম ময়ূরের ডাককে কেকা বলে।এই কেকা যে এই জঙ্গলের মাঝে কত ভয়ংকর লাগে, নিজে না শুনলে বিশ্বাস করা কঠিন। আমাদের গাড়ি ছুটতে লাগল।হেড লাইটের আলোয় যতদূর দেখতে পাচ্ছি কেবল আমরাই ছুটে চলেছি বক্সার এই গভীরতম অংশের মধ্যে দিয়ে।
বেশ কিছুক্ষণ হল বাইরে একটা শোরগোল শুনতে পাচ্ছি। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি বাইরের আলোটাও নেভানো। আমি লেখায় ব্যস্ত ছিলাম বলে বুঝতে পারিনি। রুবাই এসে উত্তেজনার সাথে বলল, “হাতি এসেছে।”
আমি লেখা থামাচ্ছি এখন।
২৯শে মে, রাত ১১ টা
অয়ন খেতে গেছে। তাই আমিই ডায়েরীটা খুলে বসলাম। সন্ধেবেলায় সেই যে অয়নকে ডেকে নিয়ে গেলাম, তার পরের ঘটনা এখানে লিখে রাখা হয়নি। সেটাই এখন লিখে রাখি। সিকিয়াঝোরা আর ক্যানোপি থেকে ফিরে আমি একটু বাইরেটায় ঘুরছিলাম, অয়ন রুমের ভেতরে বসে ডায়েরি লিখছিল। আমাদের এই বাংলোটা দোতলা বাংলো। গাছের গুঁড়ির ওপর সাজানো ট্রি-হাউস বলা যেতে পারে। একতলায় দুটো মাত্র রুম। আর ওপরের তলায় তিনটে রুম। তারই একটা রুমে আমরা দুজন। বাংলোর সামনে বক্সার সরু রাস্তা আর পিছনে ঘন জঙ্গল। কেয়ারটেকার যিনি আছেন, অসীমদা, তার কাছে বসে জঙ্গলের গল্প শুনছিলাম। সকালবেলাতেও ওনার কাছেই অনেক গল্প শুনে মনটা আমার অন্যরকম হয়ে গেছিল। এখন ফিরে আবার ওনার সাথেই বসেছিলাম। এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে বাংলোগুলো হওয়ায় প্রায়শই নাকি কোনও না কোনও জংলী জন্তু এখানে চলে আসে। আমার বেশ রোমাঞ্চ লাগছিল শুনতে। শহরে থেকে আমরা এই কাহিনী শুধু বইয়ের পাতায় পড়েছি বা সিনেমায় দেখেছি। এখানে সেই লোকটার মুখ থেকে শুনছি যে একেবারে নিজে চোখে দেখে রোজ।
হঠাৎ কিসের একটা শব্দ। চমকে উঠে পড়লেন তিনি। নীচে থেকে যে দুজন ছিল তারাও উঠে এসেছে উপরে। ওদের উত্তেজিত কথাবার্তায় প্রথমে আমি বুঝতে পারছিলাম না। কেয়ারটেকার কাকুই আমার কৌতূহল দূর করে সাবধান করে বলল, “হাতি এসেছে। নীচে যাবেন না।”
“হাতি” বিড়বিড় করলাম আমি। বাইরের আলো নিভিয়ে দিল ওরা। দুজন লোক নীচে নেমে গেল। কেমন একটা বুক দুরুদুরু করছে। এতটাও বোধয় আশা করিনি, তাই। অয়নকে ডেকে আনলাম বাইরে।
দুজনে তখন রুমের বাইরে এসে কাঠের বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছি।
“কোথায় হাতি?” আমি না থাকতে পেরে জিজ্ঞেস করলাম আমার পাশে দাঁড়ানো অসীমদাকে।
“দূরে ঐ আলোগুলো দেখছেন!” জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“হ্যাঁ” আমি উত্তর দিলাম। দূরে কিছু আলো নড়াচড়া করছে। আমাদের বাংলো থেকেও টর্চ জ্বালিয়ে কিছু একটা করছে। কাকু বলে চললেন, “আলো দেখিয়ে ওদের পথ ঘোরাচ্ছে। নাহলে এখানে ঢুকে পড়বে।”
“বাংলোর ভেতরেও ঢোকে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“কেন ঢুকবে না। পরশুই তো এসেছিল এখানে। তখন তো আপনারা আসেননি। এমনিতে কিছু করে না। তবে রেগে গেলে ভেঙ্গেও দিতে পারে।”
“কি?” আমি একটু চমকে উঠলাম।
“এই কাঠের বাড়িটা।” অমায়িকভাবে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক। অয়নের দিকে তাকিয়ে দেখি, ও হাঁ হয়ে তাকিয়ে। ও কি ভাবছে জানি না। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে হচ্ছিল যেন হাতিগুলো ঢুকে পড়ে ভেতরে।এমন সময়ে একটা হাতির ডাক শুনে মনটা কেমন ভয় আর রোমাঞ্চে ভরে গেল। দুর্ধর্ষ কাহিনী অনেক পড়েছি বইয়ের পাতায়। কিন্তু হাতি এসে আমাদের বাসস্থানটাই ভেঙে দিয়ে যেতে পারে এরকম জায়গায় আগে আমরা থাকিনি। কিছু ভাঙ্গাভাঙ্গি নাই হোক, কিন্তু একটা হাতি অন্তত বাংলোর ভেতর অবধি আসবেনা, একটা রোমাঞ্চ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
কিন্তু শেষ অবধি তা হল না। তবে যা হল তাও কম রোমাঞ্চের নয়। আলো অন্ধকার মেশানো বাংলোর সামনের রাস্তা দিয়ে হাতির যাওয়ার যে আওয়াজ সেটা দেখাও কম অভিজ্ঞতা নয়।
অয়ন এসে গেছে। এবার ডায়রি বন্ধ করছি। কাল সকালে আবার পাহাড়ে চড়তে হবে। সে আরেক অভিজ্ঞতা।
(চলবে)
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান